যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির ১৪ দফা প্রকাশ, কী আছে চুক্তিতে

প্রকাশিত: ২:১০ অপরাহ্ণ, জুন ১৮, ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির ১৪ দফা প্রকাশ, কী আছে চুক্তিতে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক :: 

 

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার প্রস্তাবিত স্থায়ী শান্তি চুক্তির প্রথম ধাপ হিসেবে ইসলামাবাদ মেমোর‌্যান্ডম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং (ইসলামাবাদ এমওইউ) স্বাক্ষর করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

জানা গেছে, ফ্রান্সের এভিয়ান-লে-বাঁ-এ অনুষ্ঠিত জি৭ সম্মেলনে অংশ নেওয়ার সময় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তিটিতে স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তির ফলে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে।

 

১৪ দফার এই চুক্তিকে মূলত সমঝোতা স্মারক বা এমওইউ বলা হচ্ছে। এতে বলা হয়েছে যে ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করবে না।

এ ছাড়া দেশটির ‘পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের’ জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল গঠনের প্রতিশ্রুতিও রয়েছে, যদিও এতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়ন বাধ্যতামূলক নয়।

 

যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং ইসরায়েলের মধ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার চার মাস পর এই চুক্তি হলো।

 

প্রকাশ করা নথিতে ১৪টি দফা আছে। সেগুলো হলো-

১. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান এবং চলমান যুদ্ধে তাদের মিত্ররা, এই সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) স্বাক্ষরের মাধ্যমে ঘোষণা করছে যে, সব ফ্রন্টে, যার মধ্যে লেবাননও অন্তর্ভুক্ত, সামরিক অভিযান অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হবে। তারা এখন থেকে একে অপরের বিরুদ্ধে কোনো যুদ্ধ বা সামরিক অভিযান শুরু না করার অঙ্গীকার করছে এবং একে অপরের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ বা শক্তি প্রয়োগের হুমকি দেওয়া থেকে বিরত থাকবে। একই সঙ্গে লেবাননের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা হবে। চূড়ান্ত চুক্তিতে সব ফ্রন্টে, যার মধ্যে লেবাননও অন্তর্ভুক্ত, যুদ্ধের স্থায়ী সমাপ্তি এবং এই অনুচ্ছেদের অন্যান্য বিধান নিশ্চিত করা হবে।

 

২. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে সম্মান করার এবং একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার অঙ্গীকার করছে।

 

৩. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে আলোচনা ও তা সম্পন্ন করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। উভয় পক্ষের সম্মতিতে এই সময়সীমা বাড়ানো যেতে পারে।

 

৪. এই সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত নৌ অবরোধ এবং যেকোনো ধরনের বিঘ্ন বা প্রতিবন্ধকতা অপসারণ শুরু করবে এবং ৩০ দিনের মধ্যে সম্পূর্ণভাবে নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করবে। এই সময়ের মধ্যে জাহাজ চলাচল যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের সংখ্যার অনুপাতে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের মাধ্যমে পুনরুদ্ধার করা হবে। এছাড়া চূড়ান্ত চুক্তির ৩০ দিনের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের নিকটবর্তী এলাকা থেকে নিজেদের বাহিনী সরিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার করছে।

 

৫. এই সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের পর ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান নিজেদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টার মাধ্যমে ৬০ দিনের জন্য কেবল বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করবে এবং এ জন্য কোনো ফি নেবে না। এই চলাচল পারস্য উপসাগর থেকে ওমান সাগর পর্যন্ত এবং উল্টো দিকেও প্রযোজ্য হবে। বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল অবিলম্বে শুরু হবে এবং প্রযুক্তিগত ও সামরিক প্রতিবন্ধকতা অপসারণ এবং ইরানের মাধ্যমে মাইন অপসারণের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে ৩০ দিনের মধ্যে তা পূর্ণমাত্রায় চালু করা হবে। ইরান হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ প্রশাসন ও সামুদ্রিক সেবা কাঠামো নির্ধারণে ওমান সালতানাতের সঙ্গে আলোচনা করবে এবং এ বিষয়ে পারস্য উপসাগরীয় উপকূলবর্তী অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে পরামর্শ করবে। এই আলোচনা আন্তর্জাতিক আইনের প্রযোজ্য বিধান এবং হরমুজ প্রণালির উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌম অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।

 

৬. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় করে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কমপক্ষে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি চূড়ান্ত ও পারস্পরিকভাবে সম্মত পরিকল্পনা প্রণয়নের অঙ্গীকার করছে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে নির্ধারণ করা হবে। সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেন বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সব লাইসেন্স, ছাড়পত্র এবং অনুমোদন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রদান করবে।

 

৭. যুক্তরাষ্ট্র অঙ্গীকার করছে, চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে একটি পারস্পরিকভাবে সম্মত সময়সূচি অনুযায়ী ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা বাতিল করা হবে। এর মধ্যে থাকবে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবসমূহ, আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) বোর্ড অব গভর্নরসের প্রস্তাবসমূহ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সব একতরফা নিষেধাজ্ঞা, তা প্রাথমিক হোক বা গৌণ। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র স্বীকার করছে যে, উপরে উল্লেখিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তারা পারস্পরিক সমঝোতায় পৌঁছানোর লক্ষ্যে আলোচনায় অবিলম্বে এসব বিষয় নিষ্পত্তির ইচ্ছা প্রকাশ করছে।

