এরপর কী? রুশবিরোধী চূড়ান্ত লক্ষ্য নিয়ে বিভক্ত ইউক্রেনের মিত্ররা

প্রকাশিত: ১:৩২ অপরাহ্ণ, জুন ১৪, ২০২২

এরপর কী? রুশবিরোধী চূড়ান্ত লক্ষ্য নিয়ে বিভক্ত ইউক্রেনের মিত্ররা
Spread the love

১৩ Views

আন্তর্র্জাতিক ডেস্কঃঃ

ইউক্রেনে আক্রমণ নিয়ে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে আলোচনায় যুক্ত হওয়া নাকি তাকে বিচ্ছিন্ন করা ভালো হবে? যুদ্ধের ইতি টানতে কিয়েভকে কি ছাড় দিতে হবে, নাকি এমনটি ক্রেমলিনকে উৎসাহিত করবে? রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা বাড়ানো কী ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবে? রাশিয়ার আক্রমণের পর ইউক্রেনের পক্ষ নেওয়া আন্তর্জাতিক জোটকে এমন কয়েকটি প্রশ্ন পরীক্ষার মুখে ফেলে দিয়েছে। কর্মকর্তা ও কূটনীতিকরা বলছেন, শুরুর দিকে ইউক্রেনের পক্ষে ঐক্য দ্রুত গড়ে ওঠে। কিন্তু যুদ্ধের প্রায় তিন মাস পর এই ঐক্যতে ফাটল ধরতে শুরু করেছে। পশ্চিমা সরকারগুলোর মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে। ইতালি ও হাঙ্গেরির মতো দেশ দ্রুত যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে। এটি নিষেধাজ্ঞা আরোপ থেকে পিছিয়ে আসার পথ দেখাতে পারে এবং ইউক্রেনীয় বন্দরগুলোতে রুশ অবরোধের অবসান ঘটাতে পারে।

 

বন্দরগুলোতে অবরোধের কারণে বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোতে খাদ্য নিরাপত্তা সংকটের অবনতি হয়েছে। এমন অবস্থাতেও ইউক্রেন, পোল্যান্ড ও বাল্টিক দেশগুলো সতর্ক করে বলছে, রাশিয়াকে বিশ্বাস করা যায় না এবং একটি যুদ্ধবিরতির ফলে মস্কোর আঞ্চলিক জয়কে আরও দৃঢ় করবে, নতুন আক্রমণ পরিচালনার জন্য রুশ সেনারা সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পাবে। এক সিনিয়র ইউক্রেনীয় কর্মকর্তা বলেন, রুশরা ছড়াচ্ছে যে, ‘এটি একটি দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর যুদ্ধ হবে। আমাদের আলোচনার টেবিলে বসা এবং ক্ষতিপূরণ চাওয়া উচিত’।

 

 

 

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিন বলেছেন, তিনি চান রাশিয়া দুর্বল হোক এবং পুতিনকে যুদ্ধাপরাধের বিচারের মুখোমুখি করার কথা বলেছেন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বলেছেন, খারাপ কোনও শান্তিচুক্তি মেনে নেওয়া কিয়েভের উচিত হবে না, ইউক্রেনকে অবশ্যই জিততে হবে। জার্মানি ও ফ্রান্স এখনও অনেক অনিশ্চিত। তারা অঙ্গীকার করছে পুতিনকে পরাজিত করার চেয়ে জয়ী হওয়া থেকে ঠেকানোর। একই সময়ে তারা নতুন কঠোর নিষেধাজ্ঞাকে সমর্থন করছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর এক ঘনিষ্ঠ মিত্র বলেছেন, প্রশ্ন হচ্ছে শীতল যুদ্ধে ফেরা অথবা না ফেরা। এটিই বাইডেন, জনসন ও আমাদের মধ্যে পার্থক্য। ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে রাশিয়া তাদের তথাকথিত ‘বিশেষ অভিযান’ শুরু করে।

 

