পানগুছি বলেশ্বরের ইলিশ এখন বিলাসিতা একসময় হালি ধরে বিক্রি হতো, এখন কেজিতে হাজার হাজার টাকা

প্রকাশিত: ১:৪৪ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৪, ২০২৬

পানগুছি বলেশ্বরের ইলিশ এখন বিলাসিতা একসময় হালি ধরে বিক্রি হতো, এখন কেজিতে হাজার হাজার টাকা

প্রতিনিধি / বাগেরহাট ::

 

বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ও মৎস্যভান্ডার হিসেবে খ্যাত বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনসংলগ্ন পানগুছি-বলেশ্বর নদ একসময় ছিল রুপালি ইলিশের অফুরন্ত ভাণ্ডার। আষাঢ়-শ্রাবণ এলেই বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ ও শরণখোলার বাজারগুলো জমে উঠত টাটকা ইলিশের বেচাকেনায়। জেলেদের নৌকা ভিড়ত মাছে পরিপূর্ণ হয়ে, আর ক্রেতারা হালি ধরে ইলিশ কিনে কলাপাতার রশিতে ঝুলিয়ে বাড়ি ফিরতেন। সেই চিরচেনা দৃশ্য এখন প্রায় হারিয়ে গেছে। সরবরাহ কমে যাওয়া, উচ্চমূল্য এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের কারণে পানগুছি-বলেশ্বরের ঐতিহ্যবাহী ইলিশ এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।স্বাদে-গন্ধে অনন্য পানগুছি বলেশ্বরের ইলিশ।

 

দক্ষিণাঞ্চলের নদ-নদীর মধ্যে পানগুছি-বলেশ্বরের ইলিশের রয়েছে আলাদা সুনাম। স্বাদ, গন্ধ, তেলের পরিমাণ এবং আকৃতিগত বৈশিষ্ট্যের কারণে এ ইলিশ বহু বছর ধরে ভোজনরসিকদের পছন্দের তালিকার শীর্ষে রয়েছে। পদ্মার ইলিশের মতোই পানগুছি-বলেশ্বরের ইলিশেরও রয়েছে ব্যাপক পরিচিতি ও চাহিদা।

 

স্থানীয়দের মতে, এই নদীর ইলিশের পেটি তুলনামূলক চওড়া এবং তেলের পরিমাণ বেশি হওয়ায় এর স্বাদ অন্য নদীর ইলিশের তুলনায় আলাদা। ফলে স্থানীয় বাজার ছাড়াও ঢাকা, খুলনা ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ক্রেতারা ছুটে আসেন শরণখোলা ও মোরেলগঞ্জের বাজারে। অনেকেই আত্মীয়-স্বজনের জন্যও কিনে পাঠান বরফবিহীন টাটকা ইলিশ।

শরণখোলার রায়েন্দা মাছ বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সবচেয়ে ছোট জাটকা ইলিশও বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকায়। মাঝারি ও বড় আকারের ইলিশের দাম তিন থেকে চার হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছে।

 

স্থানীয় গৃহিণী শাকিলা সুলতানা অথি বলেন,

“বাজারে ইলিশ খুব কম আসে। যা পাওয়া যায় তার দাম এত বেশি যে সাধারণ পরিবারের পক্ষে কেনা সম্ভব নয়।”

 

ওয়ার্কশপ ইঞ্জিনিয়ার মো. টিটু হাওলাদার বলেন,

“নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ সামলাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। কয়েক হাজার টাকা দিয়ে ইলিশ কেনা এখন স্বপ্নের মতো।”

 

রায়েন্দা বেড়িবাঁধ এলাকার জেলে মনির হোসেন জানান, কয়েক বছর আগেও বলেশ্বর নদে প্রচুর ইলিশ পাওয়া যেত। এখন জাল ফেলেও অনেক সময় খালি হাতে ফিরতে হয়।

 

