সিলেট ১১ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৮শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৪:৪৮ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১০, ২০২৬
প্রতিনিধি / জগন্নাথপুর ::
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এ নির্বাচনে সুনামগঞ্জ-৩ (জগন্নাথপুর-শান্তিগঞ্জ) আসনে শেষ সময়ে জমে উঠেছে নির্বাচনী আমেজ। প্রার্থীদের শেষ মুহুর্তের প্রচারণা তুঙ্গে রয়েছে। নির্বাচনী আলোচনায় চারমুখি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া গেছে। সময় যতো ঘনিয়ে আসছে, ততোই বাড়ছে নির্বাচনী উত্তাপ। নিজের বিজয় নিশ্চিতের লক্ষ্যে সর্বশক্তি নিয়ে মাঠে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন প্রার্থীরা। ভোটারদের আকৃষ্ট করতে দিচ্ছেন নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। সময়ে সময়ে পাল্টাচ্ছেন নির্বাচনী কৌশল। বিজয়ের জন্য প্রার্থীরা মরিয়া হয়ে উঠেছেন। প্রার্থীদের পক্ষে দেশে ও বিদেশে থাকা সমর্থকরা কাজ করছেন। জগন্নাথপুর প্রবাসী অধ্যূষিত উপজেলা হওয়ায় নির্বাচনে প্রবাসীদের ভূমিকা সব সময় থাকে। এবারের নির্বাচনেও প্রবাসীদের প্রভাব পড়েছে।
এছাড়া স্থানীয় ভোটারদের অধিকাংশ প্রবাসী স্বজনদের কথায় ভোট প্রদান করেন। তবে এবার আওয়ামীলীগ বিহীন নির্বাচনে ভিন্ন প্রভাব পড়েছে। আওয়ামীলীগের ভোট নির্বাচনে গুরুত্বপর্ণ ভূমিকা পালন করবে। আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা ভোট প্রয়োগ করলে নির্বাচনের ফলাফল থাকবে এক ধরণের। আর নির্বাচনে অংশ না নিলে অন্য রকম প্রভাব পড়বে। নির্বাচনী আলোচনায় ঘুরেফিরে আওয়ামীলীগের নাম উঠে আসছে। সাথে রয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নাম। নির্বাচনী হিসাব নিকাশ কষতে গিয়ে আওয়ামীলীগ ও জামায়াতের কথা বলছেন স্থানীয় ভোটাররা। নির্বাচন এলেই প্রবাসীরা প্রার্থীরা ছুটে আসেন অংশ নিতে। অংশ নিয়ে আবার অনেকে বাজিমাত করেন। এবারো তাই হতে পারে। এ অঞ্চল সব সময় আওয়ামীলীগের ঘাঁটি ছিল। ফলে সুনামগঞ্জ-৩ আসন একটি মর্যাদার আসন। এ আসনে আওয়ামীলীগের এমপি ছিলেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রয়াত জাতীয় নেতা আলহাজ আবদুস সামাদ আজাদসহ অনেকে। সর্বশেষ আওয়ামীলীগের পকিল্পনামন্ত্রী ছিলেন এমএ মান্নান। তাঁদের কারণে এ আসনটি অধিক মর্যাদার পরিচিতি পায়।
এবারের নির্বাচনে মোট ৭ জন প্রার্থীর মধ্যে ৬ প্রার্থী প্রতিদ্বন্ধিতা করছেন। তাঁরা হলেন, ইসলামী ঐক্যজোট তথা বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস মনোনীত প্রার্থী এ আসনের সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট মাওলানা শাহীনুর পাশা চৌধুরী (রিকশা), বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদীদল বিএনপি মনোনীত প্রার্থী যুক্তরাজ্য বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক কয়ছর এম আহমদ (ধানের শীষ), স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিষ্টার আনোয়ার হোসেন (তালা), আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) মনোনীত প্রার্থী সৈয়দ তালহা আলম (ঈগল), খেলাফত মজলিস মনোনীত প্রার্থী শেখ মুস্তাক আহমদ (দেয়াল ঘড়ি), স্বতন্ত্র প্রার্থী মাহফুজুর রহমান খালেদ তুষার (টেবিল ঘড়ি) ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হোসাইন আহমদ (ফুটবল)। এর মধ্যে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন খেলাফত মজলিস মনোনীত প্রার্থী শেখ মুস্তাক আহমদ (দেয়াল ঘড়ি)।
