সুন্দরবনের উপকূলের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা কাঁকড়া রপ্তানি ৮৪০ কোটি টাকা, বাড়ছে কর্মসংস্থান

প্রকাশিত: ৯:২৭ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৬, ২০২৬

সুন্দরবনের উপকূলের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা কাঁকড়া রপ্তানি ৮৪০ কোটি টাকা, বাড়ছে কর্মসংস্থান

প্রতিনিধি / বাগেরহাট ::

 

বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনঘেঁষা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে কাঁকড়া চাষ ও রপ্তানি। লবণাক্ত পানি, উপকূলীয় জলাভূমি এবং সুন্দরবনের আশপাশের পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হচ্ছে কাঁকড়া চাষ। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়ছে বাংলাদেশি কাঁকড়ার চাহিদা। ফলে একদিকে যেমন উপকূলের মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে, অন্যদিকে আসছে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা।

 

সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদন ও খাতসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে কাঁকড়া রপ্তানির পরিমাণ ও আয় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কাঁকড়া রপ্তানি নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ৮৪০ কোটি টাকার কাছাকাছি এবং আরও বেশি পরিমাণের হিসাব পাওয়া যায়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরের পণ্যভিত্তিক রপ্তানি তথ্য প্রকাশ করেছে।

 

সুন্দরবনঘেঁষা এলাকায় বদলে যাচ্ছে জীবিকার চিত্র

বাগেরহাট, খুলনাও সাতক্ষীরাসহ সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় অঞ্চলের বহু মানুষ আগে শুধু চিংড়ি চাষ, মাছ ধরা কিংবা বনজ সম্পদের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। এখন তাদের অনেকেই কাঁকড়া চাষ ও মোটাতাজাকরণে যুক্ত হচ্ছেন। বিশেষ করে বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ এলাকায় সফটশেল কাঁকড়ার চাষ স্থানীয় মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বাসসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে বাংলাদেশ থেকে ১,২০৭.৭৬ মেট্রিক টন সফটশেল কাঁকড়া রপ্তানি হয়েছে, যার বাজারমূল্য ছিল ১৬.৪৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

 

কাঁকড়া চাষের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—উপকূলীয় লবণাক্ত পানিতে এটি তুলনামূলক সহজে করা যায়। চিংড়ির তুলনায় রোগবালাই ও চাষঝুঁকি কম হওয়ায় অনেক উদ্যোক্তা এখন কাঁকড়ার দিকে ঝুঁকছেন। ফলে ছোট-বড় খামার গড়ে ওঠার পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে পরিবহন, বাছাই, প্যাকেজিং, শ্রমিক ও বিপণনকেন্দ্রিক নানা কর্মসংস্থান।

 

ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশি কাঁকড়া

বাংলাদেশের কাঁকড়ার অন্যতম বড় বাজার চীন, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, জাপান এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশ। বিভিন্ন খাতসংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশের কাঁকড়া রপ্তানির বড় অংশ এসব আন্তর্জাতিক বাজারে যাচ্ছে।

 

বিশেষ করে সফটশেল বা নরম খোলসের কাঁকড়ার চাহিদা আন্তর্জাতিক বাজারে দ্রুত বাড়ছে। খোলস পরিবর্তনের সময় কাঁকড়া নরম হয়ে যায়। সেই পর্যায়ে সংগ্রহ করে বিশেষ প্রক্রিয়ায় বাজারজাত করা হয় সফটশেল কাঁকড়া। আন্তর্জাতিক বাজারে এর মূল্যও তুলনামূলক বেশি।

 

কাঁকড়া চাষে নারীরাও যুক্ত হচ্ছেন

সুন্দরবনঘেঁষা উপকূলীয় জনপদে কাঁকড়া চাষ শুধু পুরুষের কর্মসংস্থানই সৃষ্টি করছে না; বাছাই, পরিষ্কার, প্যাকেজিং ও খামার ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন পর্যায়ে নারীরাও যুক্ত হচ্ছেন। সাতক্ষীরার শ্যামনগরে কাঁকড়া চাষকে ঘিরে শত শত পরিবারের স্বাবলম্বী হওয়ার চিত্র উঠে এসেছে বিভিন্ন প্রতিবেদনে।

 

ফলে কাঁকড়া এখন শুধু একটি জলজ প্রাণী নয়—উপকূলের অনেক পরিবারের কাছে এটি হয়ে উঠছে বিকল্প জীবিকা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার উৎস।

 

চিংড়ির বিকল্প হিসেবে সম্ভাবনাময়

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বাগেরহাটে অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে চিংড়ি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে রোগবালাই, ঘেরের পানি ও পরিবেশগত নানা সমস্যার কারণে চিংড়ি চাষে ঝুঁকি রয়েছে। সেই তুলনায় কাঁকড়া চাষে ঝুঁকি কম এবং তুলনামূলক অল্প সময়ে বাজারজাত করার সুযোগ রয়েছে।