“দু-একটা ছোট ইলিশ পাওয়া গেলেও বড় ইলিশ খুব কম ধরা পড়ে। নদীতে আগের মতো মাছ নেই।”

 

তবে গত কয়েক দিনে নদীতে বড় আকারের কিছু ইলিশ ধরা পড়তে শুরু করেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ৮০০ গ্রাম থেকে শুরু করে দেড় থেকে দুই কেজি ওজনের ইলিশও জেলেদের জালে উঠছে। এতে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরেছে জেলেদের মধ্যে।

 

দাম বাড়ার পেছনের কারণ

রায়েন্দা মাছ বাজারের ব্যবসায়ী বেল্লাল হোসেন বলেন,

“নদী ও সাগরে ইলিশের সরবরাহ কম থাকায় দাম বেড়েছে। জেলেদের কাছ থেকেই বড় ইলিশ তিন থেকে চার হাজার টাকায় কিনতে হচ্ছে।”

 

অন্যদিকে মাছ ব্যবসায়ী সোহাগ জানান,

“দাম বেশি হলেও ইলিশের প্রতি মানুষের আবেগ কমেনি। সামর্থ্যবান ক্রেতারা এখনও বেশি দাম দিয়েই ইলিশ কিনছেন। সরকারি চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ীরাই এখন বড় ক্রেতা।”

 

শরণখোলা উপজেলা মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি মো. আবুল হোসেনের মতে, অবৈধ চরঘেরা, বেন্দিজাল দিয়ে জাটকা নিধন, আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে অতিরিক্ত মাছ আহরণ এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইলিশের উৎপাদনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

 

তবে মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা পরিস্থিতিকে সাময়িক বলে মনে করছেন।

 

মোরেলগঞ্জ উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা বিনয় কুমার রায় বলেন,

“সাগর ও পানগুছি-বলেশ্বর নদে পর্যাপ্ত ইলিশ রয়েছে। ভাদ্র-আশ্বিনে মূল মৌসুম শুরু হলে সরবরাহ আরও বাড়বে। বর্তমানে মৌসুম শুরুর আগের সময় হওয়ায় মাছ কম ধরা পড়ছে এবং দাম কিছুটা বেশি।”

 

তিনি আরও বলেন,

“পানগুছি-বলেশ্বরের ইলিশের বৈশিষ্ট্য অন্য নদীর ইলিশের তুলনায় আলাদা। এতে তেলের পরিমাণ বেশি এবং পেটিও চওড়া। এ কারণেই এর চাহিদা ও বাজারমূল্য বেশি। পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হওয়ায় এখন ইলিশের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। সাগর থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ নদীতে প্রবেশ করছে।”

 

একসময় আষাঢ়-শ্রাবণে মোরেলগঞ্জ ও শরণখোলার বাজারে ইলিশ কিনতে মানুষের উপচে পড়া ভিড় দেখা যেত। হালি ধরে ইলিশ কেনা, কলাপাতার রশিতে ঝুলিয়ে বাড়ি ফেরা—এসব ছিল উপকূলীয় জনপদের পরিচিত দৃশ্য। এখন সেই দৃশ্য কেবল স্মৃতির পাতায়।

 

পানগুছি-বলেশ্বরের ইলিশ এখনও স্বাদ, ঐতিহ্য ও আবেগের প্রতীক। কিন্তু মূল্যবৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার কারণে এই রুপালি সম্পদ ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের খাবার টেবিল থেকে সরে গিয়ে বিলাসী খাদ্যের তালিকায় স্থান করে নিচ্ছে। ভরা মৌসুমে সরবরাহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দাম কিছুটা কমবে—এমন আশায় রয়েছেন ক্রেতারা। ততদিন পর্যন্ত পানগুছি-বলেশ্বরের বিখ্যাত ইলিশ অনেকের কাছেই থেকে যাবে অধরা স্বাদের নাম।

Spread the love

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

আর্কাইভ

July 2026
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031