অবহেলায় ক্ষয় হচ্ছে বিশ্ব ঐতিহ্যের নয় গম্বুজ মসজিদ

প্রকাশিত: 2:44 PM, August 5, 2026

অবহেলায় ক্ষয় হচ্ছে বিশ্ব ঐতিহ্যের নয় গম্বুজ মসজিদ

প্রতিনিধি / বাগেরহাট ::

 

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জনপদ বাগেরহাটে অবস্থিত বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ ঐতিহাসিক নয় গম্বুজ মসজিদ আজ অবহেলা আর অযত্নে ধীরে ধীরে ক্ষয়ের মুখে পড়ছে। কোথাও শ্যাওলা জমেছে, কোথাও দেয়ালের অংশ খসে পড়ছে, আবার কোথাও লবণাক্ততার প্রভাবে ইট ও গাঁথুনির ক্ষয় দেখা দিয়েছে। চারপাশে আগাছা ও পরগাছার বিস্তারও উদ্বেগজনক। দ্রুত সংস্কার ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে শতাব্দীপ্রাচীন এই স্থাপনাটি একসময় ধ্বংসাবশেষে পরিণত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

বাগেরহাট সদর উপজেলার খান জাহান আলী (রহ.)-এর মাজার থেকে প্রায় ৪০০ মিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে ঠাকুর দিঘি বা খাঞ্জেলী দিঘির পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত নয় গম্বুজ মসজিদ। ১৫শ শতকে সুলতানি আমলে নির্মিত এ মসজিদ ইউনেস্কো ঘোষিত ‘ঐতিহাসিক মসজিদের শহর বাগেরহাট’-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন।

 

স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকে নয় গম্বুজ মসজিদ অত্যন্ত অনন্য। মসজিদের অভ্যন্তরে দুই সারি পাথরের স্তম্ভের মাধ্যমে পুরো কাঠামোকে নয়টি বর্গাকার খণ্ডে বিভক্ত করা হয়েছে এবং প্রতিটি খণ্ডের ওপর নির্মিত হয়েছে একটি করে গম্বুজ। চারটি পাথরের স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা নয়টি গম্বুজ, টেরাকোটার অলংকরণ, পোড়ামাটির কারুকাজ এবং তিনটি মেহরাব মসজিদটির নান্দনিক সৌন্দর্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

 

মসজিদের সামনে একটি প্রধান প্রবেশদ্বার এবং দুই পাশে দুটি পার্শ্বদ্বার রয়েছে। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে যে, মসজিদের একটি স্তম্ভে হজরত খান জাহান আলী (রহ.)-এর আঙুলের ছাপ সংরক্ষিত আছে। এ কারণেও দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে এটি বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।

 

নয় গম্বুজ মসজিদের ইমাম ও খতিব মাওলানা ওমর ফারুক বলেন, “নয় গম্বুজ মসজিদটি হজরত খান জাহান আলী (রহ.)-এর ইবাদতখানা হিসেবে পরিচিত। এখানে তাঁর স্মৃতিবিজড়িত অনেক নিদর্শন রয়েছে। কিন্তু মসজিদের বিভিন্ন অংশে ফাটল দেখা দিয়েছে, কোথাও লবণাক্ততা ধরেছে, আবার ছাদ থেকেও পানি পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। দ্রুত সংস্কার না করা হলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে।”

 

তিনি আরও বলেন, “স্থানীয় মানুষ মসজিদটি রক্ষায় আগ্রহী। অনেকেই নিজ উদ্যোগে সংস্কার করতে চান। কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা হওয়ায় অনুমতি ছাড়া কোনো কাজ করা সম্ভব নয়। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত উদ্যোগ প্রয়োজন।”

 

স্থানীয় বাসিন্দা আশিকুর রহমান বলেন, “হজরত খান জাহান আলী (রহ.) বাগেরহাটে এসে ইসলাম প্রচারের পাশাপাশি অসংখ্য মসজিদ ও স্থাপনা নির্মাণ করেছিলেন। নয় গম্বুজ মসজিদ তারই একটি অনন্য নিদর্শন। কিন্তু বর্তমানে এটি অবহেলার শিকার। ষাট গম্বুজ মসজিদে কিছু সংস্কার কাজ হলেও নয় গম্বুজ মসজিদে তেমন কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না। দ্রুত সংরক্ষণ না করা হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি দেখতে পাবে না।”

 

বাগেরহাট রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির বলেন, “মসজিদের বিভিন্ন স্থানে লবণাক্ততার প্রভাব স্পষ্ট। দেয়ালে শ্যাওলা জমেছে, কোথাও কোথাও গাঁথুনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং পরগাছা জন্মেছে। এভাবে অবহেলায় পড়ে থাকলে একসময় স্থাপনাটির অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়বে। এটি শুধু বাগেরহাটের নয়, পুরো দেশের ঐতিহ্য। তাই জরুরি ভিত্তিতে সংরক্ষণ ও সংস্কার কার্যক্রম শুরু করা প্রয়োজন।”

 

ঐতিহ্য সংরক্ষণে সংশ্লিষ্টদের মতে, উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ত পরিবেশ, প্রাকৃতিক ক্ষয় এবং দীর্ঘদিনের অপর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণের কারণে নয় গম্বুজ মসজিদের ক্ষতি দ্রুত বাড়ছে। বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা ধরে রাখতে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই স্থাপনাকে সংরক্ষণ করতে হলে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের জরুরি ও কার্যকর উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।

 

ছবির ক্যাপশন: বাগেরহাটের ঐতিহাসিক নয় গম্বুজ মসজিদের দেয়ালে শ্যাওলা, লবণাক্ততা ও কাঠামোগত ক্ষয়ের চিহ্ন। দ্রুত সংস্কার না হলে ঝুঁকিতে পড়তে পারে বিশ্ব ঐতিহ্যের এই স্থাপনাটি।

Spread the love

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

আর্কাইভ

October 2026
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031