৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে সাগরে ফিরছেন জেলেরা

প্রকাশিত: 2:11 PM, June 13, 2026

৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে সাগরে ফিরছেন জেলেরা

প্রতিনিধি / বাগেরহাট ::

 

দীর্ঘ ৫৮ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা শেষে আবারও প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসছে সুন্দরবন উপকূল ও বঙ্গোপসাগরজুড়ে। বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকে সাগরে মাছ আহরণের অনুমতি মিলছে। ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জনপদে শুরু হয়েছে নতুন মৌসুমকে ঘিরে ব্যাপক প্রস্তুতি। ঘাটে ফিরছে মাছ ধরার ট্রলার, মহাজনের আড়তে ভিড় করছেন জেলেরা, মেরামত করা হচ্ছে জাল ও ইঞ্জিন। কিন্তু এই প্রস্তুতির মধ্যেও উপকূলের জেলে-মহাজনদের মনে জেঁকে বসেছে আরেক ভয়—বন ও জলদস্যুদের তৎপরতা।

 

সুন্দরবনসংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের বিস্তীর্ণ জলসীমায় এখনও সক্রিয় রয়েছে একাধিক বন ও জলদস্যু বাহিনী। নিষেধাজ্ঞা শেষে যখন জেলেরা নতুন আশায় সমুদ্রে নামার অপেক্ষায়, তখনই তাদের মনে দানা বাঁধছে নিরাপত্তাহীনতার শঙ্কা। জেলেদের ভাষায়, সাগরে মাছের চেয়ে এখন দস্যুর ভয়ই বেশি।

 

উপকূলের বিভিন্ন মৎস্যঘাট ঘুরে দেখা গেছে, প্রায় দুই মাসের কর্মবিরতির পর জেলেরা আবারও সাগরে যাওয়ার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। কেউ জাল গুছিয়ে ট্রলারে তুলছেন, কেউ ইঞ্জিন পরীক্ষা করছেন, আবার কেউ খাদ্য ও জ্বালানি মজুত করছেন। নতুন মৌসুমে ভালো মাছ পাওয়ার আশায় সবার চোখে-মুখে প্রত্যাশার ছাপ থাকলেও দস্যু আতঙ্ক সেই আনন্দকে অনেকটাই ম্লান করে দিয়েছে।

 

বাগেরহাটের শরণখোলা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, একের পর এক ফিশিং ট্রলার ঘাটে ভিড়ছে। জেলেরা শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। তবে সাগরে যাওয়ার উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি রয়েছে গভীর উদ্বেগ।

 

মৎস্য আড়তদার ও ট্রলার মালিক মজিবর তালুকদার বলেন, “নিষেধাজ্ঞা শেষে সাধারণত সমুদ্রে প্রচুর মাছ পাওয়া যায়। বিশেষ করে ইলিশ মৌসুমের শুরুতে জেলেরা ভালো আয়ের আশা করেন। কিন্তু এবার শুরুতেই বৈরী আবহাওয়া আমাদের হতাশ করেছে। তার ওপর দস্যুদের তৎপরতা বাড়ার খবর উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।”

 

একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করে ট্রলার মালিক কবির হাওলাদার বলেন, “সাগরে যাওয়ার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন থাকলেও অনেক ট্রলার এখনও ঘাটে রয়েছে। আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে তারা যাত্রা করবে। কিন্তু গভীর সমুদ্রে দস্যুদের হামলার আশঙ্কা জেলে-মহাজনদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করেছে।”

 

শরণখোলা সমুদ্রগামী ফিশিং ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি মো. আবুল হোসেন জানান, একটি ট্রলারকে সমুদ্রে মাছ ধরার উপযোগী করতে চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। অধিকাংশ মহাজন ঋণ নিয়ে ট্রলার ও জাল মেরামত করেন। নিষেধাজ্ঞা শেষে মাছ ধরে সেই ঋণ পরিশোধের পরিকল্পনা থাকে তাদের।

 

তিনি বলেন, “প্রথম দিনেই বৈরী আবহাওয়া আমাদের বড় ধাক্কা দিয়েছে। এ অবস্থায় অনেক মহাজন তাদের ট্রলার সমুদ্রে না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কারণ ঝুঁকি নিয়ে সাগরে গিয়ে ক্ষতির মুখে পড়লে সেই লোকসান সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে যাবে।”

 

দস্যুদের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে আবুল হোসেন আরও বলেন, “গভীর সমুদ্রে দস্যুরা হামলা করলে জেলেদের আত্মরক্ষার তেমন সুযোগ থাকে না। তারা ট্রলারে উঠে জেলেদের মারধর করে, অপহরণ করে এবং আহরিত মাছ, জ্বালানি, জালসহ সবকিছু লুট করে নিয়ে যায়। অনেক সময় অপহৃত জেলেদের মুক্তির জন্য লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিতে হয়। ফলে পুরো মৌসুমের উপার্জন এক মুহূর্তেই শেষ হয়ে যায়।”

 

জেলেদের দাবি, মৌসুমের শুরুতেই বন ও জলদস্যুদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনা করা না হলে কাঙ্ক্ষিত ইলিশ আহরণ ব্যাহত হবে এবং উপকূলীয় অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

 

এদিকে শরণখোলা উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা অঞ্জন বিশ্বাস বলেন,রাত ১২টার পর থেকেই জেলেরা সমুদ্রে যাত্রা করতে পারবেন। তবে আবহাওয়া পুরোপুরি অনুকূলে না থাকায় প্রথম দিনে অনেক ট্রলার সাগরে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যারা যাচ্ছে, তাদেরও গভীর সমুদ্রে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।”

 

তিনি আরও জানান, জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। বন ও জলদস্যুদের তৎপরতা রোধে নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

 

উপকূলের হাজারো জেলে পরিবারের কাছে নতুন মৌসুম মানেই নতুন স্বপ্ন, নতুন সম্ভাবনা। দীর্ঘ দুই মাসের নিষেধাজ্ঞার পর তারা আশা করছেন সাগর থেকে ফিরবেন রূপালি ইলিশে ভরা ট্রলার নিয়ে। তবে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বৈরী আবহাওয়া এবং বন-জলদস্যুদের তৎপরতা। জেলেদের প্রত্যাশা, নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে এবং আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবারের মৌসুমে সমৃদ্ধ হবে ইলিশ আহরণ, ঘুরে দাঁড়াবে উপকূলের অর্থনীতি এবং হাসি ফিরবে হাজারো জেলে পরিবারের মুখে।

Spread the love

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

আর্কাইভ

October 2026
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031