সিলেট ১২ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৮শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৬:২২ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৮, ২০২৫

প্রতিনিধি/বালাগঞ্জঃঃ
সরল বিশ্বাসে ৫০ হাজার টাকা ধার দেওয়াই যে কাল হবে জানতেন না হেপি বেগম। পাওনা টাকার জন্য চাপ দেওয়ায় হেপির কলেজ পড়ুয়া মেয়ে খাদিজা বেগম হাবিবাকে অপহরণ করা হয় বলে অভিযোগ ওঠেছে। মেয়েকে উদ্ধারে তৎপর হলে পরিবারের উপর নেমে আসে অমানুসিক নির্যাতন।
আদালত আর থানা পুলিশের কাছে ধর্ণা দিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে হেপির পরিবার। ভুক্তভুগী হেপি বেগম সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার দেওয়ান বাজার ইউনিয়নের শিওরখাল-বড়জমাত গ্রামের আব্দুল হকের স্ত্রী। মেয়েকে অপহরণ ও হুমকি-ধমকির ঘটনায় ২৭ মে বালাগঞ্জ থানায় হেপির দেওয়া অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এসআই শাহ্ ফরিদ আহমদ ভিকটিমের বাড়িতে গিয়ে তদন্ত করেন। এসব বিষয়ে পৃথক ভাবে ৪টি মামলা দায়ের করেও তিন মাসেও অপহৃত মেয়ের সন্ধান পাননি।
হেপি বেগম অভিযোগ করে বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা আমাকে থানায় ডেকে পাঠালেও উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক তোফায়েল আহমদ সুহেল দলীয় প্রভাব খাটিয়ে মামলা না নিতে পুলিশকে চাপ দেন। এজন্য মামলার অগ্রগতি করেনি পুলিশ।
হেপি বেগমের মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, ২৫ মার্চ শিওরখাল কদমতলা গ্রামের আব্দুল খালিকের ছেলে কয়েস তার আর্থিক সংকটের কথা বলে হেপির কাছ থেকে টাকা ধার নেন। টাকা ফেরৎ চাইলে ক্ষিপ্ত হন তার ভাই লিটন। বিএনপি নেতা সুহেলের সেল্টারে ২৮এপ্রিল হেপির মেয়ে হাবিবা বেগমকে(১৯)কে উপজেলাল মোরার বাজার থেকে অপহরণ করেন লিটনসহ তার সহযোগিরা।
এই ঘটনায় লিটনকে প্রধান অভিযুক্ত করে ৩জুন আদালতে একটি অপহরণ মামলায় দায়ের করেন হেপি বেগম। মামলায় লিটনের ভাই কয়েস, সেজন, সাজন, বোন রিতা, হেলিমা, পশ্চিম হায়দরপুর গ্রামের কামাল ও শিওরখাল বড়জমাত গ্রামের এমরানকে অভিযুক্ত করা হয়। পিবিআই মামলাটি তদন্ত করছে। কিন্তু দীর্ঘ বিলম্বে তদন্ত প্রতিবেদন না দেওয়ায় হতাশ হেপির পরিবার।
২৮জুলাই বিকেলে বালাগঞ্জ উপজেলা প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে বিগত ৫মাসে তার পরিবারের উপর হয়ে যাওয়া নির্যাতনের আদ্যোপান্ত তুলে ধরে হেপি বেগম বলেন, সন্ত্রাসীদের অব্যাহত হুমকি, দুই দফায় বসতঘর ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ভীত স্বন্ত্রস্থ পরিবার গৃহবন্দি হয়ে পড়েন। তার সন্তানেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেতে পারছে না। কিন্তু বাধ্য হয়ে বারবার মামলা করেও কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না তিনি।
