বারোমাসি কাটিমন আম চাষে বাজিমাত মোরেলগঞ্জের কৃষক মুকুলের

প্রকাশিত: ৮:০৩ অপরাহ্ণ, মে ১৩, ২০২৬

প্রতিনিধি / বাগেরহাট ::

 

ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল নিজের পায়ে দাঁড়ানোর। চাকরির পেছনে না ছুটে আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার ইচ্ছা ছিল প্রবল। সেই স্বপ্নকেই বাস্তবে রূপ দিয়েছেন বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার দৈবজ্ঞহাটী ইউনিয়নের খালকুলা গ্রামের তরুণ কৃষক হালদার রুহুল মমিন মুকুল। বারোমাসি কাটিমন আম চাষ করে তিনি এখন এলাকায় সফল উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। তার বাগানের বিষমুক্ত আম অনলাইনের মাধ্যমে পৌঁছে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার শহর থেকে গ্রামাঞ্চলে।

 

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সবুজে ঘেরা বিশাল আম বাগানে সারি সারি গাছ। প্রতিটি গাছের ডালে থোকায় থোকায় ঝুলছে পাকা-আধাপাকা কাটিমন আম। পুরো বাগানজুড়ে যেন প্রকৃতির এক মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য ছড়িয়ে আছে। আর মাত্র দুই সপ্তাহ পর থেকেই শুরু হবে আম সংগ্রহ। ইতোমধ্যে বিভিন্ন এলাকা থেকে ক্রেতারা বাগানে এসে আগাম আম বুকিং দিচ্ছেন।

 

জানা যায়, ছাত্রজীবন শেষ করে আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি অন্যদের জন্যও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির লক্ষ্য নিয়ে ২০২০ সালে পৈতৃক দুই একর জমিতে আম বাগান গড়ে তোলেন মুকুল। প্রথমে চুয়াডাঙ্গা থেকে ১০০টি কাটিমন আমের চারা এনে রোপণ করেন। শুরুটা ছিল অনেকটা পরীক্ষামূলক। কিন্তু প্রথম বছরেই খরচ বাদ দিয়ে প্রায় ৫০ হাজার টাকা লাভ হওয়ায় নতুন করে আত্মবিশ্বাস ফিরে পান তিনি।

 

সেই সাফল্যের ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে আরও ২০০টি চারা রোপণ করেন। বর্তমানে তার বাগানে প্রায় ৩০০টি কাটিমন আম গাছ রয়েছে। গত কয়েক বছরে আশানুরূপ ফলন ও বাজারে ব্যাপক চাহিদার কারণে তিনি প্রায় আড়াই লাখ টাকার আম বিক্রি করেছেন। এ বছর গাছে গাছে প্রচুর মুকুল ও ফলন হওয়ায় আরও বড় স্বপ্ন দেখছেন এ তরুণ উদ্যোক্তা।

 

স্থানীয়রা জানান, কাটিমন আমের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এটি অত্যন্ত সুস্বাদু, মিষ্টি এবং আঁটি পাতলা। বছরজুড়ে ফলন হওয়ায় বাজারেও এর চাহিদা ব্যাপক। বাগান থেকে প্রতিকেজি আম বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১৫০ টাকায়। অনলাইনের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কুরিয়ার সার্ভিসে আম পাঠানো হচ্ছে নিয়মিত।

 

সফলতার গল্প বলতে গিয়ে কৃষক হালদার রুহুল মমিন মুকুল বলেন, “আমাদের এই উপকূলীয় অঞ্চলে আগে তেমন একটা আমের চাষ হতো না। লবণাক্ততার কারণে কৃষিতে অনেক সমস্যা ছিল। তবে এখন কিছুটা মিষ্টি পানি পাওয়ায় কাটিমন আম চাষ করে ভালো ফলন পেয়েছি। ছাত্রজীবন থেকেই স্বপ্ন ছিল নিজে কিছু করব, অন্যদেরও কাজের সুযোগ তৈরি করব। মাছ চাষসহ অনেক ধরনের কৃষিকাজ করেছি। শেষ পর্যন্ত কাটিমন আম চাষেই সবচেয়ে বেশি সফলতা পেয়েছি।”

 

তিনি আরও বলেন, “এ বছর আমার দুই একরের বাগানে প্রায় এক লাখ টাকা খরচ হয়েছে। শ্রমিক মজুরি, ওষুধ ও পরিচর্যা মিলিয়ে ব্যয় বাড়লেও ফলন অনেক ভালো হয়েছে। আশা করছি এ মৌসুমে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকার আম বিক্রি করতে পারব। সবচেয়ে আনন্দ লাগে যখন মানুষ বিষমুক্ত আম খেয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে।”

 

মুকুল জানান, ক্রেতারা সরাসরি বাগানে এসে নিজ হাতে গাছ থেকে আম সংগ্রহ করছেন। এছাড়া অনলাইনের মাধ্যমে অর্ডার নিয়েও দেশের বিভিন্ন এলাকায় কুরিয়ারে আম পাঠানো হচ্ছে। সাধারণ ক্রেতারা ০১৭১৪৫০৯৩৩৭ নম্বরে যোগাযোগ করে আম সংগ্রহ করতে পারবেন বলেও জানান তিনি।

 

এ বিষয়ে মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, “কাটিমন আমের বাজারমূল্য ও চাহিদা দুটোই অনেক বেশি। মোরেলগঞ্জ উপজেলার খাউলিয়া, বনগ্রামসহ কয়েকটি ইউনিয়নে ছোট ছোট বাগান গড়ে উঠেছে। তবে দৈবজ্ঞহাটীর খালকুলা গ্রামের কৃষক রুহুল মমিন মুকুল ব্যাপক পরিসরে কাটিমন আম চাষ করে গোটা উপজেলায় আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন। তার সফলতা দেখে অনেক তরুণ এখন আম চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।”

 

উপকূলীয় অঞ্চলে কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছেন এই তরুণ উদ্যোক্তা। তার সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনীতি ও আত্মকর্মসংস্থানের এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

Spread the love

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

আর্কাইভ

July 2026
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031