বলেশ্বর নদী এখন মুমূর্ষু—কচুরিপানার স্তূপে থমকে গেছে কৃষি ও নৌযান চলাচল

প্রকাশিত: ৯:২০ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৬, ২০২৬

বলেশ্বর নদী এখন মুমূর্ষু—কচুরিপানার স্তূপে থমকে গেছে কৃষি ও নৌযান চলাচল

প্রতিনিধি / বাগেরহাট ::

 

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনঘেঁষা একসময়কার খরস্রোতা বলেশ্বর নদী এখন যেন মৃত্যুর প্রহর গুনছে। নদীর বুকজুড়ে জেগে উঠেছে চর, কোথাও কোথাও জমেছে কচুরিপানার বিশাল স্তূপ। বছরের পর বছর ধরে নদীটির এমন করুণ দশা চললেও কার্যকরভাবে খনন বা নাব্যতা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ না থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন নদীপাড়ের হাজার হাজার মানুষ। বিশেষ করে কৃষিনির্ভর পরিবারগুলো সেচ, কৃষিপণ্য পরিবহন ও নৌ-যোগাযোগ নিয়ে পড়েছেন বিপাকে।

 

স্থানীয়দের অভিযোগ, একসময় যে বলেশ্বর নদীতে লঞ্চ-স্টিমার চলত, সেই নদী এখন অনেক জায়গায় নাব্যতা হারিয়ে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। শুকনো মৌসুমে নদীতে পর্যাপ্ত পানি থাকে না। আবার বর্ষা মৌসুমে কচুরিপানার স্তূপে নদীর স্বাভাবিক পানি প্রবাহ ও নৌযান চলাচল ব্যাহত হয়। ফলে কৃষিকাজ থেকে শুরু করে স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

 

সরেজমিনে দেখা গেছে, বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার সীমান্তঘেঁষা বলেশ্বর নদীর অপর পাড়ে পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলা। নদীর দুই তীরের বিস্তীর্ণ জমিতে ধান, শাকসবজিসহ বিভিন্ন ধরনের ফসলের আবাদ হচ্ছে। এলাকার অধিকাংশ পরিবার কৃষিনির্ভর হওয়ায় সারা বছরই তারা কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত থাকেন।

 

স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যমতে, নদীর ওপর নির্ভরশীল প্রায় ১০ থেকে ১২টি গ্রামের কয়েক হাজার কৃষক। কৃষিকাজের জন্য প্রয়োজনীয় পানি, উৎপাদিত ফসল পরিবহন এবং বিভিন্ন প্রয়োজনে নৌপথ ব্যবহারে এই নদীই ছিল তাদের প্রধান ভরসা। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে নদীতে পলি জমে চর সৃষ্টি হওয়ায় পরিস্থিতি ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠেছে।

 

শুকনো মৌসুমে পানি নেই, বর্ষায় কচুরিপানার দখল

নদীতে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় শুকনো মৌসুমে সেচকাজে চরম সমস্যায় পড়তে হয় কৃষকদের। ফসল উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে নদীর পানি না পাওয়ায় বাড়তি খরচে বিকল্প উপায়ে সেচের ব্যবস্থা করতে হয় তাদের।

 

অন্যদিকে বর্ষা মৌসুমে নদীর বুকে কচুরিপানার বিশাল স্তূপ জমে থাকায় নৌযান চলাচল ব্যাহত হয়। কোথাও কোথাও কচুরিপানা এমনভাবে নদী ঢেকে রাখে যে, নৌকা চালানোও কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে কৃষকদের উৎপাদিত ফসল বাজারে নিতে বাড়তি সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।

 

স্থানীয়রা বলছেন, আগে নৌপথে অল্প খরচে কৃষিপণ্য বাজারে নেওয়া সম্ভব হলেও নদীর বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক ক্ষেত্রে সড়কপথের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে এবং কৃষকদের উৎপাদন খরচও বাড়ছে।

 

মাছ হারিয়ে বিপাকে জেলেরা

বলেশ্বর নদীর করুণ দশার প্রভাব শুধু কৃষিতেই সীমাবদ্ধ নয়। একসময় এই নদীতে মাছ ধরে শত শত পরিবার জীবিকা নির্বাহ করত। কিন্তু নদীতে চর পড়া, পানির স্বাভাবিক প্রবাহ কমে যাওয়া এবং কচুরিপানার আধিক্যের কারণে মাছের বিচরণ ও প্রজননের পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে স্থানীয় জেলেদের দাবি।

 

