সিলেট ২৪শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৯ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৯:৩৮ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৪, ২০২৬
প্রতিনিধি / বাগেরহাট ::
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের উপকূলঘেঁষা বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে সড়কের পাশে ফেলে যাওয়া সেই দুই বছরের শিশু অবশেষে ফিরে পেল বাবার আশ্রয়। মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর দাদির কাছেও আশ্রয় না পাওয়া শিশুটির দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত গ্রহণ করেছেন তার বাবা মো. পলাশ।
একটি ছোট্ট শিশুর জীবনে গত কয়েকটি দিন যেন ছিল চরম অনিশ্চয়তা, অসহায়ত্ব আর নিরাপত্তাহীনতার। যে বয়সে বাবা-মায়ের আদর, মমতা ও নিরাপদ আশ্রয়ে বেড়ে ওঠার কথা, সেই বয়সেই তাকে পড়তে হয়েছিল পথের ধারে। তবে স্থানীয়দের সহায়তা ও প্রশাসনের মানবিক উদ্যোগে শেষ পর্যন্ত শিশুটির জন্য ফিরে এসেছে কিছুটা স্বস্তির ঠিকানা।
সোমবার (২৪ আগস্ট) দুপুরে মোরেলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শিশুটিকে তার বাবা মো. পলাশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ সময় শিশুটির ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও কল্যাণের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বাবার কাছ থেকে শর্তসাপেক্ষে মুচলেকা নেওয়া হয়। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হাবিবুল্লাহ শিশুটিকে তার বাবার কোলে তুলে দেন।
এ সময় স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. আবুল খায়েরসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
সড়কের পাশে কাঁদছিল শিশুটি এর আগে গত শুক্রবার (২১ আগস্ট) সন্ধ্যা ৬টার দিকে উপজেলার ১৪ নম্বর বারইখালী ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের স্থানীয় জেলে পাড়ার একটি ইটভাটার সামনের সড়ক থেকে শিশুটিকে কাঁদতে থাকা অবস্থায় উদ্ধার করেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শিশুটির বাবা মো. পলাশ ও মা মোসা. মিতু আক্তারের মধ্যে প্রায় তিন মাস আগে বিবাহবিচ্ছেদ হয়। এরপর শিশুটির দেখভাল নিয়ে তৈরি হয় অনিশ্চয়তা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শুক্রবার শিশুটির মা তাকে সড়কের পাশে রেখে ঢাকার উদ্দেশ্যে চলে যান। দীর্ঘ সময় ধরে শিশুটিকে একা কাঁদতে দেখে স্থানীয়রা এগিয়ে আসেন। পরে শিশুটিকে তার দাদির কাছে নিয়ে যাওয়া হলেও তিনিও শিশুটির দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে শিশুটিকে নিয়ে তৈরি হয় আরও বড় অনিশ্চয়তা।
অসহায় শিশুর পাশে দাঁড়ালেন ইউএনও
পরিস্থিতির কথা জানতে পেরে স্থানীয়রা শিশুটিকে নিয়ে যান মোরেলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হাবিবুল্লাহর বাসভবনে।
সেখানে শিশুটির অসহায় অবস্থা দেখে বিষয়টি মানবিকভাবে বিবেচনা করে তাৎক্ষণিকভাবে শিশুটির দায়িত্ব নেন ইউএনও। নিজের কোলে তুলে নেন মাত্র দুই বছরের শিশুটিকে। শিশুটির জন্য প্রয়োজনীয় পোশাক, খাবার ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেন তিনি।
প্রশাসনের একজন কর্মকর্তার এমন তাৎক্ষণিক মানবিক উদ্যোগ স্থানীয়দের মধ্যেও ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। সংকটময় মুহূর্তে সরকারি দায়িত্বের পাশাপাশি মানবিকতার যে দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছেন, তা স্থানীয়দের নজর কেড়েছে।
বাবাকে ডেকে নেওয়া হয় উপজেলা প্রশাসনে
শিশুটির বাবার সন্ধান পাওয়ার পর মো. পলাশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি তখন মোরেলগঞ্জের বাইরে অবস্থান করছেন বলে জানান। পরে শিশুটির সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তাকে জরুরি ভিত্তিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
সোমবার নির্ধারিত সময়ে শিশুটির বাবা ইউএনওর কার্যালয়ে উপস্থিত হন। এ সময় প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিশুটির ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা, সুরক্ষা, ভরণ-পোষণ এবং যথাযথ দায়িত্ব পালনের বিষয়ে তাকে সতর্ক করা হয়।