মস্কোর দাবি, ইউক্রেনের বিপজ্জনক জাতীয়তাবাদী ও ইউক্রেনের সামরিক সক্ষমতা খর্ব করার জন্য এই অভিযান আবশ্যক ছিল। এমন লক্ষ্যকে পশ্চিমারা ভিত্তিহীন অজুহাত হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছে। আক্রমণের পর থেকে মস্কো যুক্তি তুলে ধরছে যে, ইউক্রেনের প্রতি পশ্চিমাদের সামরিক সহযোগিতা যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করছে এবং শান্তি আলোচনা থেকে ইউক্রেনকে বিরত রাখছে। মার্চ মাসে ক্রেমলিন শান্তির পূর্বশর্ত হিসেবে দাবি করে, ইউক্রেনকে সামরিক পদক্ষেপ বন্ধ করতে হবে, নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে সংবিধান সংশোধন করতে হবে, ক্রিমিয়াকে রাশিয়ার ভূখণ্ড হিসেবে মেনে নিতে হবে এবং বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নিয়ন্ত্রিত পূর্বাঞ্চলকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। ইউক্রেনীয় ও ফরাসি সূত্র এবং আরও কয়েকটি দেশের কর্মকর্তারা বিষয়টির কূটনৈতিক সংবেদনশীলতা ও নিরাপত্তা নীতির কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে মুক্তভাবে তাদের মত তুলে ধরেছেন। তাদের মতে, নিষেধাজ্ঞা ও যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বৃদ্ধি এবং দেশে বিরোধিতা এবং পুতিনের হাতের খেলার পুতুল হওয়ার ঝুঁকির কারণে বিভাজন আরও বাড়তে পারে।

 

এস্তোনিয়ান প্রধানমন্ত্রী কাজা কাল্লাস সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, শুরু থেকেই এটি স্পষ্ট হতে শুরু করেছে যে দিনি দিন এটি আরও কঠিন থেকে কঠিনতর হবে–যুদ্ধের ক্লান্তি আসছে। আমাদের চেয়ে ভালো প্রতিবেশী যাদের রয়েছে তাদের সঙ্গে হয়ত পার্থক্য থাকবে। পুতিনকে মোকাবিলা ম্যাক্রোঁ সতর্ক করে বলেছেন, কোনও শান্তিচুক্তিতে ১৯১৮ সালে জার্মানির মতো রাশিয়াকে অপমান করা ঠিক হবে না। জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎসের মতো তিনিও ক্রেমলিনের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ উন্মুক্ত রেখেছেন। এতে যুদ্ধের সমর্থক দেশগুলোর সঙ্গে তাদের উদ্বিগ্নতা বাড়ছে। পোল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে ম্যাক্রোঁ ও শলৎসের ফোনালাপকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অ্যাডলফ হিটলারের সঙ্গে আলোচনার তুলনা করেছেন। ম্যাক্রোঁর ঘনিষ্ঠ মিত্র বলেন, এক পর্যায়ের আমাদের মিস্টার পুতিনকে নিয়ে কাজ করতে হবে, যদি না কোনও প্রাসাদ অভ্যুত্থান হয়। এই যুদ্ধকে যতটা সম্ভব সংক্ষিপ্ত করতে হবে। শলৎস বলেছেন, পুতিনের সঙ্গে তার ও ম্যাক্রোঁর ফোনালাপে দৃঢ় ও স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে। গুরুত্বারোপ করে বলা হয়েছে ইউক্রেন থেকে সেনা প্রত্যাহার ও কিয়েভের কাছে গ্রহণযোগ্য শান্তিচুক্তিতে সম্মত না হলে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞার অবসান হবে না। অবশ্য শলৎসের টিমের এক সদস্য বলেছেন, ম্যাক্রোঁর শব্দ চয়ন দুর্ভাগ্যজনক। ম্যাক্রোঁর অবস্থান নিয়ে কয়েকজন ফরাসি রাষ্ট্রদূতও ব্যক্তিগতভাবে হতাশা প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, এতে করে ফ্রান্সের সঙ্গে ইউক্রেন ও পূর্ব ইউরোপীয় মিত্রদের বিচ্ছিন্নতা বাড়তে পারে। সহায়তার জন্য পশ্চিমাদের প্রতি কৃতজ্ঞ ইউক্রেনে যুদ্ধবিরতির চুক্তির জন্য ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।

 

এবং মাঝে মাঝে প্রশ্ন তুলেছে, পশ্চিমা মিত্ররা কার্যকরভাবে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ কিনা। রাশিয়াকে অপদস্ত না করতে ম্যাক্রোঁর হুঁশিয়ারির প্রতিক্রিয়ায় ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিমিত্রো কুলেবা বলেছেন, ফ্রান্স নিজেকেই অপদস্ত করছে। আর শলৎসের সঙ্গে কিয়েভের সম্পর্ক হিমশীতল। ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী উইস্টন চার্চিলের কথা তুলে ধরে সিনিয়র ইউক্রেনীয় কর্মকর্তা বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নজুড়ে আমাদের কোনও চার্চিল নেই। এই বিষয়ে আমাদের কোনও ভ্রান্তি নেই। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, প্রেসিডেন্ট যা বলেছেন তাতে পুতিন বা রাশিয়াকে কোনও ছাড় দেওয়ার মনোভাব ছিল না।

 

