ইউরোপে নজিরবিহীন দাবানল, বাড়ছে বীমার ব্যয়

প্রকাশিত: ৩:৪৩ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৪, ২০২৬

ইউরোপে নজিরবিহীন দাবানল, বাড়ছে বীমার ব্যয়

আন্তর্জাতিক ডেস্ক ::

 

ইউরোপের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানল মৌসুমে ক্ষয়ক্ষতির বড় অংশ বহন করতে প্রস্তুত দেশীয় বীমা কোম্পানিগুলো। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দাবানলের মতো দুর্যোগ আরও ঘন ঘন ও ভয়াবহ হয়ে উঠলে ভবিষ্যতে সেই ক্ষতির দায় কে নেবে তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

ফ্রান্সজুড়ে নজিরবিহীন দাবানলের কারণে এখন পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। একই সময়ে স্পেন ও গ্রিসেও ব্যাপক দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। এতে বীমার ব্যয় বৃদ্ধি এবং জলবায়ুজনিত ঝুঁকির বিপরীতে বীমা সুরক্ষার ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

 

ক্রেডিট রেটিং সংস্থা মর্নিংস্টার ডিবিআরএস-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ফ্রান্সে দাবানলের কারণে মোট অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ১০ থেকে ১৫ বিলিয়ন ইউরো (প্রায় ১১ দশমিক ৫ থেকে ১৭ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) হতে পারে। এর মধ্যে কয়েক বিলিয়ন ইউরোর ক্ষতি বীমা কোম্পানিগুলোকে বহন করতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান ক্ষয়ক্ষতি বীমা শিল্পের জন্য সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও ভবিষ্যতে দাবানল যদি বোর্দোর মতো মাঝারি আকারের শহরে পৌঁছে যায়, তাহলে ক্ষতির পরিমাণ সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রা পাবে।

 

মর্নিংস্টার ডিবিআরএসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মার্কোস আলভারেজ বলেন, “নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া কোনো দাবানল যদি বোর্দোর মতো একটি শহরে পৌঁছে যায়, তাহলে সেটি বীমা শিল্পের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।”

 

যদিও এই ক্ষতির পরিমাণ ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার প্যালিসেডস দাবানলে হওয়া প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার বীমা ক্ষতির তুলনায় অনেক কম, তবুও এটি ফ্রান্সের ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল দাবানলের ঘটনা হয়ে উঠতে পারে।

 

শুধু বাড়িঘর নয়, ব্যবসায়ও বড় ক্ষতি

বীমা কোম্পানিগুলো শুধু বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষয়ক্ষতির দাবিই নয়, গণউচ্ছেদের কারণে বাসিন্দাদের আবাসন ব্যয়, ব্যবসা বন্ধ থাকা, সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়া এবং বিদ্যুৎ বিভ্রাটজনিত ক্ষতির দাবিও পাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

 

বর্তমানে এসব ক্ষতির বেশিরভাগই বেসরকারি বীমা প্রতিষ্ঠান বহন করবে। কারণ, ফ্রান্সের রাষ্ট্র-সমর্থিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ ক্ষতিপূরণ কর্মসূচির আওতায় দাবানল অন্তর্ভুক্ত নয়।

 

রেটিং সংস্থা ফিচ রেটিংস জানিয়েছে, দাবানল যদি বড় আবাসিক, বাণিজ্যিক বা শিল্পাঞ্চলে ছড়িয়ে না পড়ে, তাহলে ২০২৬ সালে বীমা কোম্পানিগুলোর আয়ে এর প্রভাব সীমিত থাকবে।

 

বীমা কোম্পানির জরুরি সহায়তা

গত সপ্তাহে ফ্রান্সের বীমা কোম্পানিগুলো জরুরি ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, বোর্দোর আশপাশের দাবানলে যেসব গ্রাহককে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে, তাদের তিন সপ্তাহ পর্যন্ত হোটেলে থাকার খরচ বীমা প্রতিষ্ঠান বহন করবে।

 

এ সুবিধা পেয়েছেন বোর্দোর কাছে মার্শপ্রিম এলাকার বাসিন্দা ও ফার্মাসিস্ট নিকোলা মুলাক। ২৪ জুলাই দাবানল তার বাড়ির কাছে পৌঁছে গেলে তিনি সঙ্গীকে নিয়ে নিরাপদ স্থানে চলে যান। পরে আবাসন ও খাবারের খরচ ফেরতের জন্য আবেদন করে তিনি জানান, পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল “খুবই সহজ”।

 

ইউরোপে বাড়ছে ‘প্রোটেকশন গ্যাপ’

দাবানল ইউরোপে আবারও ‘প্রোটেকশন গ্যাপ’ বা দুর্যোগে মোট ক্ষতি এবং বীমা দ্বারা আচ্ছাদিত ক্ষতির ব্যবধানের বিষয়টি সামনে এনেছে।

 

বীমা প্রতিষ্ঠান মার্শের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে স্পেনে দাবানলে প্রায় ৫ বিলিয়ন ইউরোর ক্ষতি হলেও এর মধ্যে ১ বিলিয়ন ইউরোরও কম ক্ষতি বীমার আওতায় ছিল।

 

ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ইসিবি) এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থার তথ্য বলছে, ১৯৮০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ইউরোপে জলবায়ুজনিত দুর্যোগে হওয়া মোট ক্ষতির মাত্র এক-চতুর্থাংশ বীমার আওতায় ছিল। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ইউরোপে দাবানল-সংক্রান্ত বীমা ব্যবস্থাও অনেক কম উন্নত।

 

জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়ছে ঝুঁকি

স্পেনে বীমা ব্রোকার গ্যালাঘারের প্রধান নির্বাহী আনা মাতাররাঞ্জ বলেন, স্পেন অতীতেও বড় দাবানলের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। তবে এখন যেটি বদলাচ্ছে, তা হলো জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দাবানলের ঘনঘন সংঘটন এবং তীব্রতা।

 

বিশ্লেষক ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউরোপে অতীতের দাবানল-সংক্রান্ত তথ্য তুলনামূলক কম থাকায় ভবিষ্যতের ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং বীমার প্রিমিয়াম নির্ধারণ আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

 

বীমা বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আগামী জানুয়ারিতে নবায়নের সময় উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে গৃহবীমার প্রিমিয়াম বাড়তে পারে।

 

মিউনিখ রি-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী দাবানলে হওয়া ১৭৩ বিলিয়ন ইউরোর ক্ষতির প্রায় ৫ শতাংশই ঘটেছে ইউরোপে।

 

অন্যদিকে, এএক্সএ–র জলবায়ু ইউনিটের জুলাই মাসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে ফ্রান্সের শহরসংলগ্ন এলাকায় উচ্চ ঝুঁকির দাবানলের দিনের সংখ্যা গড়ে প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এখন এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, যা এতদিন মূলত যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বা অস্ট্রেলিয়ার দাবানলপ্রবণ অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচিত হতো। এতে ভবিষ্যতে বীমা খাত, সরকার এবং সাধারণ মানুষের ওপর আর্থিক চাপ আরও বাড়তে পারে।

Spread the love

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

আর্কাইভ

August 2026
M T W T F S S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31