 

এ কারণে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পরিকল্পিতভাবে কাঁকড়া চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে চিংড়ির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি উপকূলীয় অর্থনীতিতে নতুন একটি শক্তিশালী খাত গড়ে তোলা সম্ভব।

 

দুই ধরনের কাঁকড়া চাষ

বাংলাদেশে মূলত দুই ধরনের পদ্ধতিতে কাঁকড়া উৎপাদন করা হয়—ফ্যাটেনিং বা মোটাতাজাকরণ এবং সফটশেল কাঁকড়া উৎপাদন।

 

মোটাতাজাকরণ পদ্ধতিতে ছোট বা কিশোর কাঁকড়া ঘের বা নির্দিষ্ট জলাশয়ে রেখে খাবার দিয়ে বড় করা হয়। নির্দিষ্ট আকার ও ওজন হলে সেগুলো বাজারজাত বা রপ্তানি করা হয়।

 

অন্যদিকে সফটশেল কাঁকড়া উৎপাদনে কাঁকড়ার খোলস পরিবর্তনের সময়কে কাজে লাগানো হয়। কাঙ্ক্ষিত ওজনের কাঁকড়াকে বিশেষ বাক্স বা ব্যবস্থাপনায় রেখে খোলস ছাড়ার পরপরই সংগ্রহ করা হয়। নরম খোলসের এই কাঁকড়াই আন্তর্জাতিক বাজারে বিশেষ চাহিদা তৈরি করেছে।

 

সুন্দরবনের ওপর চাপ না বাড়িয়ে চাষ সম্প্রসারণ জরুরি

কাঁকড়া রপ্তানির এই সম্ভাবনা নিঃসন্দেহে উপকূলীয় অর্থনীতির জন্য আশাব্যঞ্জক। তবে এর সঙ্গে পরিবেশ ও সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

 

প্রাকৃতিক উৎস থেকে অতিরিক্ত কিশোর কাঁকড়া আহরণ, নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার এবং সুন্দরবনের খাল-বিল থেকে নির্বিচারে কাঁকড়া সংগ্রহ করলে ভবিষ্যতে প্রাকৃতিক কাঁকড়ার মজুত কমে যেতে পারে। তাই সুন্দরবন থেকে কাঁকড়া আহরণের পরিবর্তে হ্যাচারিতে উৎপাদিত কাঁকড়ার পোনা ব্যবহার বাড়ানো এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে খামার পরিচালনা করা প্রয়োজন।

 

সরকারের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন

সংশ্লিষ্টদের মতে, কাঁকড়া খাতকে একটি পূর্ণাঙ্গ রপ্তানিমুখী শিল্পে পরিণত করতে হলে সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ দরকার। কাঁকড়া চাষিদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ, উন্নতমানের পোনা সরবরাহ, আধুনিক হ্যাচারি স্থাপন, রোগ ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণ ও পরিবহন সুবিধা এবং আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

 

একই সঙ্গে কাঁকড়া রপ্তানির ক্ষেত্রে মাননিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক খাদ্যনিরাপত্তা মান নিশ্চিত করতে হবে। এতে বাংলাদেশি কাঁকড়ার প্রতি বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা আরও বাড়বে।

 

সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত

বাগেরহাটে সুন্দরবনঘেঁষা উপকূলীয় জনপদে যেখানে জলবায়ু পরিবর্তন, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা ও কর্মসংস্থানের সংকট মানুষের জীবনকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে, সেখানে কাঁকড়া চাষ হতে পারে একটি সম্ভাবনাময় বিকল্প অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।

 

বিশ্ববাজারে কাঁকড়ার চাহিদা রয়েছে, দেশের উপকূলে চাষের উপযোগী পরিবেশ রয়েছে এবং স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতাও দিন দিন বাড়ছে। এখন প্রয়োজন শুধু সঠিক পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তি, পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনা ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা।

 

সুন্দরবনের বাগেরহাটে জীববৈচিত্র্য অক্ষুণ্ন রেখে যদি উপকূলীয় পতিত ও লবণাক্ত জমিতে পরিকল্পিতভাবে কাঁকড়া চাষ সম্প্রসারণ করা যায়, তাহলে এটি শুধু বেকারত্ব নিরসন নয়—বাংলাদেশের রপ্তানি আয় বৃদ্ধিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হয়ে উঠতে পারে। সুন্দরবনের উপকূল থেকে বিশ্ববাজারে কাঁকড়ার এই যাত্রা তাই হয়ে উঠতে পারে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও উপকূলীয় মানুষের জীবনমান উন্নয়নের নতুন গল্প।

Spread the love

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

আর্কাইভ

August 2026
M T W T F S S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31