শেষ মুহূর্তে কানাডার পণ্যে শুল্ক স্থগিত করল ট্রাম্প

প্রকাশিত: ৪:০৪ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২০, ২০২৬

শেষ মুহূর্তে কানাডার পণ্যে শুল্ক স্থগিত করল ট্রাম্প

আন্তর্জাতিক ডেস্ক ::

 

কানাডা থেকে আমদানি করা বিভিন্ন পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে তা স্থগিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। শেষ মুহূর্তের এই সমঝোতায় আপাতত নতুন করে বাণিজ্যযুদ্ধের আশঙ্কা থেকে স্বস্তি পেয়েছেন কানাডীয় রপ্তানিকারকেরা।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবার রাতে জানান, কানাডার পণ্যে প্রস্তাবিত শুল্ক কার্যকর তিন দিনের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। পরে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি নিশ্চিত করেন, যুক্তরাষ্ট্র আগামী ২২ আগস্ট পর্যন্ত শুল্ক স্থগিত রাখতে সম্মত হয়েছে। বার্তাসংস্থা আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।

 

প্রায় ২০ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের কানাডীয় পণ্যে এই শুল্ক আরোপের কথা ছিল। এর আওতায় ইলেকট্রনিকস, শিল্পযন্ত্র, আসবাবপত্র, দুগ্ধজাত পণ্য ও ওয়াইনের মতো বিভিন্ন পণ্য পড়ার কথা ছিল।

ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে বলেন, দুই দেশ একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে, তবে চুক্তির নথিপত্র এখনো চূড়ান্ত করা বাকি। এর আগে মঙ্গলবার ট্রাম্প ও কার্নির মধ্যে বাণিজ্য আলোচনা হয়। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা উত্তেজনাপূর্ণ আলোচনার পর এই বৈঠকেই শেষ মুহূর্তের অগ্রগতি আসে।

 

তবে সমঝোতার বিস্তারিত কোনো পক্ষই প্রকাশ করেনি। ট্রাম্পের বক্তব্যে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিতর্কিত কিস্টোন এক্সএল তেল পাইপলাইন প্রকল্পের বিষয়টি উঠে এসেছে।

 

ট্রাম্প বলেন, সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সময়ে বন্ধ হয়ে যাওয়া ‘গ্রেট কিস্টোন এক্সএল পাইপলাইন’ আবার চালু হতে পারে। প্রস্তাবিত এই পাইপলাইনের মাধ্যমে কানাডার আলবার্টা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নেব্রাস্কা পর্যন্ত প্রতিদিন প্রায় ৮ লাখ ৩০ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবহনের পরিকল্পনা ছিল।

 

২০০৮ সালে প্রথম প্রস্তাবের পর থেকেই প্রকল্পটি পরিবেশগত ও রাজনৈতিক বিরোধিতার মুখে পড়ে। ২০২১ সালে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন যুক্তরাষ্ট্রের অংশের গুরুত্বপূর্ণ অনুমোদন বাতিল করলে প্রকল্পটির কার্যক্রম কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।

 

আন্তর্জাতিক ব্যবসাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ আন্দ্রেয়াস শোটার মনে করেন, আলোচনায় কিস্টোন এক্সএল পাইপলাইনকে যুক্ত করার পেছনে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ও মানসিক বিষয়ও কাজ করতে পারে। তার মতে, প্রকল্পটি বাইডেন বন্ধ করেছিলেন এ বিষয়টি ট্রাম্পের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

 

তবে কানাডার প্রধানমন্ত্রী কার্নি সতর্ক করে বলেছেন, আলোচনায় ‘উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি’ হলেও এখনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাকি রয়েছে। তিনি বলেন, আলোচনার পাশাপাশি কানাডা দেশের অভ্যন্তরে আরও শক্তিশালী, স্বাধীন ও প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।

 

কানাডার জন্য এই শুল্ক স্থগিতের সিদ্ধান্ত বিশেষ স্বস্তির। দেশটির মোট রপ্তানির প্রায় ৭০ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে যায়। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের মোট রপ্তানির প্রায় ৩০ শতাংশের গন্তব্য কানাডা।

