জামালগঞ্জে শ্রমিক সংকটে ধান কাটা নিয়ে শঙ্কায় হাওড়ের কৃষক

প্রকাশিত: ৮:৫৯ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৬, ২০২০

জামালগঞ্জে শ্রমিক সংকটে ধান কাটা নিয়ে শঙ্কায় হাওড়ের কৃষক

মোঃ বায়েজীদ বিন ওয়াহিদ/ জামালগঞ্জঃঃ
জমিতে ধান পাকা প্রায় শেষের পথে। পহেলা বৈশাখ থেকে যদিও উপজেলার কিছু কিছু এলাকায় ধান কাটা শুরু হয়েছে। কিন্তু পুরোদমে কাটা শুরু হতে সময় লেগে যাবে আরো সপ্তাহ খানেক। এরই মধ্যে কৃষক কুলের ঘুম কেড়ে নিয়েছে করোনাভাইরাস নামক এক ভয়ানক সংক্রমণ ব্যাধি।

 

 

 

একদিকে প্রতিবছরই পাহাড়ি ঢল ও আগাম বন্যার আশঙ্কায় পাকার সঙ্গে সঙ্গেই কেটে নিতে হয় হাওর অঞ্চলে আবাদ করা বোরো ধান। এই মৌসুমে আশপাশের জেলা থেকে ধান কাটার কাজ করতে হাওরে যায় বহু শ্রমিক। ধান কাটা এবং ঘরে তোলার মজুর বা শ্রমিক কোথায় পাবেন- এ নিয়েই চিন্তা তাদের।

 

 

 

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বোরো মৌসুমে দেশে ৪১ লাখ ২৮ হাজার ৫৪৮ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে, যার প্রায় ২৩ শতাংশই হয়েছে হাওর অঞ্চল হিসেবে পরিচিত সাত জেলা নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়।

 

 

শুধু সুনামগঞ্জ জেলায় বোরো ধান আবাদ হয়েছে ২ লাখ ১৯ হাজার ৪৫০হেক্টর জমিতে। আর এর মধ্যে জামালগঞ্জ উপজেলায় হয়েছে ২৪ হাজার ৪৬৫ হেক্টর জমিতে। এসব অঞ্চলে পুরোদমে বোরো ধান কাটা শুরু হয় মধ্য এপ্রিলের পর থেকে। কিন্তু এই সময়েই সিলেট অঞ্চলে শুরু হয় প্রচুর বৃষ্টিপাত। বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলের কারণে হাওরে দেখা দেয় আগাম বন্যা। কোনো কোনো বছর মার্চেই অকালবন্যা দেখা দেয়।

 

 

 

যদিও গত দু বছর যাবত হাওর রক্ষায় সরকারের নানা পদক্ষেপের কারনে ফসল তুলতে সক্ষম হয়েছে কৃষক। তাছাড়া এবার মার্চে বৃষ্টি না হলেও এপ্রিলে প্রচুর বৃষ্টিপাত হতে পারে এবং ভারী বর্ষনের ফলে নদীর পানি বিপদ সীমা অতিক্রম করতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তরের বরাত দিয়ে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার উদ্যোগে আজ থেকে শুরু হয়েছে জরুরী সতর্কবার্তা মাইকিং। এতে বলা হয় আগামী বৈশাখের ৪ তারিখ হতে ৮ তারিখ পর্যন্ত ভারী বর্ষন ও অকাল বন্যা হওয়ার আশংকা আছে। তাই যত দ্রুত সম্ভব ধান কেটে ঘরে তোলার জন্য বলা হচ্ছে কৃষকদের।

 

 

 

ফলে রয়েছে এবার অকালবন্যার শঙ্কা। অন্যান্য বছর বন্যার হাত থেকে ফসল রক্ষায় অধিক শ্রমিক দিয়ে তড়িঘড়ি করেই ধান কাটিয়ে নিলেও এবার সেক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে করোনার কারনে চলমান লকডাউন পরিস্থিতি। এ যেন মরার মধ্যে খারার ঘা। কৃষকদের দাবী করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে এবার আসতে পারছেন না অন্য জেলার শ্রমিকরা। অন্যদিকে উন্নত কৃষি যন্ত্রপাতির স্বল্পতা রয়েছে হাওরাঞ্চলে। সব মিলিয়ে ধান বিস্তীর্ণ অঞ্চলটির ধান মাড়াই নিয়ে এক ধরণের শঙ্কা ও উৎকণ্ঠায় রয়েছেন কৃষকরা।

 

 

একাধিক কৃষকের সাথে কথা বলে জানা যায় করোনার প্রাদুর্ভাবে গত প্রায় এক মাস যাবত তাদের সকল আয়ের উৎস বন্ধ। এমতাবস্থায় তাদের হাতে ধান কাটার মত নগদ টাকা সঞ্চয় না থাকায় তারা রয়েছে খুব বিপাকে। অন্যদিকে ধানের বিনিময়ে বিভিন্ন জেলা থেকে আগত ধান কাটার শ্রমিক আসার কথা থাকলেও করোনা ভাইরাসের কারনে গৃহবন্দী সকল শ্রমিক। বের হতে পারছেন কোন শ্রমিক। এক জেলা থেকে অন্য জেলায় যোগাযোগ বন্ধ। এমতাবস্থায় করোনা পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হওয়ার আশঙ্কায় ধান কাটার শ্রমিক পাওয়া নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। পাশাপাশি বৈরী আবহাওয়ার আশঙ্কা তো রয়েছেই।

