সিলেটে বাড়ছে অসন্তোষ, চাপা ক্ষোভ

প্রকাশিত: ৩:৫৯ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ৯, ২০২৫

সিলেটে বাড়ছে অসন্তোষ, চাপা ক্ষোভ

লন্ডন বাংলা ডেস্ক ::

 

‘বিষয়টি অনেকটা মাথা ব্যথা হলে মাথা কেটে ফেলার মতো। নইলে সামগ্রিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতির জন্য আপনি রাত সাড়ে ৯টার পর দোকান-পাট খোলা রাখতে পারবেন না- এটা কেমন সিদ্ধান্ত? এতেতো নাগরিক অধিকার খর্ব হচ্ছে। অনেক মানুষেরই অসুবিধা হচ্ছে। আসলে সরকারি টাকায় এসির নিচে বসে যাদের জীবন চলে তারা মাঠ পর্যায়ে জনগনের সুবিধা-অসুবিধা কোনোদিনই বুঝতে চান না বা বুঝার চেষ্টা করেন না। আমার দোকানে বিক্রিই শুরু হয় বলতে গেলে রাত ১০টার পরে। আশপাশের বিভিন্ন কলোনি মেস-বাড়ির লোকজন তখন ঘরে ফিরে। সদাই-পাতি নিয়ে যায়| এখন তাদের কী হবে? আমারইবা কী হবে?’

 

 

এমন ক্ষোভ মেশানো প্রশ্ন নগরীর আম্বরখানা এলাকার মুদি দোকানদার বাবর হোসেনের (৪০)।

 

রাত সাড়ে ৯টার মধ্যে ওষুধ আর হোটেল রেস্টুরেন্ট ছাড়া সব ধরনের দোকানপাট বন্ধ করতে সিলেট মহানগর পুলিশের জারি করা নির্দেশনার প্রেক্ষিতে তার এই ক্ষোভ।

শুধু বাবর হোসেনই নয়, এমন ক্ষোভ বিরাজ করছে সিলেট মহানগরীর শ’ শ’ ব্যবসায়ীর। তাদের বক্তব্য, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের জন্য পুলিশী তৎপরতা বাড়ান, বড় বড় বিপণী-বিতান মার্কেট বা শপিং মল বন্ধ রাখেন। কিন্তু জনগনের জন্য সবসময় প্রয়োজনীয় মাছ-তরকারির বাজার, আর মুদি দোকানগুলোতো খোলা রাখাই যায়। তা না করা হলে সাধারণ মানুষের জন্য জীবন আরও কঠিন এবং কষ্টের হবে। এটা অন্তত প্রশাসনকে বুঝতে হবে।

 

 

সম্প্রতি সিলেটের বিভিন্ন বাজার সমিতির নেতৃবৃন্দের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেন সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার মো. আব্দুল কুদ্দুছ পিপিএম। সভায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে পুলিশের পক্ষ থেকেই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল রাত ৯টার পর দোকান-পাট বন্ধ রাখতে হবে। সেটিকে ব্যবসায়ীরা অনুরোধ করে সাড়ে ৯টায় নিয়েছেন।

 

 

পুলিশের যুক্তি, রাত সাড়ে ৯টার পর দোকানপাট বন্ধ রাখলে মার্কেট ও বাজারকেন্দ্রীক আড্ডা বন্ধ হবে, ছদ্মবেশে অপরাধীরা রাত্রিকালীন বাজার করার অজুহাতে ঘুরে বেড়াতে পারবে না, বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে, রাত ১০টার পর শহরে ট্রাক প্রবেশ করে। তখন যানজট সৃষ্টি হয় এবং দুর্ঘটনাও ঘটে। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে তা আর হবেনা- বলেই জানালেন সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (গণমাধ্যম) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম।

 

 