এর মধ্যে অ্যাডভোকেট মাওলানা শাহীনুর পাশা চৌধুরী, কয়ছর এম আহমদ ও সৈয়দ তালহা আলম জগন্নাথপুর উপজেলার বাসিন্দা। ব্যারিষ্টার আনোয়ার হোসেন, মাহফুজুর রহমান খালেদ তুষার ও হোসাইন আহমদ শান্তিগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা। নির্বাচনী ভোট কাস্টিং হিসাব নিকাশে সব সময়ই আঞ্চলিকতার প্রভাব পড়ে থাকে। এবারো অন্যতা হবে না। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রয়াত জাতীয় নেতা আলহাজ আবদুস সামাদ আজাদের আমল থেকে দীর্ঘকাল জগন্নাথপুর উপজেলার বাসিন্দা এ আসনে এমপি ছিলেন। তবে এমএ মান্নানের আমল থেকে শান্তিগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা এমপি ছিলেন। তাই জাতীয় সংসদ নির্বাচন আসলেই এ অঞ্চলে আঞ্চলিকতার প্রভাব পড়ে থাকে। তবে এবারের নির্বাচনে নিরব আ.লীগ ও জামায়াত। তাদের ভোটের হিনাব-নিকাশ মেলাচ্ছেন প্রার্থীরা।
জগন্নাথপুর ও শান্তিগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন ভোটারদের সাথে পৃথক আলোচনায় তারা জানান, সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট মাওলানা শাহীনুর পাশা চৌধুরী জমিয়তে থাকতে হেভিওয়েট প্রার্থী ছিলেন। তিনি সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রয়াত জাতীয় নেতা আলহাজ আবদুস সামাদ আজাদ ও সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নানের সাথে প্রতিদ্বন্ধিতা করেছেন। তবে বিগত নির্বাচনে দল বদল করে সোনালী আঁশ প্রতীকে নির্বাচন করায় তাঁর জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েছে। তবুও এবারের নির্বাচনে ইসলামী ঐক্যজোটের প্রার্থী হওয়ায় এবং খেলাফত মজলিস প্রার্থী শেখ মুস্তাক আহমদ নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোায় কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন তিনি।
কয়ছর এম আহমদ তিনি জগন্নাথপুর পৌর শহরের ছিলিমপুর গ্রামের বাসিন্দা হলেও রাজনীতি করেছেন যুক্তরাজ্যে। তিনি তাঁর ক্ষমতার দাপটে নিজ পছন্দের নেতাকর্মীদের নিয়ে জগন্নাথপুর ও শান্তিগঞ্জ উপজেলা বিএনপি সাঁজিয়েছেন। ফলে বঞ্চিত নেতাকর্মীরা তাঁর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। তবুও তিনি নতুনমুখ প্রবাসী প্রার্থী হয়েও নির্বাচনী আলোচনায় প্রথম সারিতে রয়েছেন। বিশেষ করে যুক্তরাজ্য থেকে তাঁর পক্ষে দেশে এসে মাঠে নেমেছেন অনেক পরিচিতমুখ প্রবাসীরা। তাছাড়া সাবেক জগন্নাথপুর উপজেলা চেয়ারম্যান আতাউর রহমানও তাঁর পক্ষে কাজ করছেন। ফলে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে আলাদা আমেজ বিরাজ করছে। এতে কয়ছর এম আহমদের পক্ষে জমে উঠেছে নির্বাচনী উৎসব।