 

 

উপজেলার উত্তর কামলাবাজ গ্রামের কৃষক মো. হারুন অর রশিদ বলেন বাড়ির পাশের হালির হাওরে থাকা আমার ৮ একর জমিতে এবার বোরো আবাদ করেছি। জমির ধানে পাকা রং ধরেছে। আগামী ৩/৪ দিনের মধ্যেই জমির পাকা ধান পুরোদমে কাটা শুরু করার কথা। আর এরই লক্ষে গত দুই দিন আগেই অন্য জেলা থেকে ২০ জনের ধান কাটার একটি শ্রমিক দল আমার বাড়িতে আসার কথা ছিল। কিন্তু এবার করোনার কারণে তারা আসতে পারবেনা বলে আমাকে জানিয়ে দিয়েছে। তিনি আরো বলেন,এক দিকে করোনার ভয়, অন্যদিকে আগাম বন্যায় ফসলহানীর ভয়ে খুব আতংকে প্রতিটি মুহুর্ত যাচ্ছে আমার।

 

এব্যপারে উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক উপজেলা কৃষি পূনর্বাসন বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য এম নবী হোসেনের কাছে ধান কাটার শ্রমিক সংকটের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন অন্যান্য বছরের তুলনায় অন্য জেলার শ্রমিকের উপস্থিত অত্যন্ত নগন্য। আর মুল কারণ হচ্ছে দেশে করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবের ভয়ে কোন শ্রমিক আসতে চাচ্ছে না।

 

 

আমি নিজে প্রায় ২৫ একর জমিতে বোরো ধান আবাদ করেছি। অন্যান্য বছর বাহিরের জেলা থেকে যে শ্রমিকরা আসতো এ বছর তারা আসবেনা বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে। তাই শ্রমিক সংকটে ভোগছি। জানিনা কতটুকু ধান কাটতে পারবো। পাশাপাশি আবহাওয়া অধিদপ্তরের বরাত দিয়ে জামালগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিস থেকে আগাম বন্যার সতর্কবার্তা দিয়ে মাইকিং করাচ্ছে।

 

 

এ ব্যপারে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো আজিজল হক বলেন উপজেলায় সরকারীভাবে ২ টি হারভেষ্টার মেশিন বরাদ্দ পেয়েছি। হাওরের ধান কাটা ও মাড়াই করার জন্য কৃষকদের মাঝে উন্নত প্রযুক্তি সম্পন্ন ২টি হারভেস্টার মেশিন দেওয়া হয়েছে। সরকার প্রতিটি মেশিনের মুল্য বিশ লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকার পরিবর্তে ১০ লক্ষ ২৫ হাজার টাকা করে কৃষকের কাছ থেকে নিচ্ছে।

 

 

আর বাকি ১০ লক্ষ ২৫ হাজার টাকা প্রতিটি মেশিনে সরকার ভর্তুকি দিয়ে, মেশিন দুইটি দুজন কৃষককে হস্তান্তর করা হয়েছে। প্রতিটি মেশিনে প্রতিদিন ৮-১০ একর জমির ধান কাটা সম্ভব। তবে সাধারণ কৃষক বলছে প্রয়োজনের তুলনায় এই মেশিন খুবই কম। তার ওপর এবার দেখা দিয়েছে শ্রমিক সংকট। এ অবস্থায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ চলে এলে মাঠের ধান মাঠেই রয়ে যাবে বলে ধারণা কৃষকদের। তিনি আরো বলেন এবছর উপজেলার ৬ টি ইউনিয়নে ২৪ হাজার ৪৬৫ হেক্টর জমিতে বোরো ফসল আবাদ হয়েছে।

 

 

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রিয়াংকা পাল জানান, ধান কাটা এই মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ সঠিক সময়ে ধান ঘরে তুলতে না পারলে খাদ্য সংকট দেখা দিবে। তাই স্থানীয় মাটিকাটা শ্রমিক, বালু পাথর উত্তোলনকারী শ্রমিকদের কাজ বন্ধ রেখে ধান কাটার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

 

এছাড়া বাইরের জেলা থেকে ইতিমধ্যে ধানকাটার জন্য ২০০ ব্যাপারী শ্রমিক নিয়ে জামালগঞ্জে আসছে। আমরা প্রান্তিক কৃষকদের সাথে কথা বলে তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী শ্রমিক দিয়ে সহযোগিতা করার চেষ্টা করছি। তাছাড়া বাইরের জেলা থেকে ধান কাটা শ্রমিকদের প্রবেশ উন্মুক্ত রাখতে প্রতিটি চেকপোস্টে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বাইরের জেলা থেকে আসা শ্রমিকরা সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আবাসন কার্যক্রম চালাতে পারবেন। এবং তাদের মধ্যে কেউ সর্দি, জ্বর, কাশিতে ভোগলে দ্রুত উপজেলা প্রশাসনকে অবগত করতে বলা হয়েছে।

Spread the love

আর্কাইভ

January 2026
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031