২ মন্ত্রী আসার খবরে বদলে গেল হাসপাতালের পরিবেশ, অবাক রোগীরা

প্রকাশিত: ৯:১৯ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬

২ মন্ত্রী আসার খবরে বদলে গেল হাসপাতালের পরিবেশ, অবাক রোগীরা

লন্ডন বাংলা ডেস্ক ::

 

পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, নার্স-ওয়ার্ড বয়দের নরম ব্যবহার আর ছুটির দিনেও শতভাগ চিকিৎসক উপস্থিতি, সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আজ শুক্রবার দেখা গেল এমন বিরল দৃশ্য। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের পরিদর্শনের কারণে হাসপাতালের এমন বদলে যাওয়ার দৃশ্য দেখে অবাক রোগী ও রোগীর স্বজনরাও। তবে সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও সরকারি হাসপাতালে সেবার মান উন্নত করতে সরকার বদ্ধপরিকর বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।

ওসমানী হাসপাতালে পর্যাপ্ত সময় দেন না নব্বইভাগ চিকিৎসক। এ নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষই চিকিৎসকদের সতর্ক করে নোটিশ জারি করেছে। হাসপাতালের বেশিরভাগ শৌচাগারই ব্যবহার অনুপযোগী। রোগীর চাপে মেঝে, এমনকি বারান্দাতেও থাকতে হয় চিকিৎসা নিতে আসা মানুষকে। নিম্নমানের খাবার, হয়রানি, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ আর প্রতারক-দালালের দৌরাত্ম যেখানে নিয়মিত চিত্র, সেই এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শুক্রবার দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। স্বাস্থ্য মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের পরিদর্শন ঘিরে শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা চালায় কর্তৃপক্ষের।

 

হাসপাতালের ক্যাজুয়ালিটি বিভাগে চিকিৎসাধীন ইয়াকুব আহমেদ জানান, গতকাল বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত বেডশিট ছাড়াই থাকতে হয়। অনেক চেয়েও একটি বেডশিট পাওয়া যায়নি। তবে শুক্রবার সকালে মন্ত্রী আসার আগে তড়িঘড়ি করে তাদের একটি বেডশিট এনে দেওয়া হয়।

ইয়াকুব আলীর স্ত্রী ফাতেমা বেগম বলেন, ‘কাল থেকে ময়লা বিছানায় ঘুমাতে বাধ্য হয়েছেন তার স্বামী। আজ বেডশিট দিলেও রাগে আর সেটি বিছাইনি আমরা। আজ হঠাৎ করে সবার ব্যবহার বদলে গেছে। মন্ত্রীর চোখে ধুলা দিতে সবাই সাধু সেজেছেন।’

 

শুক্রবার ছুটির দিনে, সকালে হাসপাতালে পৌছান দুই মন্ত্রী। ঘুরে দেখেন হাসপাতালের সার্বিক কার্যক্রম। তারা বলেন, ‘সীমাবদ্ধতা থাকলেও সরকারের ৬ মাসে দেশের সব হাসপাতালেই আগের তুলনায় সেবার মান বেড়েছে। সাত দিনের মধ্যে সেবা উন্নত হবে ওসমানী হাসপাতালেও।’

 

সিলেট বিভাগের সবচেয় বড় সরকারি হাসপাতালটিতে চিকিৎসা নেন ধারণক্ষতার তিনগুণ বেশি রোগী। সেবার মান নিয়ে অভিযোগের অন্ত নেই।

 

হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে স্ট্রেচার বা হুইল চেয়ার পাওয়া যায় না। এজন্য বাড়তি টাকা দিতে হয় দায়িত্বশীলদের। এমন অভিযোগের মধ্যে শুক্রবার মন্ত্রীর পরিদর্শনকালে দেখা গেল জরুরি বিভাগের সামনে রাখা স্ট্রেচার, স্ট্রেচারের ওপরে বেডশিটও পাতানো, সঙ্গে বালিশও আছে।

 

সুনামগঞ্জ থেকে সেবা দিতে আসা জাহাঙ্গীর আহমদ বলেন, ‘সিলেটের ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এমন দৃশ্য আগে কে দেখেছে কবে! স্ট্রেচারই যেখানে পাওয়া যায় না সেখানে আবার বালিশ-বেডশিট!’

 

ক্যজুয়ালিটি বিভাগের চিকিৎসাধীন হাফসা খান বলেন, ‘এই বিভাগের দুটি বাথরুমই নষ্ট। সেখানে ঢুকলেই পেট গুলিয়ে বমি আসে। হাসপাতালের সব জায়গায় তেলাপোকা। মন্ত্রীর আগমনের খবরে গত রাত থেকেই ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শুরু হয় ব্যাপক ধোয়া-মোছার কাজ। হাসপাতালের বিভিন্ন স্থান ঝাড়ু দেওয়া হয়। শুক্রবার সকালেও চলে এ পরিচ্ছন্নতার কাজ।’

 

সকালে হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, বাথরুম পরিষ্কার করছেন এক পরিচ্ছন্নতা কর্মী। পরেই এই ওয়ার্ড পরির্দশনে যানস্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এবং বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।

 

মন্ত্রী আসায় হাসপাতালের খাবারের মানেও এসেছে পরিবর্তন। একেবারে গরম গরম খাবার পরিবেশন করা হয়েছে রোগীদের। শুক্রবারে যেখানে চিকিৎসকই পাওয়া যায় না। সেখানে ডাক্তার ও নার্সরা এসে বারবার রোগীর খবর নিয়েছেন বলেও জানান শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি এক শিশুর অভিভাবক।

 

‘সরকারে ছয় মাসে সেবার মান বেড়েছে’

