চিতলমারীর ড্রেজার দিয়ে ভূগর্ভ থেকে বালু উত্তোলনের ‘মহোৎসব’,নদীগর্ভে সড়ক, ঝুঁকিতে জনপদ

প্রকাশিত: ৮:৫৬ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৭, ২০২৬

চিতলমারীর ড্রেজার দিয়ে ভূগর্ভ থেকে বালু উত্তোলনের ‘মহোৎসব’,নদীগর্ভে সড়ক, ঝুঁকিতে জনপদ

প্রতিনিধি / বাগেরহাট ::

একদিকে নদীভাঙনের হাহাকার, অন্যদিকে মাটির তলা চুষে নেওয়ার অভিযোগ—দুই দিকের আগ্রাসনে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে বাগেরহাটের চিতলমারীর বিস্তীর্ণ জনপদ। মোংলা-ঘষিয়াখালী আন্তর্জাতিক নৌ চ্যানেলঘেঁষা এ এলাকায় শ্যালো ইঞ্জিনচালিত ড্রেজার দিয়ে ভূগর্ভ থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার ঘনফুট বালু তুলে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। প্রশাসনের জরিমানা ও নিষেধাজ্ঞার পরও থামছে না কথিত এই বালু কারবার। স্থানীয়দের আশঙ্কা, এভাবে মাটির নিচের বালু-মাটি অপসারণ চলতে থাকলে যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে নদীতীর, বসতভিটা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।

স্থানীয়দের ভাষ্য, মাটির গভীরে পাইপ ঢুকিয়ে পানি দিয়ে বেলেমাটি ভিজিয়ে আরেকটি পাইপের মাধ্যমে সেই মাটি-বালু চুষে তুলে নেওয়া হচ্ছে। উপজেলার খড়মখালী, পাঙ্গাশিয়া, নালুয়া, পিঁপড়াডাঙ্গাসহ বিভিন্ন এলাকায় এমন প্রায় ১৫ থেকে ২০টি ড্রেজার সক্রিয় থাকার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়রা এসব মেশিনকে বলছেন ‘আত্মঘাতী ড্রেজার’। তাঁদের অভিযোগ, নির্বিচারে বালু উত্তোলনের ফলে নদীতীর ও আশপাশের মাটি দুর্বল হয়ে পড়ছে; হুমকিতে পড়েছে সরকারি রাস্তা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার, মসজিদ ও ফসলি জমি।

ছোট খালে ‘দানব’ বলগেট, ঢেউয়ে ভাঙছে পাকা রাস্তা

অন্যদিকে সরু খালে বিশাল বলগেট দিয়ে বালু পরিবহনের অভিযোগে নতুন করে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। বাবুগঞ্জ বাজার থেকে চিতলমারী বাজার পর্যন্ত দুটি পাকা গ্রামীণ সড়ক বলগেটের ঢেউয়ের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এরই মধ্যে সড়কের বিভিন্ন অংশ ভেঙে নদীগর্ভে চলে গেছে। বলগেটের ধাক্কায় বোয়ালিয়া-খলিশাখালী লোহার পুল হেলে পড়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ঝুঁকিতে রয়েছে শেরে বাংলা কলেজ জামে মসজিদ।

স্থানীয়দের অভিযোগ, নবীর সরদার ও কামাল মেম্বারের বলগেট দিয়ে লাইসেন্স ও রুট পারমিট ছাড়াই বালু পরিবহন করা হচ্ছে। পাশাপাশি চরকুড়াতলা এলাকার কৃষিজমি ও জলাশয়ের শ্রেণি পরিবর্তনের অভিযোগও উঠেছে। তবে নবীর সরদার এসব অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, তাঁর ট্রলার ও বলগেটের প্রয়োজনীয় রুট পারমিট ও লাইসেন্স রয়েছে এবং বালু পরিবহন অবৈধ নয়।

অর্ধশত মানুষের লিখিত অভিযোগ

পরিস্থিতির প্রতিকার চেয়ে বাগেরহাট জেলা প্রশাসক, চিতলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত আবেদন করেছেন অর্ধশতাধিক এলাকাবাসী। তাঁদের দাবি—অবৈধ ড্রেজার ও বলগেট বন্ধ করে নদী, খাল, সড়ক ও জনবসতি রক্ষায় জরুরি ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন-২০১০ কার্যকরভাবে প্রয়োগের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

আবেদনকারী বাশার খান, মো. জসিম শেখ ও মো. রফিকুল ইসলামসহ স্থানীয়রা বলেন, “লাইসেন্স ও রুট পারমিটবিহীন অবৈধ বলগেট ও ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন বন্ধ না হলে গুরুত্বপূর্ণ দুটি পাকা সড়ক, মসজিদ ও জনবসতি রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।”

প্রশাসন বলছে ‘জিরো টলারেন্স’

চিতলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খাদিজা আক্তার বলেন, ভূগর্ভ থেকে বালু বা মাটি উত্তোলন নিষিদ্ধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে প্রশাসন ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে কাজ করছে। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের চিঠি পাওয়া গেছে এবং বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।

তবে এলাকাবাসীর প্রশ্ন—প্রশাসনের অভিযান ও জরিমানার পরও যদি মাটির তলা থেকে বালু ওঠে, ছোট খালে বড় বলগেট চলে এবং সড়ক-পুল ভাঙনের মুখে পড়ে, তাহলে নিয়ন্ত্রণের কার্যকারিতা কোথায়?

স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে নদীভাঙন ও অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনের সম্মিলিত প্রভাবে আরও বসতভিটা, কৃষিজমি ও সরকারি স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হতে পারে। তাই শুধু অভিযান নয়, নদীতীর সংরক্ষণ, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক-পুল রক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে চিতলমারীর জনপদকে রক্ষার দাবি উঠেছে জোরালোভাবে।

Spread the love

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

আর্কাইভ

September 2026
M T W T F S S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930