ফলে নদীনির্ভর জেলে পরিবারগুলোর আয়ও কমে গেছে। একদিকে কৃষক, অন্যদিকে জেলে—দুই শ্রেণির মানুষের জীবন-জীবিকাই এখন বলেশ্বরের নাব্যতা সংকটের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েছে।

 

‘শুধু শুনে আসছি, বলেশ্বর খনন হবে’

স্থানীয় কৃষক মুকুন্দ বাওয়ালী, আনন্দ বালা, অনিমেশ বাগচীসহ অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বছরের পর বছর ধরে তারা শুধু শুনে আসছেন—বলেশ্বর নদী খনন করা হবে। কিন্তু যুগের পর যুগ কেটে গেলেও নদীটি খননের কার্যকর উদ্যোগ তারা দেখেননি।

 

তাদের ভাষ্য, নদীটি খনন করা হলে কৃষিকাজে সেচ সুবিধা বাড়ার পাশাপাশি নৌ-যোগাযোগও স্বাভাবিক হবে। একই সঙ্গে কৃষিপণ্য সহজে ও কম খরচে বাজারজাত করা সম্ভব হবে। তাই দ্রুত বলেশ্বর নদী খননের দাবি জানান তারা।

 

একসময় লঞ্চ-স্টিমার চলত, এখন কচুরিপানায় বন্ধ নৌপথ

চিতলমারী উপজেলা কৃষক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক পঙ্কজ রায় বলেন, একসময় বলেশ্বর নদীতে লঞ্চ-স্টিমার চলত। নদীপথে দেশ-বিদেশের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ ছিল। এই নদী থেকে মাছ ধরে শত শত জেলে জীবিকা নির্বাহ করতেন।

 

তিনি বলেন, বর্তমানে নদীতে চর পড়ে গেছে। নদীর বিস্তীর্ণ অংশ কচুরিপানায় ঢেকে আছে। স্বাভাবিকভাবে জোয়ার-ভাটাও হচ্ছে না। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন নদীপাড়ের কৃষকরা। কৃষিকাজের পাশাপাশি নৌ-যোগাযোগ সচল রাখতে জরুরি ভিত্তিতে নদীটির নাব্যতা ফিরিয়ে আনার পদক্ষেপ প্রয়োজন।

 

কৃষির স্বার্থে নদী খননের প্রয়োজন

চিতলমারী উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মো. সিফাত-আল-মারুফ বলেন, কৃষিকাজের জন্য বলেশ্বর নদী খননের প্রয়োজন রয়েছে। এখানকার কৃষকরা নদীটির ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল।

 

তিনি বলেন, সেচ মৌসুমে নদীতে পর্যাপ্ত পানি থাকে না। আবার বর্ষাকালে পানি ঠিকমতো নিষ্কাশন না হওয়ায় কৃষকদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়। পাশাপাশি কৃষিপণ্য আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রেও নদীটি বর্তমানে অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

 

কচুরিপানা পরিষ্কারের উদ্যোগের কথা জানাল পানি উন্নয়ন বোর্ড

এ বিষয়ে বাগেরহাট জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জয়ন্ত পাল জানান, জেলায় বেশ কিছু খাল খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বলেশ্বর নদী খননের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জানানো হবে।

 

তিনি আরও জানান, নদীর কচুরিপানা পরিষ্কারের বিষয়টি যাতে দ্রুত করা যায়, সে ব্যাপারেও ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

 

দ্রুত পদক্ষেপ চান নদীপাড়ের মানুষ

স্থানীয়দের মতে, শুধু কচুরিপানা পরিষ্কার করলেই বলেশ্বরের দীর্ঘদিনের সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না। নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন পরিকল্পিত ও টেকসই খনন। একই সঙ্গে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, কচুরিপানা অপসারণ এবং নদীর স্বাভাবিক পানি প্রবাহ নিশ্চিত করাও জরুরি।

 

একসময়ের প্রাণবন্ত বলেশ্বর এখন যদি এভাবেই ভরাট হতে থাকে, তাহলে আগামী দিনে কৃষি, মৎস্য, নৌ-যোগাযোগ ও নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতি আরও বড় সংকটে পড়বে—এমন আশঙ্কা স্থানীয়দের।

 

তাই নদীপাড়ের মানুষের দাবি, প্রতিশ্রুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দ্রুত বলেশ্বর নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে খনন কার্যক্রম শুরু এবং কচুরিপানা অপসারণ করা হোক। একটি নদীকে বাঁচানো মানে শুধু একটি জলধারাকে বাঁচানো নয়; এর সঙ্গে বেঁচে থাকবে নদীপাড়ের কৃষক, জেলে, ব্যবসায়ী এবং হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকা।

Spread the love

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

আর্কাইভ

August 2026
M T W T F S S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31