হামের ক্রম বর্ধমান প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে চলতি মাসের শেষেই দেশব্যাপী হামের বিশেষ টিকা ক্যাম্পেইন শুরু হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। সরকারি হাসপাতালে শতভাগ চিকিৎসক উপস্থিতি ও সেবার মান বৃদ্ধিতে সরকার কাজ করছে বলেও জানান তিনি।

 

শুক্রবার সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সিলেট ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতাল ও শহীদ ডা. শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

 

সকালে হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগ পরিদর্নশন ও হাসপাতালের সার্বিক কার্যক্রম সম্পর্কে খোঁজ নেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডা. জিয়াউর রহমান চৌধুরী, ওসমানী হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল উমর রাশেদ মুনিরসহ সংশ্লিষ্টরা।

 

সরকারের নৈপুণ্যে পর্যাপ্ত পরিমাণ ভ্যাকসিন আনা হয়েছে উল্লেখ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এ মাসে শেষের দিকে আবারও হামের টিকাদানের ক্যাম্পেইন শুরু হবে।’

 

সরকারি হাসপাতালকে দালালমুক্ত করা হবে জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এটা দুর্ভাগ্যজনক সত্য যে, একটা শ্রেণী আমাদের রোগীদেরকে ভুল কথা বলে বিভিন্ন ক্লিনিকে নিয়ে যায়। এই দালালকে ধরার জন্য আমাদের র‌্যাব, ডিজিএফআই একযোগে কাজ করছে। বহু হাসপাতালে হানা দিয়েছে, তাদেরকে গ্রেফতার আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।’

 

তিনি বলেন, ‘জেলাগুলোতে ডিসি ও সিভিল সার্জনদের মাধ্যমে সমানে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে, জরিমানা করা হচ্ছে এবং অবৈধ ক্লিনিক সিলগালা করা হচ্ছে। যেখানে অবৈধ ডাক্তার দিয়ে ভূয়া সার্টিফিকেটধারী টেকনিশিয়ান দিয়ে অপারেশন করা হয়, সব আমরা সিলগালা করছি। আমি নিজে থেকে লিস্ট নিয়ে করছি। একটু সময় তো আমাদের দিবেন, ছয়টা মাস।’

 

দেশের স্বাস্থ্য খাতের জনবল সংকটের চিত্র তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশে প্রতি ১১ থেকে ১২ হাজার মানুষের বিপরীতে মাত্র একজন ডাক্তার বা নার্স আছেন। এই সীমিত জনবল নিয়েই স্বাস্থ্যকর্মীরা দিন-রাত বিরামহীনভাবে রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।’

 

স্বাস্থ্য খাতে জনবল সংকট কাটাতে আগামী তিন মাসের মধ্যে বড় পরিসরে নিয়োরে আওতায় সাড়ে ৭ হাজার নার্স, আড়াই হাজার চিকিৎসকসহ বিভিন্ন পদে মোট ৪৩ হাজার ৩৯০ জনকে নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে বিশেষত মিডওয়াইফ ও পরিচর্যাসেবা-সংশ্লিষ্ট পদগুলোতে ৮০ শতাংশ পদে নারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

 

গত ১৭ বছরে ডিসেম্বর ২০২০ এর পর হামের কোনো ক্যাম্পেইন না হওয়ায় দেশে হামের সংক্রমণ বেড়েছে উল্লেখ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য সংস্থার সহযোগিতায় পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন এনে টিকাদান কার্যক্রম চালানো হয়েছে।’

 

তিনি বলেন, ‘হামের টিকা সাধারণত ৬ মাসের নিচের শিশুদের দেওয়া যায় না। গত ২০ এপ্রিল যখন টিকা ক্যাম্পেইন শুরু হয়েছিল, তখন যে শিশুরা ৫ মাসের নিচে ছিল তারা টিকা পায়নি। পরবর্তীতে তারা ৬ মাস পার করে টিকার উপযুক্ত হলেও নিয়মিত ক্যাম্পেইন না থাকায় টিকা ছাড়া থেকে গেছে। আমরা আবার এই হামকে দমন করার জন্য প্রথম একটা দেশ হিসেবে তিন মাসের ভিতরে ক্যাম্পেইন রিপিট করতে যাচ্ছি। এই মাসের শেষ থেকে আবার আমরা ক্যাম্পেইন করে যাব।’

 

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘সরকার ক্ষমতায় আসার পর স্বাস্থ্য খাতে পরিবর্তন এসেছে। গেল ৬ মাসে দেশের সব হাসপাতালে চিকিৎসা সেবার মান বেড়েছে। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর ২৫টির ওপরে হাসপাতাল পরিদর্শন করেছি। সব জায়গায় চিকিৎসকদের শতভাগ উপস্থিতি ছিল। রোগীরাও বলছেন, এখন চিকিৎসার মান ও পরিবেশ উন্নত হয়েছে। খাবারের মানও ভালো হয়েছে। এখানের (ওসমানী হাসপাতালের) কি অবস্থা আমি জানি না, যদি কোনো সমস্যা থেকে থাকে তাহলে সাত দিনের মধ্যে সমাধান হবে।’

 

ওসমানী হাসপাতালের চিকিৎসকদের সময়মত উপস্থিত না হওয়া সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সময়মতো ডাক্তারদের আসা-যাওয়ায় সময়ানুবর্তিতা আগামী ৭ কর্মদিবসের মধ্যে নিশ্চিত করা হবে। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছি।’

 

সিলেটের নির্মাণাধীন ও অনুমোদিত সরকারি হাসপাতালগুলোও শিগগিরই চালুর আশ্বাস দেন মন্ত্রী।

Spread the love

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

আর্কাইভ

September 2026
M T W T F S S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930