সিলেট ১৮ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৩:৩৭ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৭, ২০২৬
স্পোর্টস ডেস্ক ::
বাংলাদেশের কাছে ডারউইন টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার ভরাডুবির পর দেশটির টেস্ট দলে নতুন করে ঢেলে সাজানোর দাবি উঠেছে। তবে জর্জ বেইলি, অ্যান্ড্রু ম্যাকডোনাল্ড ও নির্বাচকরা অপ্রত্যাশিতভাবে সিদ্ধান্ত না বদলালে সেই দাবিতে খুব বেশি সাড়া মিলবে না বলেই মনে হচ্ছে।
বাংলাদেশের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টের আগে অস্ট্রেলিয়ার হাতে পুনর্গঠনের জন্য ছয় দিন সময় রয়েছে। তবে চার বছরের দায়িত্বকালে, এমনকি প্রায় দেড়শ বছরের টেস্ট ইতিহাসে অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত পরাজয়গুলোর একটির পরও প্রধান কোচ অ্যান্ড্রু ম্যাকডোনাল্ড বাস্তবতা এড়িয়ে যাননি।
ডারউইনে তিনি বলেন, ‘এই টেস্ট ম্যাচে আমরা খুবই খারাপ খেলেছি। ওই উইকেটে দুই ইনিংস মিলিয়ে ৫০০ রানের কম করলে আমাদের অবশ্যই উন্নতি করতে হবে। বিষয়টি মেনে নেওয়া কঠিন। আমরা নিজেদের মান ধরে রাখতে পারিনি।’
সাবেক অধিনায়ক রিকি পন্টিংও দলে পরিবর্তনের দাবিতে সরব হয়েছেন। রোববার চ্যানেল সেভেনকে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় তাদের পরিবর্তন আনতেই হবে। গত গ্রীষ্মের শেষে আমি বলেছিলাম, দলটিকে নতুন করে গড়ে তোলার এটাই আদর্শ সময়।’
শনিবার ম্যাকেতে শুরু হতে যাওয়া দুই ম্যাচের সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টের জন্য অস্ট্রেলিয়ার দলে পরিবর্তনের সম্ভাবনা অবশ্য উড়িয়ে দেওয়া হয়নি। তবে একাদশে জায়গা করে নেওয়ার মতো একেবারে নতুন মুখের সংখ্যা খুবই কম।
অস্ট্রেলিয়ার আগামী ১২ মাসে সর্বোচ্চ ২১টি টেস্ট খেলার সম্ভাবনা রয়েছে। সেই দীর্ঘ পথচলায় পন্টিং সবচেয়ে বেশি পরিবর্তনের প্রয়োজন দেখছেন বর্তমানে ওপেনার জেক ওয়েদারাল্ড ও তিন নম্বরে খেলা মারনাস লাবুশেনের জায়গায়।
ম্যাকডোনাল্ড বলেন, ‘দলের খেলোয়াড়দের বয়স, আমরা কোথায় আছি, কীভাবে এগোচ্ছি—এসব নিয়ে আলোচনা সবসময়ই থাকবে। একটি হার সেই আলোচনাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, এই খেলোয়াড়দের এখনো অনেক ক্রিকেট খেলার সামর্থ্য আছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখন বিষয়টি হলো আমরা কীভাবে পরিস্থিতি সামলাই। হারলেই পরিবর্তনের দাবি উঠবে। বাইরে যেমন আবেগ কাজ করবে, ভেতরেও তেমনটা হবে। আমাদের খেলোয়াড়রা সেই সাজঘরে বসে আছে এবং তারাও বিষয়টি অনুভব করছে। টেস্ট হারার অনুভূতি আলাদা। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে খেলা তাদের কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই বিষয়টিও যেন আমরা ভুলে না যাই।’
‘পরিবর্তনের দাবি তোলা সবচেয়ে সহজ কাজ। আমরা জিতলেও অনেকে পরিবর্তনের কথা বলেন। এমন পারফরম্যান্সের পর তারা কেন বলবেন না? সেটিও তাদের অধিকার। এটাই আমাদের বাস্তবতা।’
পরিবর্তন এলে প্রাথমিকভাবে যাদের কথা ভাবা হতে পারে, তাদের মধ্যে পন্টিংয়ের উল্লেখ করা তরুণ ক্যাম্পবেল কেলাওয়ে ও অলি পিকের চেয়ে অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের সম্ভাবনাই বেশি।