 

৮. ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান পুনরায় নিশ্চিত করছে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র সংগ্রহ বা উন্নয়ন করবে না। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান সম্মত হয়েছে, জমাকৃত সমৃদ্ধ পারমাণবিক উপাদানের ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা এমন একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে, যা উভয় পক্ষ পারস্পরিকভাবে সম্মত হবে এবং যা সপ্তম অনুচ্ছেদে উল্লেখিত সময়সূচির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। এই প্রক্রিয়ার ন্যূনতম পদ্ধতি হবে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তত্ত্বাবধানে সংশ্লিষ্ট স্থানে উপাদানের সমৃদ্ধ অবস্থান হ্রাস করা।

 

দুই পক্ষ আরও সম্মত হয়েছে, ইরানের পারমাণবিক প্রয়োজনের সঙ্গে সম্পর্কিত সমৃদ্ধকরণ এবং পারস্পরিকভাবে সম্মত অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হবে, যা চূড়ান্ত চুক্তিতে একটি সন্তোষজনক কাঠামোর ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে। চূড়ান্ত চুক্তিতে এই অনুচ্ছেদের বিধানগুলো নিশ্চিত করা হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান স্বীকার করছে যে, উপরে উল্লেখিত পারমাণবিক বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তারা পারস্পরিক সমঝোতায় পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে আলোচনায় অবিলম্বে এসব বিষয় নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করছে।

 

৯. চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান বর্তমান অবস্থা বজায় রাখতে সম্মত হয়েছে। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান তাদের বর্তমান পারমাণবিক কর্মসূচির অবস্থা অপরিবর্তিত রাখবে এবং যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে না এবং অঞ্চলে অতিরিক্ত কোনো সামরিক শক্তি মোতায়েন করবে না।

 

১০. যুক্তরাষ্ট্র অঙ্গীকার করছে যে এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গে এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় ইরানের অপরিশোধিত তেল, পেট্রোলিয়াম পণ্য ও সংশ্লিষ্ট উপপণ্য রপ্তানির জন্য ছাড়পত্র দেবে। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব ধরনের সেবাও অন্তর্ভুক্ত থাকবে, যেমন ব্যাংকিং লেনদেন, বীমা, পরিবহন ইত্যাদি।

 

১১. যুক্তরাষ্ট্র অঙ্গীকার করছে যে এই সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়নের সঙ্গে সঙ্গে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের স্থগিত বা সীমাবদ্ধ তহবিল ও সম্পদ সম্পূর্ণ ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান আলোচনার মাধ্যমে এই তহবিল অবমুক্ত করার প্রক্রিয়া নিয়ে পারস্পরিকভাবে একমত হবে। এসব তহবিল মূল হিসাবেই থাকুক বা স্থানান্তরিত হোক, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে চূড়ান্ত সুবিধাভোগীকে মনোনীত করবে, তাকে অর্থ প্রদানের জন্য তা সম্পূর্ণ ব্যবহারযোগ্য করা হবে। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সব লাইসেন্স ও অনুমোদন দেওয়ার অঙ্গীকার করছে যুক্তরাষ্ট্র।

 

১২. যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান সম্মত হয়েছে যে এই সমঝোতা স্মারকের সফল বাস্তবায়ন এবং ভবিষ্যৎ চূড়ান্ত চুক্তির প্রতিপালন পর্যবেক্ষণের জন্য একটি নির্বাহী প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠা করা হবে।

 

১৩. এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর এবং এই সমঝোতা স্মারকের ১,৪, ৫, ১০ ও ১১ নম্বর অনুচ্ছেদের বাস্তবায়ন শুরু হওয়া সাপেক্ষে এবং এসব ব্যবস্থার ধারাবাহিক বাস্তবায়ন অব্যাহত থাকলে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান কেবলমাত্র অন্যান্য অনুচ্ছেগুলো নিয়ে চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনায় প্রবেশ করবে।

 

১৪. চূড়ান্ত চুক্তিটি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের (ইউএনএসসি) একটি বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদিত হবে। জানা গেছে, চূড়ান্ত চুক্তিটিতে নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, চীন ও রাশিয়া প্রত্যেকেরই ভেটো ক্ষমতা রয়েছে। ফলে চুক্তিটি শুধু দ্বিপক্ষীয় সমঝোতায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও আইনি ভিত্তি লাভ করবে।

 

এ ধরনের ব্যবস্থা ভবিষ্যতে চুক্তির স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কারণ পরবর্তী কোনো মার্কিন প্রশাসন বা ইরানের নতুন সরকার চাইলে সহজে এ চুক্তি থেকে সরে আসতে পারবে না। চুক্তি লঙ্ঘন বা তা থেকে সরে দাঁড়ানোর বিষয়টি তখন শুধু দুই দেশের সমস্যা হিসেবে দেখা হবে না; বরং তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠবে।

Spread the love

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

আর্কাইভ

June 2026
M T W T F S S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930