মেঘালয়ের ঢল ও ভারী বৃষ্টিতে সিলেটে বন্যার শঙ্কা, তলিয়েছে সাদাপাথর

প্রকাশিত: ৭:১৩ অপরাহ্ণ, জুন ২১, ২০২৬

মেঘালয়ের ঢল ও ভারী বৃষ্টিতে সিলেটে বন্যার শঙ্কা, তলিয়েছে সাদাপাথর

লন্ডন বাংলা ডেস্ক ::

 

টানা দুইদিনের ভারী বৃষ্টি এবং ভারতের মেঘালয় থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের প্রভাবে সিলেট অঞ্চলের নদ-নদীগুলোর পানি দ্রুত বাড়ছে। এখনো কোনো নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম না করলেও একাধিক পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। এতে সিলেটের নিম্নাঞ্চলে আকস্মিক বন্যার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাদাপাথর পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় পর্যটকবাহী নৌ চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে।

 

একইসঙ্গে বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বিক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ফলে সিলেট ও সুনামগঞ্জের নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের মধ্যে বন্যা আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।

 

রোববার (২১ জুন) ভোর থেকে সাদাপাথর এলাকার বিস্তীর্ণ অংশ পানির নিচে চলে যায়। পানিতে তলিয়ে গেছে অস্থায়ী দোকানপাট ও পাথুরে চলাচলের পথ। ফলে পর্যটকদের যাতায়াত কার্যত বন্ধ হয়ে পড়েছে। নদীতে স্রোত বৃদ্ধি পাওয়ায় পর্যটকবাহী নৌযান চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। এ অবস্থায় পর্যটকদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় নিয়ে স্থানীয় মাঝি ও ব্যবস্থাপনা কমিটি সাময়িকভাবে নৌকা চলাচল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এদিকে টানা ভারী বৃষ্টির কারণে ভোগান্তিতে পড়েছেন নগরীর বাসিন্দা, অফিসগামী মানুষ ও নিম্ন আয়ের মানুষরা।

স্থানীয়রা জানায়, বর্ষা মৌসুমে প্রায় প্রতি বছরই পাহাড়ি ঢলের কারণে সাদাপাথর এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। তবে পানি কমে গেলে আবারও পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করা হয় পর্যটনকেন্দ্রটি।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, সুরমা, কুশিয়ারা, সারি ও পিয়াইন নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। যদিও এখনো কোনো নদী বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি, তবে কিছু পয়েন্টে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।

 

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও স্থানীয় সূত্র জানায়, সুরমা ও কুশিয়ারা, সারিগোয়াইন নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমা ছুঁই ছুঁই করছে। এর মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে সুরমা নদীর কানাইঘাট পয়েন্ট, যেখানে পানি বিপৎসীমার মাত্র ৬১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গত কয়েক ঘণ্টায় সেখানে পানির উচ্চতা আরও বাড়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে সুরমা নদীর কানাইঘাট পয়েন্ট। সেখানে বিপৎসীমা ১২ দশমিক ৭৫ মিটার হলেও সকাল ৯টায় পানির সমতল ছিল ১২ দশমিক ১৪ মিটার। অর্থাৎ পানি বিপৎসীমার মাত্র ৬১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সকাল ৬টা থেকে ৯টার মধ্যে এই পয়েন্টে পানি বেড়েছে ১২ সেন্টিমিটার। একই নদীর সিলেট পয়েন্টে পানির সমতল ছিল ৯ দশমিক ৩০ মিটার। সেখানে বিপৎসীমা ১০ দশমিক ৮০ মিটার। ফলে পানি এখনো বিপৎসীমার দেড় মিটারের মতো নিচে রয়েছে।

 

পাউবোর তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় কানাইঘাট এলাকায় ১৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা জেলার পর্যবেক্ষণাধীন পয়েন্টগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। সিলেট শহর এলাকায় একই সময়ে বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ২ মিলিমিটার। কুশিয়ারা নদীর পরিস্থিতি মিশ্র। শেওলা পয়েন্টে পানি বেড়েছে। সেখানে সকাল ৬টায় পানির সমতল ছিল ১১ মিটার, যা সকাল ৯টায় বেড়ে দাঁড়ায় ১১ দশমিক ৫০ মিটার। যদিও এ পয়েন্টে বিপৎসীমা ১৩ দশমিক ০৫ মিটার।