ব্যারিস্টার আনোয়ার হোসেন একজন নতুনমুখ প্রবাসী প্রার্থী হলেও তাঁর পক্ষে বিভিন্ন বলয় থেকে নেতাকর্মীরা কাজ করছেন। এছাড়া কয়ছর এম আহমদ বিরোধী বিএনপির নেতাকর্মীরা তাঁকে সমর্থন করেছেন। শুধু তাই নয়, বিএনপি থেকে মনোনয়ন বঞ্চিত জননেতা এমএ কাহার, সাবেক মেজর সৈয়দ আশফাক আহমদ সামীসহ কয়েকজন প্রার্থীও তাদের কর্মী-সমর্থক নিয়ে তাঁর পক্ষে প্রকাশ্যে কাজ করছেন। তাছাড়া বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ লে.কর্ণেল অব সৈয়দ আলী আহমদ, সাবেক জগন্নাথপুর পৌরসভার মেয়র ও জগন্নাথপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আক্তার হোসেনও তাঁর পক্ষে কাজ করায় চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে নির্বাচনী উত্তাপ। ফলে প্রথম সারির আলোচনায় চলে এসেছেন তালা প্রতীক নিয়ে ব্যারিষ্টার আনোয়ার হোসেন। আনোয়ার হোসেন বলয়ের প্রধান টার্গেট হচ্ছে আওয়ামীলীগের ভোট। ফলে কয়ছর এম আহমদ ও ব্যারিস্টার আনোয়ার হোসেনের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই জমে উঠেছে।
সৈয়দ তালহা আলম বিগত জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী হয়ে সবাইকে রীতিমতো চমকে দিয়েছিলেন। আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন নির্বাচনী ফলাফলে। ফলে তাঁর ইমেজ বৃদ্ধি পায়। তবে দল বদল করায় কিছুটা হলেও তার জনপ্রিয়তা কমেছে। তবুও এবারের নির্বাচনে ব্যক্তি ইমেজে ভোটারদের পছন্দের তালিকায় তিনি থাকায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন।
সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচনে সুনামগঞ্জ-৩ আসনে সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট মাওলানা শাহীনুর পাশা চৌধুরী, কয়ছর এম আহমদ, ব্যারিস্টার আনোয়ার হোসেন ও সৈয়দ তালহা আলমের মধ্যে চারমুখি লড়াই জমে উঠেছে। তাঁদের মধ্যে কে হচ্ছেন আগামী এমপি তা দেখার আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় রয়েছেন কৌতুহলী মানুষজন।
৯ ফেব্রুয়ারি সোমবার জগন্নাথপুরে কয়ছর এম আহমদের ধানের শীষের সমর্থনে জনসভায় উপস্থিতি ছিল লক্ষ্যনীয়। এতে ধানের শীষের ব্যাপক সাড়া পড়েছে। এছাড়া ব্যারিষ্টার আনোয়ার হোসেনের তালা প্রতীকের সমর্থনে সভা ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে উপস্থিতি ছিল সরব। আলিম উদ্দিন, ইলিয়াছ মিয়া, এনামুল হক, আছলম উল্লাহসহ পথচারী জনতাদের মধ্যে অনেকে জানান, এ আসটি আওয়ামীলীগের। এবার আওয়ামীলীগ নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় সবাই দাবিদার। মাওলানা শাহীনুর পাশা চৌধুরী একবার অল্প দিনের জন্য হলেও এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। বিএনপি তো ছিল না। তাই এবারের নির্বাচনে এ আসনটি বিএনপির দখলে নিতে তারা মরিয়া হয়ে উঠেছে। একই সাথে স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার আনোয়ার হোসেনও নির্বাচনী দৌড়ে এগিয়ে আছেন। মাওলানা শাহীনুর পাশাও ধরে রাখতে চাইছেন। সুযোগে সৈয়দ তালহা আলমও ভাগ বসাচ্ছেন। তবে শেষ পর্যন্ত কে হচ্ছেন এমপি তা দেখার অপেক্ষায় আছি।
এক প্রশ্নের জবাবে তারা জানান, এবারের নির্বাচনে আওয়ামীলীগের নিরব ভোট। তাদের কোন প্রার্থী নেই। তাই কে কোন দিকে ভোট দিবে কি না, তা এখনো বলা যাচ্ছে না। সব মিলিয়ে আওয়ামীলীগ বিহীন নির্বাচনে আওয়ামীলীগের আসন দখলে নিতে মরিয়া সবাই। যদি আওয়ামীলীগ নির্বাচনে অংশ নিতো, তাহলে বুঝা যেত কার দৌড় কতদূর।