ফ্রান্স চায় ইউক্রেনের জয় এবং ইউক্রেনের ভূখণ্ড আগের অবস্থায় ফিরে আসুক। পুতিনের সঙ্গে সংলাপ কোনও আপোস নয় কিন্তু আমরা যেভাবে দেখছি সেভাবে বলছি। এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, সরল বিশ্বাসে রাশিয়ার কাজ করার বিষয়ে সংশয় প্রকাশে বেশি সোচ্চার ওয়াশিংটন। কিন্তু তিনি অস্বীকার করেছেন মিত্রদের কোনও ‘কৌশলগত পার্থক্য’ থাকার কথা। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেছেন, মিত্রদের সঙ্গে কাজ করছে যুক্তরাষ্ট্র। আক্রমণ শুরুর আগে থেকে নাশকতাকারীরা মিত্রদের ঐক্য নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরির চেষ্টা করলেও নিষেধাজ্ঞা, অস্ত্র স্থানান্তর ও অন্যান্য পদক্ষেপ নিয়ে ইউক্রেনকে সহযোগিতা করা হচ্ছে।

 

এসবের লক্ষ্য হলো, আলোচনার টেবিলে ইউক্রেনকে শক্তিশালী অবস্থানে আসীন করানো। দুর্বল রাশিয়া? প্রতিরক্ষামন্ত্রীর মন্তব্যকে ইঙ্গিত করে প্রথম মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, রাশিয়ার নেতৃত্ব পরিবর্তনে যুক্তরাষ্ট্রের কোনও অভিপ্রায় নেই। কিন্তু দেশটিকে দুর্বল দেখতে চায় প্রশাসন। যাতে করে ইউক্রেনে আবার এমন আক্রমণ চালাতে না পারে রাশিয়া। কর্মকর্তার কথায়, সবাই অস্টিনের মন্তব্যের প্রথম অংশ নিয়ে মনোযোগী, দ্বিতীয় অংশ নিয়ে নয়। আমরা রাশিয়াকে এতটা দুর্বল দেখতে চাই যাতে করে এমন কিছু আবার তারা করতে না পারে। জার্মান সরকারের একটি সূত্র জানায়, রাশিয়াকে দুর্বল করতে অস্টিনের লক্ষ্য সমস্যাজনক। দুর্ভাগ্যজনক যে ক্ষমতাসীন জার্মান জোট সরকারের অংশীদার ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্নালেনা বায়েরবক এই লক্ষ্য সমর্থন করছেন। কারণ কখন নিষেধাজ্ঞার অবসান হবে–প্রশ্নটি জটিলতাপূর্ণ ইউক্রেন শান্তিচুক্তি রাজি হোক বা না হোক। জার্মান সরকারের সূত্র আরও জানায়, কয়েকটি পশ্চিমা দেশ হয়ত ইউক্রেন অবাস্তব সামরিক লক্ষ্যের দিকে ধাবিত করছে।

 

 

এর মধ্যে রয়েছে, ২০১৪ সালে রাশিয়ার বিচ্ছিন্ন করা ক্রিমিয়া উপত্যকা পুনরায় দখল করা। এতে সংঘাত দীর্ঘায়িত হতে পারে। জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী বায়েরবক প্রকাশ্যে বলেছেন, ক্রিমিয়া থেকে রুশ সেনা প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত থাকবে। জার্মানিতে নিযুক্ত ইউক্রেনীয় রাষ্ট্রদূত বারবার বার্লিনের সমালোচনা করেছেন কিয়েভকে ভারী অস্ত্র সরবরাহ না করার জন্য। যদিও বার্লিন নিজেদের করা সহযোগিতার কথা দৃঢ়ভাবে তুলে ধরছে।

 

রাশিয়া নিয়ে পশ্চিমাদের অবস্থানে ইউক্রেনের হতাশার ইঙ্গিত দিয়েছেন ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সিনিয়র উপদেষ্টা মিখাইলো পডোলিয়াক। তিনি বলেন, রাশিয়ার জেতা উচিত না, কিন্তু আমরা ভারী অস্ত্র দেবো না–এতে রাশিয়া ক্ষুব্ধ হতে পারে। পুতিনকে হারতে হবে কিন্তু নতুন নিষেধাজ্ঞা জারি করা যাবে না। কোটি মানুষ অভুক্ত কিন্তু আমরা খাদ্যশস্য পরিবহনে সামরিক বহর পাঠাতে রাজি না। তিনি বলেন, এমন নীতি নেওয়া গণতান্ত্রিক বিশ্বের জন্য মূল্যবৃদ্ধির চেয়ে খারাপ কিছু অপেক্ষায় রয়েছে।


Spread the love

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Follow us

আর্কাইভ

June 2022
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930