সিলেট ১৭ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৯:২৫ অপরাহ্ণ, জুন ১৬, ২০২৬
প্রতিনিধি / বাগেরহাট ::
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন উপকূলবর্তী বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলায় রপ্তানিমুখী বাগদা ও গলদা চিংড়ির রেণু পোনার তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। প্রাকৃতিক জলাশয় থেকে রেণু পোনা আহরণ, পরিবহন ও বিপণনের ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞা, একের পর এক হ্যাচারি বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে এ সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে চিংড়ি উৎপাদন, স্থানীয় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং উপজেলার লক্ষাধিক মানুষের জীবিকায়।
মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ফকিরহাট উপজেলায় বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে নিবন্ধিত ৮ হাজার ৪টি ঘের এবং ২ হাজার ৬০৮টি পুকুর রয়েছে। এসব ঘের ও পুকুরে বছরে প্রায় ৪ কোটি ২৬ লাখ বাগদা এবং ৭ কোটি ৪৬ লাখ গলদা রেণু পোনার প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ মোট চাহিদা প্রায় ১১ কোটি ৭২ লাখ।
তবে স্থানীয় চাষি, আড়তদার ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের দাবি, প্রকৃত চাহিদা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি। তাদের মতে, উপজেলার আটটি ইউনিয়ন এবং পার্শ্ববর্তী কেন্দুয়া ও কোদলার বিল এলাকায় মিলিয়ে ঘেরের সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার। সেই হিসাবে চলতি মৌসুমে রেণু পোনার চাহিদা ৪০ থেকে ৪৫ কোটিতে পৌঁছেছে।
চিংড়ি চাষের প্রধান মৌসুম এপ্রিল, মে ও জুন। এ সময় ঘেরে রেণু পোনা ছাড়া হয়। কিন্তু মৌসুমের দুই মাসেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও অধিকাংশ চাষি প্রয়োজনীয় পোনা সংগ্রহ করতে পারেননি। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, মোট চাহিদার বিপরীতে এখন পর্যন্ত মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পোনা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে। অন্যদিকে মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, হ্যাচারিতে উৎপাদিত পোনার সরবরাহ চাহিদার মাত্র ৮ শতাংশ পূরণ করতে পারছে।
ঠিকরিপাড়া এলাকার প্রান্তিক চাষি দাউদ হায়দার বাবু ফকির জানান, প্রতি বছর তিনি প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার রেণু পোনা ছাড়েন। কিন্তু এবার মৌসুম প্রায় শেষ হওয়ার পথে হলেও মাত্র ১৮ হাজার পোনা সংগ্রহ করতে পেরেছেন। ব্যাংক ও এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে ঘের প্রস্তুত করলেও পোনা না পাওয়ায় তিনি চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।
একই ধরনের সংকটের কথা জানান পিলজংগ এলাকার চাষি শওকত আলী। তিনি বলেন, এপ্রিল মাসেই ঘের প্রস্তুত করেছিলেন। কিন্তু জুনের মাঝামাঝি সময়েও প্রয়োজনীয় পোনা না পাওয়ায় উৎপাদন নিয়ে শঙ্কায় আছেন।
নলধা, গাবখালী ও কাঁঠালতলা এলাকার প্রবীণ চাষি নজরুল সর্দার, হাফিজুর রহমান ও কামরুল মোড়ল বলেন, প্রাকৃতিক উৎসের রেণু পোনার বেঁচে থাকার হার হ্যাচারির পোনার তুলনায় অনেক বেশি। তাদের দাবি, হ্যাচারির পোনার ক্ষেত্রে টিকে থাকার হার যেখানে ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ, সেখানে প্রাকৃতিক পোনার ক্ষেত্রে তা ৮০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছায়। ফলে উৎপাদন ও লাভের দিক থেকেও প্রাকৃতিক পোনা অধিক কার্যকর।
সংকটের কারণে বাজারে রেণু পোনার দামও অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। স্থানীয় আড়তদার শেখ মনি জানান, গত বছর প্রতি হাজার রেণু পোনা ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকায় বিক্রি হলেও এবার তা বেড়ে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় চাষিরা আরও বিপাকে পড়েছেন।
ফকিরহাট প্রাকৃতিক চিংড়ি পোনা আড়ত মালিক সমিতির সভাপতি নুরুল ইসলাম খোকন বলেন, স্থানীয় উৎসে পোনা না থাকায় ব্যবসায়ীরা এখন চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, কুমিল্লা, ভোলা, পটুয়াখালী ও বরগুনাসহ উপকূলীয় অঞ্চল এবং সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে আসা পোনার ওপর নির্ভর করছেন। কিন্তু এসব পোনা পরিবহন ও সংগ্রহের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে জব্দ হওয়ার ঝুঁকি এবং বিভিন্ন আইনি জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
মৎস্য বিভাগের তথ্য বলছে, গত অর্থবছরে ফকিরহাট উপজেলায় মোট ২ হাজার ৩১৫ মেট্রিক টন চিংড়ি উৎপাদিত হয়েছিল। চলতি অর্থবছরে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ হাজার ৪৩০ মেট্রিক টন। তবে বর্তমান সংকট অব্যাহত থাকলে এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন চাষিরা। তাদের আশঙ্কা, উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার ২০ শতাংশও অর্জন করা সম্ভব নাও হতে পারে।
বাগেরহাট চিংড়ি গবেষণা কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এইচ এম রাকিবুল ইসলাম জানান, মান নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন প্রতিকূল কারণে দেশে বেসরকারি হ্যাচারির সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০১১-১২ অর্থবছরে যেখানে ৭৮টি হ্যাচারি কার্যক্রম চালু ছিল, সেখানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে ৩৭টিতে নেমে এসেছে।
তিনি বলেন, “সরকারি গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীদের বেসরকারি হ্যাচারিগুলোর মান নিয়ন্ত্রণ বা সরাসরি ব্যবস্থা গ্রহণের আইনগত ক্ষমতা নেই। তবে হ্যাচারি মালিকরা কারিগরি সহায়তা চাইলে গবেষণা কেন্দ্র থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হয়।”
ফকিরহাট সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা শেখ আসাদুল্লাহ বলেন, “জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার স্বার্থে প্রাকৃতিক জলাশয় থেকে রেণু পোনা আহরণ, পরিবহন ও বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ বিষয়ে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।”
চাষি, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিবেশ সংরক্ষণ ও উৎপাদনের ভারসাম্য বজায় রেখে দ্রুত কার্যকর বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে সুন্দরবন উপকূলের অন্যতম প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী চিংড়ি খাত বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়বে। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শুধু উৎপাদন নয়, বরং এ শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত হাজার হাজার পরিবারও।