সিলেট ১৩ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩০শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৩:০১ অপরাহ্ণ, মে ১৩, ২০২৬
প্রতিনিধি / সিলেট ::
সিলেট জুড়ে প্রাকৃতিক বিপর্যয় হাওরপাড়ের জনপদকে বিষœ্ন করে তুলেছে। যেখানে থাকার কথা ছিল আনন্দ-উৎসব, সেখানে এখন শত-শত কৃষকের কেবলই হাহাকার আর দীর্ঘশ্বাস। গেল এপ্রিলের শেষ দিকে- হওয়া আকস্মিক বন্যায় তলিয়ে ফসলের পাশাপাশি ম্লান হয়ে গেছে বহু কৃষকের আনন্দ। সিলেট, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ জেলার হাওরপাড়ে কৃষকের মনে এখন বিষœনতার ছাপ। তাদের ঘরে নেই এখন আনন্দ। এমনই এক জনপদ হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ উপজেলার জলসুখা ইউনিয়নের দক্ষিণপাড়া গ্রাম। হাওরপাড়ের এই কৃষকদের চোখে-মুখে চরম দুশ্চিন্তা আর হাহাকারের ছাপ। অথচ সপ্তাহ দুয়েক পরেই ঈদুল আজহা। বছরের এই সময়টায় বোরো ধান ঘরে তোলার খুশি জোটেনি এলাকাটির হাজারো কৃষকের ভাগ্যে। আকস্মিক বন্যায় তলিয়ে ফসলের পাশাপাশি ম্লান হয়ে গেছে শত শত পরিবারের ঈদের আনন্দ।
উপজেলার জলসুখা ইউনিয়নের দক্ষিণপাড়া গ্রামের কৃষক আব্দুল জলিল (৫৭) চলতি মৌসুমে মেঘার চর জমিতে ৭ হাজার টাকা দরে ইজারা নিয়ে ৬ বিঘা জমিতে বোরো ধানের আবাদ করে ছিলেন। কয়েক দিন আগেও তার মাঠজুড়ে ছিল সোনালি ধান। কিন্তু উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর টানা বৃষ্টির পানিতে চোখের সামনেই তলিয়ে গেছে স্বপ্নের ফসল। তিনি বলেন, ‘স্বপ্ন আছিল ধান বেইচ্যা পোলাপানরে ঈদের কাপড় দিমু, ঘরে পিঠা-পায়েস অইবো। অখন ঈদের আনন্দ তো দূরের কথা, সামনের দিন গুলোতে পরিবার নিয়া কী খাইয়া বাঁচমু, সেই চিন্তায় চোখে ঘুম নাই। পাওনাদাররা এখনই আইসা ভিড় করতাছে। শুধু জলিল নন, উৎসবের আগমুহূর্তে এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় হাওরপাড়ের জনপদকে বিষœন করে তুলেছে। যেখানে থাকার কথা ছিল আনন্দ-উৎসব, সেখানে এখন শত শত কৃষকের কেবলই হাহাকার আর দীর্ঘশ্বাস।
প্রায় দেড়শ বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করে ছিলেন সদর ইউনিয়নের কৃষক উছমান মিয়া। মাত্র ২০ বিঘা ধান কাটার পরই বানের পানিতে তার ১৩০ বিঘা জমির ধান তলিয়ে যায়। শ্রমিক সংকট ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে বাকি ধান কাটতে পারেননি তিনি। শিবপাশা ইউনিয়নের কৃষক কাউছার মিয়া ও কাকাইলছেও ইউনিয়নের কৃষক লুৎফর রহমানের কাছাকাছি অবস্থা। লুৎফর বলেন, ‘পানির মধ্যে থেকে কিছু ধান কাটছি, কিন্তু যা অবস্থা তাতে এই বছর সংসার চালানোই কষ্ট হবে। খড়ও জড়ো করতে পারছি না। এখন গবাদি পশুগুলোকে সারা বর্ষা কী খাওয়াব, সেই চিন্তায় আছি। শুধু হবিগঞ্জই নয়, সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলার হাওরপাড়েও এখনো কৃষকের কান্না।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন হাওর ঘুরে দেখা গেছে, পচে যাওয়া ধানের গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। অনেক কৃষক বুকসমান পানিতে নেমে আধপাকা ধান কাটার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। কিন্তু সেই ধান গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবেও ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, সিলেট বিভাগের চার জেলায় ৩৩ হাজার ৯১৩ হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী ২৬ এপ্রিল থেকে ৪ মে পর্যন্ত সময়ে ১ হাজার ৪৭ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে। হাওর অঞ্চলে কৃষিজমির প্রায় ১০ দশমিক ৭৮ ভাগ বা প্রায় ৫০ হাজার হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। আনুমানিক ২ লাখ ১৩ হাজার টন বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে দুই লক্ষাধিক কৃষক সরাসরি দুর্যোগের শিকার হয়েছেন। কৃষকের জন্য বোরো ধানই বছরের একমাত্র আয়ের উৎস।
তথ্য মতে, এবার অতিবৃষ্টি ও আগাম বন্যায় সাতটি হাওর জেলায় বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা এবং কিশোরগঞ্জ জেলা। সুনামগঞ্জে ১৪ হাজার ৩৭১ হেক্টর জমির ধান তলিয়ে যায় পানিতে। দেখার হাওর ও করচার হাওর এলাকায় পড়েছে এসব জমি। কিশোরগঞ্জে প্রায় ১৩ হাজার ৪৭৯ হেক্টর জমির ধান পানির নিচে চলে যায়। ইটনা, অষ্টগ্রাম, নিকলি, মিঠামইন, তাড়াইল এবং করিমগঞ্জ উপজেলার হাওরের জমিগুলো ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। নেত্রকোনার ১১ হাজার ৫২২ হেক্টরের বেশি জমির ধান ক্ষতি হয়েছে। খালিয়াজুড়ি, মোহনগঞ্জ, মদন, কলমাকান্দা, বারহাট্টা, আটপাড়া এবং কেন্দুয়া এলাকার জমি বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের মেদির হাওরের বিস্তীর্ণ বোরো ক্ষেত তলিয়ে গেছে। মৌলভীবাজারের হাকালুকি হাওর এবং কাওয়াদীঘি হাওর ও কুলাউড়ার ভুকশিমইল ইউনিয়নের জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।