সিলেট ২৩শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৮ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৬:৪৬ অপরাহ্ণ, জুলাই ২২, ২০২৬
প্রতিনিধি / বাগেরহাট ::
বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ-শরণখোলা-খুলনা রুটে চলাচলকারী বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) বাসসেবাকে কেন্দ্র করে যাত্রীদের মধ্যে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। সরকারি পরিবহন সংস্থা হিসেবে সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য সেবা দেওয়ার কথা থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, স্টাফদের দুর্ব্যবহার এবং সময়সূচি না মেনে বাস পরিচালনার অভিযোগে বিপাকে পড়েছেন হাজারো যাত্রী।
স্থানীয় সূত্র ও যাত্রীদের অভিযোগ অনুযায়ী, এই রুটে চলাচলকারী বেশ কিছু বাসের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ বাসে আসনের অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহনের জন্য অস্থায়ী টুল ও মোড়া বসিয়ে যাত্রী বহন করা হয়। এতে যাত্রীরা যেমন ভোগান্তিতে পড়ছেন, তেমনি নিরাপত্তা ঝুঁকিও বাড়ছে। অভিযোগ রয়েছে, অতিরিক্ত যাত্রী বহনের মাধ্যমে অবৈধভাবে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে।
যাত্রীরা জানান, সরকারি পরিবহন হওয়া সত্ত্বেও বাসের নির্ধারিত সময়সূচি মানা হয় না। অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও বাসের অবস্থান বা ছাড়ার সময় সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না। ফলে শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রতিনিয়ত দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন।
এছাড়া যাত্রাপথে যত্রতত্র বাস থামিয়ে লোকাল যাত্রী ওঠানো এবং ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি যাত্রী পরিবহন করায় বাসের ভেতরে অসহনীয় পরিবেশ সৃষ্টি হয়। কেউ এ বিষয়ে প্রতিবাদ করলে তাকে অপমানজনক কথাবার্তা শুনতে হয় বলেও অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা।
অন্যদিকে, এসি বাসের জন্য অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হলেও অনেক সময় এসি বন্ধ রাখা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। আবদ্ধ পরিবেশে দীর্ঘ পথযাত্রার কারণে নারী, শিশু ও বয়স্ক যাত্রীদের মধ্যে বমি, শ্বাসকষ্টসহ নানা শারীরিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
শরণখোলার এক যাত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“সরকারি বাস বলে ভরসা করে যাতায়াত করি। কিন্তু বাস পরিচালনার অব্যবস্থাপনা এবং স্টাফদের আচরণ দেখে মনে হয় যাত্রীদের প্রতি তাদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই। অভিযোগ করলেও কোনো প্রতিকার মেলে না।”
মোরেলগঞ্জের আরেক ভুক্তভোগী যাত্রী বলেন,
“বাস কখন আসবে বা কখন ছাড়বে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। স্টাফদের কাছে জানতে চাইলে অনেক সময় উল্টো দুর্ব্যবহারের শিকার হতে হয়।”
মালামাল হারানোর অভিযোগ
যাত্রীদের অভিযোগের অন্যতম বড় বিষয় হচ্ছে মালামাল পরিবহনে অনিয়ম। যাত্রীদের দাবি, বাসের লাগেজ বক্সে মালামাল গ্রহণ ও বিতরণের কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন নেই। ফলে প্রায়ই মালামাল হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। এ নিয়ে যাত্রী ও স্টাফদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা এমনকি হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে।
অভিযোগ রয়েছে, কোনো যাত্রী নির্দিষ্ট গন্তব্যে মালামাল বুকিং দিলেও অনেক সময় তা যথাসময়ে পৌঁছে দেওয়া হয় না। কখনও মালামাল শরণখোলা বাসস্ট্যান্ডে নিয়ে যাওয়া হয়, আবার কখনও হারিয়ে যাওয়ার অজুহাত দেখানো হয়।
এ বিষয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ী তারিকুল ইসলাম মিঠুর একটি ব্যাটারি হারিয়ে যাওয়ার ঘটনাকে ঘিরে যাত্রীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বিষয়টি প্রথমে অস্বীকার করা হলেও পরে স্থানীয়ভাবে সালিশ বৈঠকের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়ে সমঝোতা হয়।
সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, দীর্ঘদিন ধরে চলা এসব অনিয়মের কারণে বিআরটিসির সেবার মান নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষায় দ্রুত তদন্ত ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন তারা।
স্থানীয় শিক্ষক মো. শাহজাহান খান বলেন,
“গত বছরের ৫আগস্টের ২০২৪ আগে এই রুটে বিআরটিসির পাশাপাশি নিউ হানিফ, পদ্মা তালুকদার ও ইমা পরিবহনসহ একাধিক বাস চলাচল করত। তখন যাত্রীদের এত ভোগান্তি পোহাতে হতো না। বর্তমানে বিআরটিসি কার্যত এককভাবে সেবা দিচ্ছে। ফলে প্রতিযোগিতা না থাকায় যাত্রীসেবার মান কমে গেছে। সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধি, জেলা প্রশাসন ও পরিবহন খাতের কর্মকর্তাদের আন্তরিক হয়ে সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধান করতে হবে।”
সুপারভাইজারের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বিআরটিসির সুপারভাইজার সোহাগ বলেন,
“যাত্রীদের অভিযোগের বিষয়গুলো আমি অস্বীকার করছি না, তবে অনেক অভিযোগ অতিরঞ্জিতও হতে পারে। প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক যাত্রী পরিবহন করতে হয়। কখনও অতিরিক্ত চাপের কারণে কিছু সমস্যা দেখা দেয়। মালামাল হারানোর অভিযোগের বিষয়েও তদন্ত হলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে। আমরা যাত্রীসেবা উন্নত করতে চেষ্টা করছি।”
বিষয়টি নিয়ে বিআরটিসির সংশ্লিষ্ট ডিপো ম্যানেজার বলেন,
“মোরেলগঞ্জ-শরণখোলা-খুলনা রুটে যাত্রীদের অভিযোগ আমাদের নজরে এসেছে। অতিরিক্ত যাত্রী বহন, স্টাফদের অসদাচরণ, সময়সূচি লঙ্ঘন কিংবা মালামাল ব্যবস্থাপনায় কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যাত্রীসেবার মানোন্নয়নে আমরা কাজ করছি এবং অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।”
দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি
এদিকে বিভিন্ন সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতারা বলছেন, যাত্রীসেবার নামে অনিয়ম ও হয়রানি চলতে থাকলে জনগণের আস্থা আরও কমে যাবে। তাই দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, নির্ধারিত সময়সূচি নিশ্চিত করা, এসি সেবা কার্যকর রাখা এবং মালামাল পরিবহনে স্বচ্ছ নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন তারা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, যাত্রীবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হলে বিআরটিসিকে আরও জবাবদিহিমূলক ও সেবামুখী হতে হবে। অন্যথায় এই গুরুত্বপূর্ণ রুটে যাত্রীদের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।