 

অন্যদিকে কুশিয়ারার ফেঞ্চুগঞ্জ ও শেরপুর পয়েন্টে পানি কিছুটা কমেছে। ফেঞ্চুগঞ্জে সকাল ৬টায় পানির সমতল ছিল ৯ দশমিক ৯৪ মিটার, যা তিন ঘণ্টা পর নেমে আসে ৯ দশমিক ০৪ মিটারে। শেরপুর পয়েন্টে পানির সমতল ৭ দশমিক ৪৫ মিটার থেকে সামান্য কমে ৭ দশমিক ৪৪ মিটারে দাঁড়িয়েছে। দুটি পয়েন্টেই পানি বিপৎসীমার নিচে রয়েছে। সারিগোয়াইন নদীর সারিঘাট পয়েন্টে পানি ছিল ১০ দশমিক ৭৮ মিটার, যেখানে বিপৎসীমা ১২ দশমিক ০৫ মিটার। একই নদীর গোয়াইনঘাট পয়েন্টে পানি ৯ দশমিক ০৮ মিটার থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ৩১ মিটারে পৌঁছেছে। তবে সেখানেও পানি বিপৎসীমার অনেক নিচে রয়েছে। পিয়াইন নদীর জাফলং পয়েন্টে সকাল ৬টায় পানির সমতল ছিল ১০ দশমিক ৪৯ মিটার। তিন ঘণ্টা পর তা বেড়ে ১০ দশমিক ৮২ মিটারে দাঁড়ায়। এ পয়েন্টে বিপৎসীমা ১৩ মিটার। ধলা নদীর ইসলামপুর পয়েন্টে পানির সমতল সামান্য বৃদ্ধি পেয়ে ১০ দশমিক ১৭ মিটারে পৌঁছেছে। তবে এ নদীর জন্য কোনো বিপৎসীমা নির্ধারিত নেই।

 

পানি উন্নয়ন বোর্ডের সিলেট কার্যালয় জানিয়েছে, ভারতের মেঘালয় অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাত হলে সিলেটের নদীগুলোতে হঠাৎ করে পানি বেড়ে যায় এবং আবার দ্রুত নেমেও যেতে পারে। তবে এ ধরনের পরিস্থিতিতে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি থাকে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে কয়েকটি পয়েন্টে পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করার আশঙ্কাও রয়েছে। সিলেট জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতি জোরদার করা হয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে শুকনো খাবার, শিশুখাদ্যসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী মজুত রাখা হয়েছে এবং স্বেচ্ছাসেবক দলকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

 

সব মিলিয়ে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি, টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে সিলেটে বন্যার শঙ্কা ক্রমেই বাড়ছে। তবে এখন পর্যন্ত বড় কোনো স্থায়ী বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়নি বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

 

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর সিলেট অফিসের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ সাঈদ আহমদ চৌধুরী কালবেলাকে বলেন, বর্ষাকালে বিশেষ করে জুন, জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে নির্দিষ্ট করে কতদিন বৃষ্টি থাকবে তা বলা কঠিন। পুরো বর্ষাকাল জুড়েই কম-বেশি বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। তবে বৃষ্টি টানা নাও হতে পারে; যেমন দুইদিন বৃষ্টির পর দুইদিন বিরতি দিয়ে আবারও বৃষ্টি শুরু হতে পারে। সকাল কিংবা বিকেলে বিক্ষিপ্তভাবে সামান্য বিরতি দিয়ে এ ধরনের বৃষ্টিপাত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

 

তিনি বলেন, গতকাল সকাল ৬টা থেকে আজ সকাল ৬টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় সিলেটে ৩৯ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ৫ দিনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী পাঁচদিন দেশের প্রায় প্রতিটি স্থানে কোনো না কোনোভাবে বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।

 