লিখিত বক্তব্য ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, হেপি জানতে পারেন তার মেয়েকে অপহরণ করে উপজেলার নলজুড় গ্রামে লিটন ও কয়েসের মামার বাড়িতে আটকে রাখা হয়। মেয়েকে উদ্ধার করতে আবারও থানা পুলিশের দ্বারস্থ হলে পুলিশের কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা মিলেনি। ৮ জুলাই আদালতে মামলা করলে আদালত ভিকটিমকে ১০জুলাইয়ের মধ্যে উদ্ধারে বালাগঞ্জ থানার ওসিকে নির্দেশ দেন।
হেপির অভিযোগ, তল্লাশীর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এসআই সৌরভ সাহা খরছের কথা বলে তাদের কাছ থেকে টাকা-পয়সা নেন। আবার বড় অঙ্কের টাকার বিনিময়ে অভিযুক্ত সন্ত্রাসীদের সাথে আতাত করে হেপির পরিবারকে না জানিয়ে তিনি লোক দেখানো তল্লাশী করেন। যথাস্থানে ভিকটিমকে পাওয়া যায়নি উল্লেখ করে অভিযুক্তদের মনোনিত লোকজনের স্বাক্ষর নিয়ে তড়িঘড়ি করে ৯জুলাই ‘শূন্য তল্লাশী’ নামে আদালতে প্রতিবেদন প্রেরণ করায় রীতিমত বিষ্মিত হন হেপির পরিবার।
এদিকে, ৪জুন আদালতে হেপির দায়ের করা মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, অভিযুক্তদের শেল্টারদাতা সুহেলের প্রত্যক্ষ উস্কানিতে ২৭ মে হেপির বসতঘর ভাঙচুর করা হয়। টাকা- স্বর্ণালঙ্কার লুট করে বসতঘরে অগ্নি সংযোগ করলে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণ করেন। স্থানীয়ভাবে বিচার না পেয়ে আদালতে এই মামলাটি করেন তিনি। আবারও শুরু হয় নির্যাতন।
সংবাদ সম্মেলনে হেপি বলেন, ১৯ জুন বিএনপি নেতা সুহেলের প্রত্যক্ষ ইন্ধনে অভিযুক্তরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে আমার বাড়িতে আরেক দফা ভাঙচুর ও লুটপাট করে। গরুর ঘর, খড়ের ঘরসহ বসতঘরে পেট্রোল ছিটিয়ে অগ্নি সংযোগ করা হলে ৩টি ষাঁড় গরুসহ সব কিছু পুড়ে ছাই হয়ে যায়। ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগে আমার পরিবার ক্ষতিগ্রস্থ, নিঃস্ব। সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে নিরাপত্তার জন্য ফের থানায় মামলা করতে যাই। হামলাকারী সন্ত্রাসীরা প্রভাবশালী হওয়ায় এবং তারা বিএনপি নেতা সুহেলের আশ্রয়-পশ্রয়ে থাকায় থানা পুলিশ মামলা নিতে অনীহা দেখিয়ে বলে আদালতে গিয়ে মামলা করেন। ন্যায় বিচারের আশায় ২৯জুন সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন আমার স্বামী আব্দুল। আদালত মামলাটি নথিভুক্ত করে বালাগঞ্জ থানার ওসিকে এটি মামলা হিসেবে রুজু করে ৩০ জুনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য নির্দেশ দেন। এই মামলায় বিএনপি নেতা সুহেলসহ সেজন, লিটন, শিওরখাল গ্রামের সালমান, এমরান, কয়েস, শিওরখাল কদমতলা গ্রামের কামিলসহ আরও ৩-৪জনকে অভিযুক্ত করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে হেপির স্বামী আব্দুল হক অভিযোগ করে বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা এসআই শাহ ফরিদ আহমদ আর্থিক সুবিধা নিয়ে রহস্যজনক ভূমিকা পালন করছেন। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও কালক্ষেপণ করে এখনও তদন্ত প্রতিবেদন প্রেরণ না করায় আমরা ন্যায় বিচার পওয়া নিয়ে শঙ্কিত।