নাগরিক জীবনে নিরাপত্তার জন্য উল্লেখিত প্রতিটি সমস্যাই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এসব সমস্যার চেয়েও বেশী গুরুত্বপূর্ণ সাধারণ মানুষের আহারাদী। বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষের। তারা সারাদিন শহরে বা শহরের বাইরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ শেষ করে দুটো পয়সা হাতে পান, সেটি নিয়ে ছুটেন বাজারে। মাছ বাজার বা কাঁচা বাজার বা মুদি দোকানে সদাই পাতি সেরে ছুটেন বাসায়। কিন্তু এখন এই পরিস্থিতিটা তাদের জীবনকে আরও কঠিন চ্যালেঞ্জে ফেলে দিবে বলে মনে করেন নগরীর একটি সরকারি প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক সেলিম আহমদ (৩৬)।

তিনি বলেন, মানুষের জীবনকে আরও কঠোর কঠিনের দিকে নিয়ে যাওয়াটা কোনো ভালো বিষয় হতে পারেনা । এতে জনমনে ক্ষোভ বাড়বে এবং একটা সময় নেতিবাচক যেকোনো কিছু ঘটতে পারে। বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের বিবেচনা করতে হবে গুরুত্ব দিয়ে।

 

 

সিলেট নগরীর একটি মেসে থাকেন বেসরকারি এক প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী আদিল হোসেন (২৮)। তিনি জানান, দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে তিনি কাজ করেন। প্রতিদিন রাত ৯টায় কাজ ছাড়েন। বাজার সদাই করে বাসায় ফিরতে ফিরতে সাড়ে ১০টা বা ১১টা। এখন তাকে নতুন করে হিসাব নিকাষ করতে হবে।

বললেন, ইতা কিতা আইন শুরু করছে বা ফুলিশ কমিশনারে। ফয়লা ফয়লা কিছু বালা খাম করছে। এখনতো দেখিয়ার আমার মতো মানষর লাগি টাউনো থাকাউ দায় অইবো।

 

 

শুধু সাধারণ মানুষই নয়। এই বিধি-নিষেধের কুফল ইতিমধ্যেই ভোগ করতে শুরু করেছেন ব্যবসায়ীরাও। তাই তারা নতুন প্রস্তাবের চিন্তাভাবনা করছেন।

 

 

পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে অনুষ্টিত মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন সিলেট মহানগর ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ও বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি সিলেট জেলা শাখার মহাসচিব, সিলেট চেম্বারের সদস্য আব্দুর রহমান রিপন।

 

 

সিলেটভিউর সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, মার্কেট বিপণী-বিতান বা শপিং মলগুলোতে রাতে সাধারণত খুব একটা বিক্রি-টিক্রি হয়না বা কাষ্টমারের তেমন চাপ থাকেনা। তবে আমরা প্রস্তাব দিয়েছিলাম, এগুলোর পাশের অন্যান্য দোকান-পাট বন্ধ রাখার। পুলিশ কমিশনার তাদের কথা রেখেছেন সেজন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন তিনি।

 

 

এরপরই বললেন আসল কথা। তিনি বলেন, গতকাল (৭ ডিসেম্বর রবিবার) দোকান বন্ধ করে সাড়ে ৯টার পর কাঁচা বাজারে গিয়ে আমরা বাজার করতে পারিনি। মাছের বাজারের অবস্থাও তাই।

 

 

তিনি বলেন, এমন সমস্যায় শুধু আমি নয়, পড়েছেন আরও অনেকে। তাই আমরা ব্যবসায়ীরা বিষয়টি নিয়ে দ্রুত একটা সভায় বসতে যাচ্ছি। আমরা সেই সভায় এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করবো।

 

 

তিনি আরও বলেন, তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, তরি-তরকারি, মাছ-বাজারসহ মুদি দোকানগুলো যেন আগের মতোই খোলা থাকে। আমরা ব্যবসায়ীরা আলোচনা করে পুলিশ কমিশনার মহোদয়ের কাছে এই প্রস্তাব পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছি।

Spread the love

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

আর্কাইভ

August 2026
M T W T F S S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31