শিশুটির দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়ে বাবার কাছ থেকে শর্তসাপেক্ষে মুচলেকা নেওয়া হয়। পাশাপাশি শিশুটির সার্বিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা করা হয়।
প্রতি সপ্তাহে ইউএনও কার্যালয়ে শিশুটিকে নিয়ে আসতে হবে
মুচলেকার শর্ত অনুযায়ী, শিশুটিকে প্রতি সপ্তাহে একবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে নিয়ে আসতে হবে। সেখানে শিশুটির শারীরিক অবস্থা, নিরাপত্তা, যত্ন ও সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রশাসনকে অবহিত করতে হবে।
এসব শর্তে সম্মতি ও মুচলেকা গ্রহণের পর আনুষ্ঠানিকভাবে শিশুটিকে তার বাবা মো. পলাশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
শিশুটিকে বাবার হাতে তুলে দেওয়ার সময় ইউএনও মো. হাবিবুল্লাহ শিশুটির নিরাপত্তা, ভরণ-পোষণ, চিকিৎসা, পরিচর্যা ও ভবিষ্যৎ দেখভালের বিষয়ে বাবাকে বিশেষভাবে সতর্ক করেন। একই সঙ্গে শিশুটির প্রতি কোনো ধরনের অবহেলা না করার জন্যও তাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়।
কয়েক দিনের ঘটনায় নাড়া দিয়েছে স্থানীয়দের
মাত্র দুই বছরের একটি শিশুকে ঘিরে গত কয়েক দিনের ঘটনাটি নাড়া দিয়েছে মোরেলগঞ্জের স্থানীয় মানুষকে। শিশুটি তখনও বুঝে উঠতে শেখেনি পরিবার কী, বিচ্ছেদ কী কিংবা অনিশ্চয়তা কী। অথচ পারিবারিক টানাপোড়েনের কঠিন বাস্তবতায় তাকেই পড়তে হয়েছে নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে।
একদিকে মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্নতা, অন্যদিকে দাদির কাছ থেকেও আশ্রয় না পাওয়া—সব মিলিয়ে শিশুটির ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছিল গভীর উদ্বেগ।
তবে স্থানীয়দের মানবিকতা ও উপজেলা প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপে শেষ পর্যন্ত শিশুটির জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা হয়েছে। বাবার কাছে ফিরে যাওয়ার মধ্য দিয়ে শিশুটির জীবনে অন্তত আপাতত কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে।
শিশুটির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রত্যাশা
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, শিশুটির বাবা মো. পলাশ এখন থেকে নিজের সন্তানের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবেন। শিশুটিকে নিরাপদ পরিবেশে বড় করে তুলবেন এবং তার শিক্ষা, চিকিৎসা, খাবার, পোশাক ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করবেন।
একই সঙ্গে প্রশাসনের পক্ষ থেকে যে নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা করা হয়েছে, সেটিও অব্যাহত থাকবে—এমন প্রত্যাশা জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
তাদের মতে, পারিবারিক কোনো সংকট বা দাম্পত্য কলহের দায় কখনোই একটি নিষ্পাপ শিশুর ওপর চাপানো উচিত নয়। একটি শিশুর নিরাপদ আশ্রয়, স্নেহ ও পরিচর্যা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। সেই অধিকার নিশ্চিত করাই পরিবার, সমাজ ও প্রশাসনের সম্মিলিত দায়িত্ব।
মানবিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ইউএনওর
অসহায় শিশুটির পাশে দাঁড়িয়ে তাৎক্ষণিকভাবে খাবার, পোশাক ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করায় মোরেলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হাবিবুল্লাহর মানবিক ভূমিকার প্রশংসা করেছেন স্থানীয়রা।
তাদের ভাষ্য, প্রশাসনের দায়িত্ব শুধু আইন প্রয়োগ বা সরকারি কার্যক্রম পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সংকটের মুহূর্তে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোও প্রশাসনের মানবিক দায়িত্বের অংশ। সেই জায়গা থেকে ইউএনওর তাৎক্ষণিক উদ্যোগ শিশুটির জীবনকে নিরাপদ পথে ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
একটি শিশুর কান্না থেকে শুরু হওয়া এই ঘটনা শেষ পর্যন্ত বাবার কোলে ফিরে যাওয়ার মধ্য দিয়ে আপাতত একটি মানবিক পরিণতি পেয়েছে। এখন সবার প্রত্যাশা—এই ছোট্ট শিশুটির জীবনে যেন আর কোনো অনিশ্চয়তা নেমে না আসে, সে যেন ভালোবাসা, নিরাপত্তা ও যত্নের পরিবেশে বেড়ে উঠতে পারে।
শিশুটির মুখের হাসিই হোক এই ঘটনার সবচেয়ে সুন্দর পরিণতি—এমন প্রত্যাশা মোরেলগঞ্জবাসীর।