সিলেট ৩০শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৫ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৭:৫৪ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২৬
প্রতিনিধি / বাগেরহাট ::
বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সাধারণ ভবিষ্য তহবিলের (জিপিএফ) টাকা নিয়ে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষকদের অজ্ঞাতে জিপিএফ থেকে ঋণ দেখিয়ে বিভিন্ন বিল-ভাউচারের মাধ্যমে টাকা উত্তোলনের অভিযোগ তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ ঘটনায় উপজেলার প্রায় দেড় হাজার শিক্ষক চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। একই সঙ্গে উপজেলার অন্যান্য দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) বিকেলে দুদকের একটি প্রতিনিধিদল ঘটনাটি তদন্ত শুরু করে। বাগেরহাট জেলা দুদকের সহকারী পরিচালক আবুল কাইয়ুম হাওলাদারের নেতৃত্বে দলটি মোরেলগঞ্জ উপজেলা শিক্ষা অফিস, হিসাবরক্ষণ অফিস ও সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই-বাছাই করে।
দুদক কর্মকর্তা আবুল কাইয়ুম হাওলাদার বিকেল ৫টার দিকে প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, “জালিয়াতির আশ্রয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জিপিএফ ফান্ড থেকে টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। টাকাগুলো ঋণ হিসেবে বিল-ভাউচারের মাধ্যমে সোনালী ব্যাংক থেকে তোলা হয়েছে। এসব লেনদেনের বিষয়ে শিক্ষা অফিস কোনো সঠিক নথি বা রেকর্ড দেখাতে পারেনি।”
হিসাবরক্ষণ অফিসের নথি সম্পর্কে তিনি বলেন, “শিক্ষকদের জিপিএফ থেকে টাকা তোলা হলেও লেজার ও অনলাইন হিসাবের মধ্যে ব্যাপক অসংগতি পাওয়া গেছে। এমনকি অনেক প্রয়োজনীয় নথিপত্রও তারা উপস্থাপন করতে পারেনি।”
ব্যাংক থেকে নগদে টাকা তোলার তথ্য
সোনালী ব্যাংকের ভূমিকার বিষয়ে দুদক কর্মকর্তা জানান, জিপিএফের টাকা জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যাংক থেকে সরাসরি নগদে তোলার তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নিয়ম অনুসারে ঋণের টাকা সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের ব্যাংক হিসাবে জমা হওয়ার কথা থাকলেও কিছু ক্ষেত্রে তা করা হয়নি।
তিনি বলেন, “তবে এ ক্ষেত্রে শিক্ষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না, পরোক্ষভাবে রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
সরকারি কোষাগার থেকে মোট কত টাকা সরানো হয়েছে এবং কোন দপ্তরের কতজন কর্মকর্তা-কর্মচারী এতে জড়িত—তা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয় বলেও জানান তিনি।
বাড়ছে ভুক্তভোগী শিক্ষকের সংখ্যা
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শেফাইনূর আরেফিন বলেন, শিক্ষকদের জিপিএফ ফান্ড থেকে টাকা তোলা হলেও সংশ্লিষ্ট অনেক শিক্ষক এ বিষয়ে অবগত নন।
তিনি বলেন, “এখন পর্যন্ত কতজন শিক্ষকের ফান্ড থেকে টাকা সরানো হয়েছে, তার সঠিক হিসাব পাওয়া যায়নি। দিন দিন ভুক্তভোগী শিক্ষকের সংখ্যা বাড়ছে। বিষয়টি বর্তমানে দুদক তদন্ত করছে।”
জিপিএফ থেকে টাকা তোলার অভিযোগে উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১৪ জন শিক্ষক ইতোমধ্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসক ও দুদক বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। প্রাথমিক অভিযোগে প্রায় এক কোটি টাকা বেহাত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হলেও শিক্ষকদের দাবি, অন্তত ৭০ জন শিক্ষকের জিপিএফ থেকে ঋণ দেখিয়ে প্রায় ১০ কোটি টাকা সরানো হয়ে থাকতে পারে।
তবে এই অর্থের প্রকৃত পরিমাণ এখনো নিশ্চিত নয়। দুদকের তদন্তে নথিপত্র যাচাই ও সংশ্লিষ্ট হিসাব পর্যালোচনার পর প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
হিসাবরক্ষণ অফিসেও মিলছে অসংগতি
উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা তন্ময় গোস্বামী বলেন, “ঘটনার তদন্ত চলছে। এ জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে এ অফিসের কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তাকে ইতিমধ্যে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।”
আত্মসাৎকৃত অর্থের পরিমাণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, এখন পর্যন্ত প্রায় ৭ কোটি টাকার গরমিল পাওয়া গেছে। তবে গরমিলের কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দিতে তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন।
সোনালী ব্যাংকের বক্তব্য
সোনালী ব্যাংক মোরেলগঞ্জ শাখার ব্যবস্থাপক মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, হিসাবরক্ষণ অফিস থেকে অনুমোদিত বিল-ভাউচারের মাধ্যমে শিক্ষকদের জিপিএফ ফান্ড থেকে ঋণ হিসেবে টাকা তোলা হয়েছে।
তিনি বলেন, “এখান থেকে বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা জমা এবং সরাসরি নগদ টাকাও তুলে নেওয়া হয়েছে। সব লেনদেন হিসাবরক্ষণ অফিসের আনুষ্ঠানিক এমবসড সিলের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়েছে।”
ভুয়া স্বাক্ষরের অভিযোগ, তদন্তে জড়িতদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে
অভিযোগ ও প্রাথমিক অনুসন্ধানে শিক্ষকদের ভুয়া স্বাক্ষর ব্যবহার করে জিপিএফ ঋণের আবেদন তৈরি এবং ব্যাংক থেকে অর্থ উত্তোলনের বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে কারা এসব নথি তৈরি ও অর্থ উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তা এখনো তদন্তাধীন।
এ ঘটনায় শিক্ষা ও হিসাবরক্ষণ অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর পাশাপাশি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক-শিক্ষিকার সংশ্লিষ্টতার কথাও স্থানীয়ভাবে আলোচনায় রয়েছে। তবে তাদের কারও বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা এখনো তদন্তে প্রমাণিত হয়নি।
দুদকের তদন্ত শুরু হওয়ায় এখন মূল প্রশ্ন—কতজন শিক্ষকের জিপিএফ হিসাব থেকে কত টাকা উত্তোলন করা হয়েছে, কারা এসব অর্থ উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত এবং সংশ্লিষ্ট নথিতে কীভাবে অনুমোদন দেখানো হয়েছে। এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে তদন্ত ও হিসাব-নথি যাচাই শেষ হলে।
তবে জিপিএফের মতো অবসরকালীন আর্থিক নিরাপত্তার তহবিল নিয়ে এমন অভিযোগে উপজেলার বিপুলসংখ্যক শিক্ষক উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন। তদন্ত দ্রুত শেষ করে প্রকৃত ঘটনা ও অর্থের পরিমাণ প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছেন তারা।