ধর্মপাশায় কালো রংগের ধান নিয়ে বিপাকে বিক্রি করতে পারছেনা কৃষক

প্রকাশিত: ৬:৫১ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৩১, ২০২৬

ধর্মপাশায় কালো রংগের ধান নিয়ে বিপাকে বিক্রি করতে পারছেনা কৃষক

প্রতিনিধি / সুনামগঞ্জ ::

 

সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নে গত বৈশাখে আগাম বৃষ্টি, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর জলাবদ্ধতার সঙ্গে লড়াই করে কোনো রকমে যে ধান কেটে ঘরে তুলেছেন, সেই ধানই এখন যেন কৃষকের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধান কাটার সময় একদিকে শ্রমিক সংকট ও বাড়তি মজুরি, অন্যদিকে মাড়াই, পরিবহন ও শুকানোর অতিরিক্ত খরচ সব মিলিয়ে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে ছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় বাজারে এসে দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র।

 

যে ধান উৎপাদনে কৃষকের মণপ্রতি খরচ হয়েছে আনুমানিক ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা, সেই শুকনো ধান এখন অনেক জায়গায় বেচতে হচ্ছে মাত্র ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ টাকা দরে। ধানের রং যদি কালো হয় তাহলে আর কোন আড়তদার কিনতে চায় না । ধান কাটার পর বৃষ্টির জন্য শোকাতে দেরি হয়েছে সেই জন্য ধানের রং কালো হয়েছে । কৃষকরা এখন কালো ধান নিয়ে বিপাকে পড়েছে কম দামেও বিক্রি করতে পারছেনা, ফলে কৃষিতে আগ্রাহ হারাচ্ছে কৃষক।

 

সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের কৃষকের কাছে ধান শুধু একটি ফসল নয়।এটা হাওর অঞ্চলের কৃষকের সারা বছরের প্রধান আয়ের উৎস। কিন্তু গত মৌসুমে বৈরী আবহাওয়া কৃষকের সেই স্বপ্নে ভেঙে গেছে। চলতি বছরের মার্চেই সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওরে ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে বোরো ধান ডুবে যাওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় জলাবদ্ধতা ও আগাম বন্যার আশঙ্কায় কৃষকের মধ্যে উদ্বেগও তৈরি হয়েছিল।কোনো কোনো কৃষক বাধ্য হয়ে আধাপাকা ধান কেটেছেন। আবার যারা ধান ঘরে তুলেছেন তাদের সামনে তৈরি হয়েছে নতুন সংকট- ধান রাখবেন, নাকি লোকসানে বিক্রি করবেন? কৃষকদের হিসাব অনুযায়ী, ধান কাটার সময় একজন শ্রমিককে দিতে হয়েছে প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা।

 

এরপর ধান মাড়াই, পরিবহন, শুকানো, শ্রমিকের মজুরি ও অন্যান্য খরচ যোগ হয়েছে। ফলে শুকনো ধানের প্রকৃত উৎপাদন ব্যয় দাঁড়িয়েছে মণপ্রতি আনুমানিক ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা। অথচ বর্তমান স্থানীয় বাজারে সেই ধান বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ টাকায়-। কালো রংগের ধান বিক্রি করা যাচ্ছে না। কৃষকের ভাষ্য মতে ধান বেচে খরচই উঠছে না।

 

ধান কাটার মৌসুমে অনেক কৃষক তাৎক্ষণিক না বেচে শুকিয়ে মজুদ করে রেখেছিলেন। তাদের আশা ছিল- কয়েক মাস পর বাজারে দাম বাড়বে। কিন্তু দুঃখের কথা সেই প্রত্যাশা পূরণ না হয়ে উল্টো মজুদ করা ধান এখন কৃষকের জন্য গলার কাটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃষকের ধান ঘরে রাখলে প্রয়োজন হয় নিরাপদ সংরক্ষণ স্থল। পোকামাকড় ও আর্দ্রতা থেকে ধান রক্ষা করতে হয়। কৃষকের হাতে নগদ টাকা থাকেনা।

 

ধান বেচে পরিবারের প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে হয়। লোকসানে ধান বেচবেন, নাকি আরও কিছুদিন অপেক্ষা করবেন? কৃষকের এসব প্রশ্নের জবাব কে দেবেন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সরকারি ধান সংগ্রহমূল্য মণপ্রতি ১ হাজার ৪৪০ টাকা নির্ধারণের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। যদি কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ই মণপ্রতি ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা হয়, তাহলে সরকারি নির্ধারিত মূল্যেও কৃষকের প্রকৃত লাভ কতটা- সেটি আলাদা করে হিসাব করা জরুরি। আর মাঠপর্যায়ে যদি কৃষক ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ টাকায় ধান বেচতে বাধ্য হন, তাহলে সরকারি ঘোষিত সংগ্রহমূল্যের সুবিধা তার কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না- সেটিও অনুসন্ধানের বিষয়।

 

পাইকুরাটি ইউনিয়নের টগা হাওরের কৃষক মির্জা রেজাউল করিম রেজু বলেন, ধান ফলাইতে এবং  শুকাইয়া ঘরে তুলতে করছ ১৪০০ টাকা মন , বেশি লাভের আশায় মজুত রাখছিলাম। আর এহন এই ধান কালো রং হওয়ায় বিক্রি করতে পারছিনা।

 

ধর্মপাশা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আসায়াদ বিন খলিল রাহাত বলেন, সরকারি বেঁধে দেওয়া দামের চেয়ে বাজারে ধানের দাম কম। এতে কৃষকের কষ্ট হচ্ছে, তাছাড়া ধানের রঙ কালো হওয়ায় সমস্যা । অতি বৃষ্টির ফলে সময় মতো রোদ না পাওয়ায় এ রকম হয়েছে। সরকারি প্রণোদনা দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

 

এছাড়া কৃষকদের জন্য সরকার কৃষি কার্ড করে দেওয়া উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আশা করি আগামি এক দুই সপ্তাহের মধ্যে ধানের দাম বাড়বে। ধর্মপাশা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইউএনও জনি রায় বলেন, হঠাৎ করে প্রাকৃতিক দুরযোগের কারনে এমনটা হয়েছে। কৃষকদের সরকারি প্রনোদনা দেওয়া হচ্ছে, সামনে বোর মৌসুমে বীজ সহ আরো প্রনোদনা দেওয়া হবে। কালো ধান বিক্রি করতে পারছেনা কৃষক, সেই বিষয়টি উপরের সংশ্লিষ্টদের অবহিত করা হবে।

Spread the love

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

আর্কাইভ

August 2026
M T W T F S S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31