ডারউইনে দলের সঙ্গে থাকা ৩১ বছর বয়সী ব্যাটার ও উইকেটরক্ষক জশ ইংলিস গত এক বছরে স্টিভ স্মিথ ও উসমান খাজার অনুপস্থিতিতে প্রথম সারির ব্যাটার হিসেবে সবার আগে সুযোগ পেয়েছেন।
সেই সময় কখনো চার নম্বরে, কখনো সাত নম্বরে ব্যাট করেছেন ইংলিস। তবে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার হয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সাধারণত পাঁচ নম্বরের ওপরে ব্যাট করেননি তিনি। যদিও নির্বাচকপ্রধান জর্জ বেইলি আগে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ইংলিসকে প্রথম তিন ব্যাটারের একজন হিসেবেও খেলানো যেতে পারে। গত নভেম্বরে ইংল্যান্ড লায়ন্সের বিপক্ষে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের হয়ে ওপেন করতে নেমে ৪০ ও অপরাজিত ১২৫ রান করেছিলেন তিনি।
৩০ বছর বয়সী ম্যাথিউ রেনশ ১০ বছর আগে টেস্ট অভিষেক করেছিলেন। বাংলাদেশ সিরিজের আগে অস্ট্রেলিয়ার প্রস্তুতি শিবিরে থাকা নিয়মিত প্রথম তিন ব্যাটারের মধ্যে তিনিই একমাত্র। গত গ্রীষ্মে প্রথম শ্রেণির ১০ ইনিংসে তিনটি শতক করেছিলেন রেনশ। গড় ছিল প্রায় ৫০। তবে তার আগের দুটি মৌসুমে কুইন্সল্যান্ডের হয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তার গড় ৩০-এর নিচে ছিল।
ম্যাকের হ্যারাপ পার্কে দুটি প্রথম শ্রেণির শতক করা একমাত্র ক্রিকেটার হওয়ায় উত্তর কুইন্সল্যান্ডের কন্ডিশনের জন্য রেনশকে বিশেষভাবে বিবেচনা করা হতে পারে। সর্বশেষ ২০২৩ সালে ভিক্টোরিয়ার বিপক্ষে শেফিল্ড শিল্ডের ম্যাচে সেখানে শতক করেছিলেন তিনি।
এরপর রয়েছে ২২ বছর বয়সী কুপার কনোলি। তরুণ প্রতিভাবান খেলোয়াড় খুঁজছেন যারা, তাদের চাহিদার সঙ্গে কনোলি বেশ মানানসই। বাংলাদেশ সিরিজের আগে ১৯ সদস্যের প্রস্তুতি দলে তিনিও ছিলেন। যদিও অধিনায়ক প্যাট কামিন্স জানিয়েছিলেন, সেই প্রস্তুতিতে সাদা বলের ক্রিকেটারদেরও রাখা হয়েছিল।
গত বছর গল টেস্টে আট নম্বরে নেমে স্পিন বোলিং করা কনোলির ভূমিকা এখনো পুরোপুরি নির্ধারিত নয়। বাংলাদেশের বিপক্ষে সম্প্রতি তিন নম্বরে ব্যাট করে শতকও করেছেন তিনি। তবে সেটি ছিল জুনের দ্বিপক্ষীয় একদিনের সিরিজের নিয়মরক্ষার ম্যাচ।
প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে কনোলির রেকর্ড অবশ্য অন্য তরুণ অস্ট্রেলীয় ব্যাটারদের তুলনায় ভালো। ২১ ইনিংসে তার ব্যাটিং গড় ৪৪ দশমিক ৬৩। কিন্তু মাত্র দুবার চার বা তার ওপরে ব্যাট করেছেন। মার্চে শুধু ব্যাটার হিসেবে খেলার সুযোগ পাওয়ার সময় পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া দল থেকেও বাদ পড়েছিলেন তিনি। পিঠের চোটের কারণে গত পাঁচ মাস কোনো ম্যাচে বোলিংও করেননি। ফলে পূর্ণাঙ্গ অলরাউন্ডার হিসেবে তাকে খেলানো যাবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
২৭ বছর বয়সী নাথান ম্যাকসুইনি সাম্প্রতিক সময়ে নর্থহ্যাম্পটনশায়ারের হয়ে কাউন্টির একদিনের ও টি-টোয়েন্টি প্রতিযোগিতায় প্রচুর রান করেছেন।
আরও তরুণদের মধ্যে রয়েছে ২০ বছর বয়সী ওপেনার স্যাম কনস্টাস, ২৩ বছর বয়সী কেলাওয়ে এবং ১৯ বছর বয়সী পিকে। তবে এখন পর্যন্ত কেউই এমন পারফরম্যান্স করতে পারেননি, যাতে দল থেকে কাউকে সরিয়ে তাদের জায়গা করে দেওয়ার দাবি জোরালো হয়।