নগরীর পাঠানঠুলার বাসিন্দা সোহেল আহমদ কালবেলাকে বলেন, সকাল-বিকেল অফিস যাতায়াতে অনেক ভোগান্তি হচ্ছে। টানা বৃষ্টির কারণে রাস্তায় পানি আর যানজট মিলিয়ে সময়মতো অফিসে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। রেইনকোট আর ছাতা থাকলেও ভিজে যেতেই হচ্ছে।

 

মদিনা মার্কেটে কথা রিকশা চালক রফিক মিয়া সাথে। তিনি কালবেলাকে বলেন, বৃষ্টি থাকলে আয় কমে যায়। রাস্তায় পানি হলে যাত্রীও কম পাওয়া যায়। একদিন কাজ না হলে ঘর চালানোই কষ্ট হয়ে যায়। এখন শুধু দোয়া করি বৃষ্টি যেন একটু কমে।

 

নগরীর সুবিদ বাজারের সুজন মিয়া কালবেলাকে বলেন, বৃষ্টির কারণে ক্রেতা কমে গেছে। দোকানে বসে থাকতে হয় বিক্রি খুবই কম। যদি এভাবে কয়েকদিন চলে তাহলে মালামাল কিনে আনা ও খরচ চালানো কঠিন হয়ে যাবে।

 

হাকালুকি পাড়ের সোমা নামের এক গৃহবধূ সোমা বেগম বলেন, ছোট বাচ্চাদের নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় আছি। পানি উঠলে দ্রুত সরানো কঠিন হয়ে যায়। আগের বন্যার কষ্ট এখনো ভুলিনি।

 

জৈন্তাপুরের বাসিন্দা রাহেলা আক্তার কালবেলাকে বলেন, এখন নদীর পানি যেভাবে বাড়ছে, মনে হচ্ছে বড় পানি আসতে পারে। আগেও অনেকবার বন্যা দেখেছি তাই এবারও প্রস্তুত থাকতে হচ্ছে।

 

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ বলেন, বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী ভারতের মেঘালয় অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাত হলে সিলেটের নদ-নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। মেঘালয় থেকে নেমে আসা ঢলে ধলাই নদীর পানি দ্রুত বাড়ে এবং দ্রুত কমেও যায়।

 

তিনি জানান, আগামী কয়েকদিনের মধ্যে সিলেটের বিভিন্ন পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি বা ওপরে যেতে পারে। তবে এটি আকস্মিক বন্যা হওয়ায় দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম। বর্তমানে পানি এখনো বিপৎসীমা অতিক্রম না করলেও খুব কাছাকাছি অবস্থান করছে।

 

বন্যা পরিস্থিতি ও সাদাপাথর পর্যটন কেন্দ্র প্রসঙ্গে কালবেলার সঙ্গে আলাপকালে সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম বলেন, বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বিক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং খাবার, শুকনো খাবারসহ প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবকদের প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং পর্যাপ্ত শিশুখাদ্যসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী উপজেলা পর্যায়ে পাঠানো হয়েছে।

 

তিনি বলেন, গত দুই-তিন দিন ধরে পাহাড়ি ঢলের কারণে সাদাপাথর পর্যটন এলাকায় পানি বেড়েছে। ফলে আগের শুকনো পাথুরে অংশ দিয়ে পর্যটকরা চলাচল করতেন, সেটি এখন পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এ কারণে পর্যটকরা মূল জিরো পয়েন্টে যেতে না পারলেও দূর থেকে পর্যটন এলাকা উপভোগ করতে পারছেন। পানির কারণে আগের মতো হেঁটে পাথর এলাকার ওপর দিয়ে যাতায়াতও সম্ভব হচ্ছে না।

 

তিনি আরও বলেন, প্রশাসনের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি রয়েছে এবং বড় কোনো সমস্যা হবে না বলে আশা করা হচ্ছে। একইসঙ্গে তিনি সিলেটবাসীকে সবসময় সতর্ক ও সচেতন থাকার আহ্বান জানান।

Spread the love

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

আর্কাইভ

June 2026
M T W T F S S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930