রাষ্ট্রপতি জিয়ার মৃত্যু পরবর্তী জীবন সংগ্রাম

প্রকাশিত: 1:01 PM, December 31, 2025

রাষ্ট্রপতি জিয়ার মৃত্যু পরবর্তী জীবন সংগ্রাম

লন্ডন বাংলা ডেস্ক ::

 

রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শুধু বাংলাদেশের রাজনীতিতেই নয়, বেগম খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনেও নেমে আসে গভীর অন্ধকার। একজন রাষ্ট্রনায়কের সহধর্মিণী থেকে হঠাৎ করেই তিনি হয়ে ওঠেন দুই সন্তানের দায়িত্বে থাকা এক বিধবা গৃহিণী। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর যে অধ্যায় শুরু হয়Ñ তা ছিল শোক, অনিশ্চয়তা, সামাজিক চাপ এবং জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াইয়ের গল্প।

 

জিয়াউর রহমান জীবিত থাকাকালে খালেদা জিয়া ছিলেন অনেকটাই আড়ালে থাকা একজন নারী। রাষ্ট্রপতি ভবনের আনুষ্ঠানিকতা থাকলেও তিনি প্রকাশ্য রাজনীতি বা ক্ষমতার বলয়ের অংশ ছিলেন না। সংসার, সন্তান আর পারিবারিক দায়িত্বই ছিল তাঁর প্রধান পরিচয়। কিন্তু রাষ্ট্রপতি জিয়ার মৃত্যুতে মুহূর্তে সবকিছু বদলে যায়। মাত্র ৩৬ বছর বয়সে বিধবা হন বেগম জিয়া। রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্র থেকে এক প্রকার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন তিনি। স^ামীর মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা ও রাজনৈতিক প্রভাব, সবকিছুই অনিশ্চিত হয়ে ওঠে।

 

 

ঘনিষ্ঠজনদের ভাষ্যমতে, এ সময় তিনি ছিলেন ভীষণ সংযত ও অন্তর্মুখী। শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে সন্তানদের সামনে নিজেকে দৃঢ় রেখেছেন। রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও সন্তানদের স্বাভাবিক জীবন দেওয়ার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে নিরাপত্তাজনিত কারণে সন্তানদের বাইরে চলাচল সীমিত হয়ে পড়ে, যা পারিবারিক জীবনে বাড়তি চাপ তৈরি করে।

 

 

জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পরপরই বিএনপির ভেতরে-বাইরে শুরু হয় নানা টানাপড়েন। কেউ কেউ চেয়েছিলেন জিয়ার পরিবারকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে, আবার কেউ কেউ মনে করছেন দল ও আদর্শ টিকিয়ে রাখতে পরিবারের ভূমিকা জরুরি। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে খালেদা জিয়ার সংসার জীবনে। রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি চেষ্টা করেছিলেন সন্তানদের নিয়ে একটি নিরিবিলি জীবনযাপন করতে। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা তাঁকে সেই সুযোগ দেয়নি। দলীয় নেতাদের আনাগোনা, রাজনৈতিক পরামর্শ, নিরাপত্তা সংক্রান্ত আলোচনা, এসবের ভিড়ে সংসার জীবন হয়ে ওঠে চাপপূর্ণ।

 

 

 

খালেদা জিয়ার জীবনের এই অধ্যায়টি মূলত একা মায়ের সংগ্রামের গল্প। দুই ছেলেকে বড় করার পাশাপাশি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গেও লড়াই করতে হয়েছে তাঁকে। একজন ক্ষমতাধর রাষ্ট্রপতির স্ত্রী থেকে একজন বিধবাÑ এই রূপান্তর সহজ ছিল না। তিনি চেষ্টা করেছেন সন্তানদের অন্তত রাজনৈতিক বিতর্ক থেকে দূরে রাখতে। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। জিয়াউর রহমানের নাম, উত্তরাধিকার আর রাজনৈতিক পরিচয় সন্তানদের জীবনেও প্রভাব ফেলতে থাকে। বিশেষ করে তারেক রহমানকে ঘিরে শুরু হয় রাজনৈতিক আলোচনা, যা পারিবারিক শান্তি ব্যাহত করে। এমন পরিস্থিতিতে সন্তানদের ভবিষ্যৎ, পরিবারের সম্মান এবং নিজের অবস্থান, সবকিছু রক্ষার জন্য বেগম জিয়াকে ধীরে ধীরে বাস্তববাদী হতে হয়।

 

 

রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগের সময়টুকু ছিল খালেদা জিয়ার জীবনের সবচেয়ে দোদুল্যমান অধ্যায়। সংসার রক্ষা করবেন, নাকি স্বামীর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার রক্ষা করবেনÑ এই দ্বন্দ্ব তাঁকে দীর্ঘদিন তাড়িত করেছে। জিয়াউর রহমান পরবর্তী খালেদা জিয়ার জীবনে সবচেয়ে বড় বিষয় ছিল ত্যাগ। ব্যক্তিগত সুখ, স্বাভাবিক পারিবারিক জীবনÑ সবকিছুই একে একে গৌণ হয়ে যায়। নিজের আবেগকে আড়াল করে সন্তানদের সামনে দৃঢ় থাকার চেষ্টা করেছেন তিনি। অনেক সময় রাজনৈতিক ও সামাজিক আক্রমণের মুখেও সংসারের ভেতরে নীরব থেকেছেন। প্রকাশ্যে না বললেও কাছের মানুষদের কাছে তিনি স্বীকার করেছেন, ওই সময়টা ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়।

 

 

এই সংগ্রামই ধীরে ধীরে খালেদা জিয়াকে মানসিকভাবে দৃঢ় করে তোলে। সংসার সামলাতে সামলাতেই তাঁর ভেতরে তৈরি হয় দায়িত্বশীলতা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ও নেতৃত্বের গুণাবলিÑ যা পরবর্তী সময় রাজনীতিতে আসাটা সহজ করে তোলে। রাজনীতিতে প্রবেশের আগেই তিনি শিখে যান চাপ সামলানো, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে স্থির থাকা এবং পরিবারকে আগলে রাখার কৌশল। এসব অভিজ্ঞতা তাঁকে ভবিষ্যতের কঠিন রাজনৈতিক লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত করে। সন্তানদের মানুষ করা এবং সামাজিক-রাজনৈতিক চাপে নিজেকে স্থির রাখা, এই লড়াইয়ের ভেতর দিয়েই তিনি পরবর্তী সময় জাতীয় রাজনীতির মঞ্চে উঠে আসেন। দল সামলানোর পর তিনি পেয়ে যান দেশ পরিচালনার দায়িত্বও।

Spread the love

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

আর্কাইভ

October 2026
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031