সিলেট ২৫শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১০ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৫:০৬ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৪, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক ::
পণ্য উৎপাদনে ‘জোরপূর্বক শ্রম’ বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থতার অভিযোগে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৬০টি বাণিজ্য অংশীদার দেশের ওপর নতুন আমদানি শুল্ক আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পণ্যের ওপর ১০ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্ক কার্যকর হবে।
শুক্রবার থেকে নতুন শুল্কহার কার্যকর হয়েছে। তবে কার্যকর হওয়ার আগে যেসব পণ্য ইতোমধ্যে পরিবহনের পথে ছিল, সেগুলো ২৮ জুলাই পর্যন্ত নতুন শুল্কের আওতার বাইরে থাকবে।
মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির (ইউএসটিআর) দপ্তর জানিয়েছে, যেসব দেশ জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করেছে, এ বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে অথবা আংশিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, তাদের পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।
এই তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, যুক্তরাজ্য, কানাডা, মেক্সিকো, আর্জেন্টিনা, কম্বোডিয়া, গুয়াতেমালা, এল সালভাদর, হন্ডুরাস, ইকুয়েডর, জর্ডান, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া এবং ত্রিনিদাদ ও টোবাগোসহ ১৭টি দেশ।
অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও সুইজারল্যান্ডের মতো ‘মোস্ট ফেভার্ড নেশন’ (এমএফএন) মর্যাদাপ্রাপ্ত দেশগুলোর ক্ষেত্রে বিদ্যমান বাণিজ্য সুবিধার সঙ্গে সমন্বয় করে মোট ১০ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে।
এছাড়া জোরপূর্বক শ্রম প্রতিরোধে পর্যাপ্ত আইনি কাঠামো গড়ে তুলতে ব্যর্থ বলে বিবেচিত তদন্তাধীন বাকি ৩৮টি দেশের পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এ তালিকায় রয়েছে চীন ও ভিয়েতনামসহ আরও বেশ কয়েকটি দেশ।
মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার এক বিবৃতিতে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রায় এক শতাব্দী ধরে জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করে আসছে এবং কঠোরভাবে সেই আইন প্রয়োগ করছে। এখন সময় এসেছে, বাণিজ্য অংশীদার দেশগুলোকেও একই ধরনের মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে।
তার ভাষায়, নতুন এই নীতি মানবাধিকার লঙ্ঘন কমানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতাগত বৈষম্য হ্রাস করবে এবং বিশ্বব্যাপী শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষায় সহায়ক হবে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতির চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্যকে নতুন শুল্কের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস, কৃষি সার, নির্দিষ্ট কিছু খাদ্যপণ্য, উড়োজাহাজ ও এর যন্ত্রাংশ, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, সেকশন ২৩২-এর আওতাধীন স্টিল, অ্যালুমিনিয়াম, তামা ও অটোমোবাইল এবং ইউএসএমসিএ চুক্তির শর্ত পূরণকারী উত্তর আমেরিকার পণ্য।
এই নতুন শুল্ক নীতির পেছনে রয়েছে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ রায়। চলতি বছরের শুরুতে আদালত রায় দেয়, জরুরি ক্ষমতা ব্যবহার করে ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপ করা বৈশ্বিক আমদানি শুল্ক আইনি ভিত্তিহীন ছিল। এরপর আগের নীতি বহাল রাখতে ১৯৭৪ সালের মার্কিন বাণিজ্য আইনের সেকশন ৩০১ ব্যবহার করে নতুন শুল্ক কাঠামো তৈরি করে ইউএসটিআর।
এর আগে ২০২৫ সালের এপ্রিলে ‘লিবারেশন ডে’ ঘোষণার মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করেছিল। তবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্ট সেই শুল্ক বাতিল করলে প্রশাসনকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ফেরত দিতে হয়। এরপর থেকেই বিকল্প আইনি কাঠামোর মাধ্যমে নতুন শুল্ক আরোপের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
নতুন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যেই বিভিন্ন দেশের তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
ব্রাজিল সরকার মার্কিন পদক্ষেপকে অন্যায্য ও স্বেচ্ছাচারী আখ্যা দিয়ে অভিযোগ করেছে, শ্রমিক অধিকারকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র সংরক্ষণবাদী বাণিজ্যনীতি বাস্তবায়ন করছে। দেশটি নিজেদের ‘রেসিপ্রোসিটি আইন’ অনুযায়ী পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি বিকল্প বাজার খোঁজার ঘোষণা দিয়েছে।
জাপান সরকারও গভীর হতাশা প্রকাশ করে জানিয়েছে, তাদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বরাবরই বৈশ্বিক নিয়ম মেনেই পরিচালিত হয়।
অস্ট্রেলিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী ডন ফারেল এই শুল্ককে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক বলে মন্তব্য করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কূটনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নও ওয়াশিংটনের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। ইইউর পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান কাজা কালাস বলেন, ইউরোপে শ্রমিক সুরক্ষার আইন বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী, ফলে জোরপূর্বক শ্রম নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই আরও ১৬টি দেশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা (ম্যানুফ্যাকচারিং ওভারক্যাপাসিটি) নিয়ে তদন্ত চালাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে আরও দেশ নতুন মার্কিন শুল্কের আওতায় আসতে পারে।