গত মৌসুমের শেফিল্ড শিল্ডে ২৭ বছর বা তার কম বয়সী এবং পাঁচটির বেশি ইনিংসে ব্যাট করা ব্যাটারদের মধ্যে মাত্র দুজনের গড় ৪০-এর বেশি ছিল। তাদের একজন ডারউইনে অস্ট্রেলিয়ার সেরা খেলোয়াড় ক্যামেরন গ্রিন। অন্যজন জ্যাক এডওয়ার্ডস, যিনি গত চার বছরে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ছয় নম্বরের ওপরে ব্যাট করেননি।
২৫ বছরের কম বয়সী ব্যাটারদের মধ্যে গত মৌসুমে শেফিল্ড শিল্ডে সবচেয়ে বেশি রান করেছেন কনস্টাস। ৩৩ গড়ে তার রান ৬৬০। এরপর লিয়াম স্কট ৫৪৭ রান, কেলাওয়ে ৫০৯ রান এবং কনোলি আট ইনিংসে ২১৬ রান করেন।
প্রতিভাবান ক্রিকেটার হিসেবে পরিচিত পিকে চলতি বছর একদিনের ক্রিকেটে অভিষেক করেছেন। তবে লাল বলের ক্রিকেটে তাকে এখনো দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত মৌসুমে ১৭টি শেফিল্ড শিল্ড ইনিংসে মাত্র ৩২৩ রান করেছিলেন তিনি, গড় ছিল ২৩ দশমিক ০৭।
বোলিং বিভাগে পরিবর্তনের সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম। সবচেয়ে সম্ভাব্য পরিবর্তন হতে পারে স্কট বোল্যান্ডকে চার প্রধান পেসারের একজনের জায়গায় নেওয়া।
ম্যাকডোনাল্ড বলেন, ‘বোলিংয়ের বিষয়টি একটু আলাদা। বেশির ভাগ সময়ই কন্ডিশনের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তাদের শারীরিক সক্ষমতার বিষয়টিও বিবেচনায় থাকে, যা ব্যাটিং বিভাগের ক্ষেত্রে এতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি মনে করি না, আমরা এই টেস্ট হেরেছি বলেই হঠাৎ করে সবকিছু বদলে ফেলব। সেরা একাদশ বের করতে আমরা যেভাবে সবসময় কাজ করি, সেভাবেই পুরো বিষয়টি পর্যালোচনা করব।’
‘পরিবর্তন নিয়ে আমরা আবেগপ্রবণ নই। একটি ম্যাচ হারলেই পরিবর্তন করতে হবে—এমনটা নয়। আমাদের ভাবতে হবে, দলকে কীভাবে আরও কার্যকর করা যায়, কীভাবে খেলোয়াড়দের কাছ থেকে সেরাটা পাওয়া যায়।’
‘আর যদি পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়, তাহলে আমরাই সিদ্ধান্ত নেব যে অন্য কাউকে দলে নিলে দলটি আরও ভালো হবে।’
ম্যাকডোনাল্ড জানান, গত গ্রীষ্মের অ্যাশেজের পর জেক ওয়েদারাল্ড ও মারনাস লাবুশেন দুজনই নিজেদের ব্যাটিং কৌশলে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছেন।
ছয় টেস্ট খেলা ওয়েদারাল্ডের ক্ষেত্রে কোচ মনে করেন, তার ক্যারিয়ার এখনো এমন পর্যায়ে রয়েছে যে পরিবর্তনগুলো কতটা কার্যকর হয়েছে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন।
অন্যদিকে ৬৪ টেস্টের অভিজ্ঞ লাবুশেনের পরিবর্তনগুলো নিয়ে আশার কিছু দিক দেখলেও ডারউইনে ১ ও ৩১ রানের ইনিংস তার জন্য যথেষ্ট নয় বলে স্বীকার করেছেন ম্যাকডোনাল্ড।
তিনি বলেন, ‘তার রান নেই। সে বিষয়টি অনুভব করছে। আমরাও অনুভব করছি। কোচিং দল হিসেবে আমরা তার কাছ থেকে সেরাটা বের করে আনার জন্য কঠোর পরিশ্রম করছি। তার কিছুটা খারাপ সময় যাচ্ছে। সে বিষয়টি জানে এবং এ নিয়ে কাজও করছে।’
‘তার ব্যাটিংয়ে কিছু পরিবর্তন আমরা দেখেছি, সেটি ভালো দিক। চাপের মধ্যেও তার করা কিছু পরিবর্তন কাজে লেগেছে বলে মনে হচ্ছে। তবে তাকে বড় রান করতেই হবে।’