অভিযোগ, তদন্ত ও ফলাফল–ঢাবির যৌন নিপীড়ন সেল কতটা কার্যকর?

প্রকাশিত: ৬:৪৫ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২, ২০২৬

অভিযোগ, তদন্ত ও ফলাফল–ঢাবির যৌন নিপীড়ন সেল কতটা কার্যকর?

লন্ডন বাংলা ডেস্ক ::

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ক্যাম্পাসে যৌন নিপীড়নের ঘটনা নীরবে ঘটে প্রতিদিনই–কখনো প্রকাশ্যে, কখনো আড়ালে। কেউ সাহস করে আওয়াজ তোলেন, কেউ ভয়, লজ্জা কিংবা অনিশ্চয়তার ভারে নীরব থাকেন। আর যারা অভিযোগ করেন, তাদের জন্য শুরু হয় আরেকটি কঠিন বাস্তবতা।অভিযোগ গ্রহণ থেকে শুরু করে তদন্ত ও ফলাফল পর্যন্ত দীর্ঘ এক অপেক্ষা। এই প্রক্রিয়ায় কতজন ভুক্তভোগী আদৌ ন্যায়বিচার পান, আর যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন নিপীড়ন সেল কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে সে বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন শিক্ষার্থীরা।

 

গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে যৌন নিপীড়ন সংক্রান্ত তদন্ত কমিটি ইঞ্জিনিয়ারিং ও টেকনোলজি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. উপমা কবিরকে আহ্বায়ক করে পুনর্গঠন করা হয়েছে। তবে শিক্ষার্থীদের দাবি কমিটি পুনর্গঠন করা হলেও তা নিষ্ক্রিয়ই রয়ে গেছে, দৃশ্যমান কোনো কাজ তারা দেখাতে ব্যর্থ।

 

 

শামসুন্নাহার হলের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের আবাসিক শিক্ষার্থী ইসরাত জাহান ইমুর মতে, ‘যৌন নিপীড়নবিরোধী সেলটি দীর্ঘদিন হয়ে গেলেও কার্যকর হয়নি।’ তিনি জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীরা এই সেলকে কার্যকর করার জন্য কয়েকবার প্রক্টর, ভিসি এবং প্রো-ভিসির সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। কিন্তু যৌন নিপীড়নবিরোধী সেল পুনর্গঠন করে এটাকে কার্যকর করার কোনো ধরনের উদ্যোগ তারা নেয়নি।

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. এরশাদ হালিমের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নে সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছিল। অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় এরশাদ হালিমকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছিল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

 

 

অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পরও সাময়িক বরখাস্তের বিষয়টি নিয়ে নানা সমালোচনার সৃষ্টি হয়। শিক্ষার্থীরা তার স্থায়ী বহিষ্কারের দাবি তুলেছিল। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) মুন্সী শামস উদ্দিন আহম্মদ আমাদের সময়কে বলেন, ‘রসায়ন বিভাগের ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রেক্ষিতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তদন্ত কমিটি ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং প্রক্রিয়া অনুসরণ করে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করবে এবং বিশ্লেষণ করবে। এরপর তারা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ পেশ করবে। তার প্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’

 

 

‘যৌন নিপীড়ন মোকাবিলায় ঢাবি প্রশাসনের অভিনব উদ্যোগ’

যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রতিটি অনুষদ, হল ও অফিসে অভিযোগ গ্রহণের জন্য অভিযোগ বক্স স্থাপন করেছে এবং গোপনীয়তা নিশ্চিত করতে সিল্ড খামে অভিযোগ জমা দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পাশাপাশি অভিযোগ গ্রহণের জন্য দুটি পৃথক ই-মেইল ঠিকানা চালু করা হয়েছে, যেগুলোর অ্যাক্সেস থাকবে শুধু সংশ্লিষ্ট সেলের সদস্যদের কাছে। এ ছাড়া স্টুডেন্ট অ্যাডভাইজারদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং নবীন শিক্ষার্থীদের ওরিয়েন্টেশনে যৌন নিপীড়ন সেল ও অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবহিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

 

 

তদন্ত কমিটি পুনর্গঠন করার পর কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে আমাদের সময়কে জানান কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. উপমা কবির। তিনি জানান, তারা একাধিক অভিযোগ পেয়েছেন। এর মধ্যে আগের সময়ের দু–তিনটি অভিযোগ রয়েছে, যেগুলো তখন নিষ্পত্তিহীন অবস্থায় ছিল। পাশাপাশি বিভিন্ন বিভাগে অভিযোগ বক্স স্থাপনের পর নতুন করে ছয় থেকে সাতটি অভিযোগ জমা পড়েছে বলেও তিনি জানান।

 

 

তিনি আরও জানান, এর মধ্যে তিন থেকে চারটি ঘটনায় প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানো গেছে এবং আশা করা যাচ্ছে সেগুলোর একটি ইতিবাচক ফলাফল আসবে। তদন্ত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আমরা অন্তত পাঁচ থেকে ছয়টি পৃথক ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছি।

 

 

‘যৌন নিপীড়ন মোকাবিলায় সিন্ডিকেটের নির্দেশনায় বিস্তৃত নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে: উপ–উপাচার্য’

সিন্ডিকেটে যৌন নিপীড়ন বিষয়ক কোনো মামলা এলে কীভাবে তা মোকাবিলা করা হবে এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কী হবে এ বিষয়ে স্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের ওপর জোর দেন উপ–উপাচার্য (প্রশাসন) সায়মা হক বিদিশা। তিনি বলেন, ‘যৌন নিপীড়ন ও বুলিংয়ের সংজ্ঞা, কোন ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ জানাতে পারবেন, সম্ভাব্য শাস্তির ধরন, প্রযোজ্য আইন এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্ব এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে একটি সমন্বিত ও বিস্তৃত গাইডলাইন তৈরির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে সংশ্লিষ্টরা এসব নীতিমালা প্রণয়নের কাজ করছেন। নীতিমালাগুলো চূড়ান্ত হলে সেগুলোর আলোকে কার্যক্রম পরিচালনা করা আরও সহজ হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘পুরো প্রক্রিয়াটিই বর্তমানে চলমান রয়েছে।’

 

 

‘অভিযোগ পরিচালনায় স্বচ্ছতাও দীর্ঘসূত্রিতা’

বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন অনুষদ থাকার কারণে অভিযোগগুলোকে কার্যকরভাবে পরিচালনা করা একটি জটিল প্রক্রিয়া বলে জানান উপ–উপাচার্য (প্রশাসন) সায়মা হক বিদিশা।

তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের নানা চাহিদা এবং অভিযোগ আসে, যেগুলো অনেক সময় সংবেদনশীল এবং সময়সাপেক্ষ। এগুলো সহজভাবে একবারে সমাধান করা যায় না। কেউ হয়তো প্রথম সাক্ষাৎকারে পুরো বিষয়টি প্রকাশ করেন না, তিন-চারবার সাক্ষাৎ করে বিস্তারিত জানাতে হয়। এ কারণে আমরা দীর্ঘসূত্রিতা বজায় রেখে ধাপে ধাপে প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করছি এবং সর্বদা চেষ্টা করছি যাতে পুরো প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ থাকে।’

Spread the love

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

আর্কাইভ

October 2026
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031