সিলেট ১৮ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৬:০৫ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৮, ২০২৬
প্রতিনিধি / সুনামগঞ্জ ::
পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ও প্রয়োজনীয় কোনো ধরনের নিরাপত্তা অনুমোদন ছাড়াই সুনামগঞ্জের ছাতকে আশঙ্কাজনক হারে গড়ে উঠেছে কাঠজ্বালিত চুনের চুল্লি (স্থানীয় ভাষায় ‘পাজু’)। এসব চুল্লিতে চুনাপাথর পোড়াতে প্রতি মাসে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি কাঠ ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন চরম জ্বালানি সংকট ও বনাঞ্চল উজাড় হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, অন্যদিকে ঘন বিষাক্ত ধোঁয়া, চুনের গুঁড়া ও তীব্র দুর্গন্ধের কারণে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে স্থানীয় পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের সূত্রমতে, বর্তমানে ছাতক পৌরসভা ও উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় শতাধিক পাজু চালু রয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, এ সংখ্যা দুই শতাধিক। ছাতক-গোবিন্দগঞ্জ সড়কের দুই পাশ, সুরমা নদীর তীর, বৌলা ও তাতিকোনাসহ বিভিন্ন ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছাকাছি এসব পাজু গড়ে উঠেছে। ফলে কোমলমতি শিক্ষার্থী, পথচারী ও অধিবাসীরা প্রতিনিয়ত বিষাক্ত ধোঁয়া ও চুনের ধুলাবালির মধ্যে যাতায়াত করতে বাধ্য হচ্ছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, একটি পাজুতে মাসে দুই দফায় চুনাপাথর পোড়ানো হয়, যার জন্য প্রয়োজন হয় প্রায় ৭ টন কাঠ। সেই হিসেবে ২০০টি পাজুতে প্রতি মাসে আনুমানিক ১ হাজার ৪০০ টন কাঠ পোড়ানো হচ্ছে। সিলেট বিভাগের বিভিন্ন এলাকা থেকে দৈনিক ২০ থেকে ৩০টি ট্রাক ও পিকআপ ভর্তি কাঠ ছাতকে প্রবেশ করছে, যা স্থানীয় বাজারে জ্বালানি কাঠের দাম বাড়ানোর পাশাপাশি বনাঞ্চলের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে।
পাজু থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া ও ফ্লাই অ্যাশ (উড়ন্ত ছাই) বাতাসে মিশে পরিবেশ দূষিত করছে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে এ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। ছাতক উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নুসরাত জাহান জানান, শিল্প এলাকা হওয়ায় এমনিতেই এখানে পরিবেশজনিত রোগীর সংখ্যা বেশি, তবে গত কয়েক মাসে এ ধরনের রোগীর চাপ আরও বেড়েছে।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল ইসলাম বিষয়টিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক উল্লেখ করে বলেন, “ছাতক বর্তমানে একটি অনিয়ন্ত্রিত দূষণপ্রবণ এলাকায় পরিণত হয়েছে। অবৈজ্ঞানিক চুল্লি থেকে নির্গত ধোঁয়া ও ক্ষতিকর কণা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। বৃক্ষনিধনের ফলে দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে। প্রশাসনের কঠোর নজরদারির পাশাপাশি এ খাতকে সুপরিকল্পিত ও পরিবেশসম্মত শিল্পে রূপান্তর করা জরুরি।”
এদিকে পাজু ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি সালেক মিয়া ও সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল আলম দাবি করেন, এটি ছাতকের বহু পুরোনো ব্যবসা এবং বহু মানুষের জীবিকা এর ওপর নির্ভর করছে।
সরকার চাইলে পরিবেশসম্মত নীতিমালা প্রণয়ন করে এ খাতকে বৈধতা দিয়ে রাজস্ব আদায় করতে পারে। তবে পাজুগুলোর ট্রেড লাইসেন্স থাকার দাবি করা হলেও পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো অনুমতি নেই।
সুনামগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মোহাইমিনুল হক স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, এসব পাজুর কোনো ছাড়পত্র নেই। ইতোমধ্যে পাজু মালিকদের নোটিশ ও জরিমানা করা হয়েছে এবং কাঠ সরবরাহ বন্ধে বন বিভাগকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। ক্ষতিকর এসব পাজু স্থায়ীভাবে বন্ধে প্রশাসন পদক্ষেপ নিচ্ছে।
ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মহি উদ্দিন বলেন, “কাউকে অবৈধভাবে চুনের ভাটা স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়নি। পরিবেশ অধিদপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুতই পাজু মালিকদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” বন বিভাগের বিট কর্মকর্তা কেবিএম ফেরদুসও জনবল সংকটের কথা জানিয়ে যৌথ অভিযানের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।
গ্যাসসংকট ও বাজারে চুনের দাম বৃদ্ধির সুযোগে রাতারাতি গড়ে ওঠা এসব অবৈধ পাজু বন্ধে অনতিবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ছাতকের চরম দুর্ভোগে থাকা সর্বস্তরের জনগণ।