 

গত মাসে ট্রাম্প ১৯৩০ সালের ট্যারিফ আইনের ৩৩৮ নম্বর ধারা প্রথমবারের মতো ব্যবহার করে কানাডার বিরুদ্ধে নতুন শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ি, দুগ্ধজাত পণ্য ও অ্যালকোহলযুক্ত পানীয়ের ক্ষেত্রে কানাডার ‘বৈষম্যমূলক আচরণের’ অভিযোগ তুলে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।

 

সাম্প্রতিক প্রস্তাবিত শুল্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা বাণিজ্য চুক্তির (ইউএসএমসিএ) আওতায় এতদিন শুল্কমুক্ত থাকা পণ্যও এর আওতায় পড়ার কথা ছিল। ফলে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের শুল্কমুক্ত বাণিজ্যব্যবস্থা বড় ধরনের ধাক্কার মুখে পড়তে পারত।

 

চুক্তি থেকে ছাড় পাওয়ার লক্ষ্যে কানাডার কর্মকর্তারা কয়েক সপ্তাহ ধরে ওয়াশিংটনে আলোচনা চালিয়ে আসছেন। প্রধানমন্ত্রী কার্নি এর আগে আলোচনাকে ‘কঠিন’, ‘স্পর্শকাতর’ ও ‘তীব্র’ বলে বর্ণনা করেছিলেন।

 

অন্যদিকে কানাডার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও আলোচনাকে জটিল করে তুলেছে। দেশটির ১০টি প্রদেশের মধ্যে আটটি গত বছরের শুরু থেকে মার্কিন তৈরি অ্যালকোহলযুক্ত পানীয় বিক্রি বন্ধ রেখেছে। ট্রাম্প প্রশাসন এটিকেও নতুন শুল্ক আরোপের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

 

দুগ্ধ, ডিম ও পোলট্রির উৎপাদন এবং আমদানিতে কানাডার সরবরাহ ব্যবস্থাপনা নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি রয়েছে। তবে কানাডার প্রাদেশিক নেতারা এ বিষয়ে বড় ধরনের ছাড় দিতে অনাগ্রহী।

 

এদিকে ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতির কারণে কানাডীয়দের মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী মনোভাব বেড়েছে। জুলাইয়ে ন্যানোস রিসার্চের এক জরিপে ৬৯ শতাংশ কানাডীয় জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র অ্যালকোহল বিক্রির নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলেও তারা মার্কিন অ্যালকোহল কেনার সম্ভাবনা কম।

 

অন্যদিকে চলতি মাসে অ্যাঙ্গাস রিড ইনস্টিটিউটের এক জরিপে ৪৮ শতাংশ কানাডীয় যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন। বিপরীতে ৪৫ শতাংশ তাদের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব জানিয়েছেন।

 

ব্রিটিশ কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক স্টুয়ার্ট প্রেস্ট বলেন, ট্রাম্পের বাণিজ্য হুমকির জবাবে কানাডীয়দের মধ্যে জাতীয় আত্মমর্যাদা ও দৃঢ়তার অনুভূতি তৈরি হয়েছে। তার মতে, নতুন শুল্ক নির্দিষ্ট কিছু খাতের জন্য বড় ক্ষতি বয়ে আনতে পারে এ নিয়ে কানাডীয়রা উদ্বিগ্ন। তবে একই সঙ্গে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার বিষয়টিও তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

 

এখন ২২ আগস্টের মধ্যে দুই দেশ চূড়ান্ত কোনো বাণিজ্য চুক্তিতে পৌঁছাতে পারে কি না, সেটিই মূল প্রশ্ন। শুল্ক স্থগিতের এই সাময়িক সমঝোতা শেষ পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্য শান্তির পথ তৈরি করে, নাকি আবারও নতুন করে শুল্কযুদ্ধ শুরু হয় তা নির্ভর করছে আগামী কয়েক দিনের আলোচনার ওপর।

Spread the love

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

আর্কাইভ

August 2026
M T W T F S S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31