ইউরোপের দাবানলে নতুন আতঙ্কের নাম ‘ফায়ার ক্লাউড’

প্রকাশিত: ৮:২০ অপরাহ্ণ, জুলাই ৩০, ২০২৬

ইউরোপের দাবানলে নতুন আতঙ্কের নাম ‘ফায়ার ক্লাউড’

আন্তর্জাতিক ডেস্ক ::

 

ফ্রান্স ও স্পেনে সাম্প্রতিক সময়ের ভয়াবহ দাবানল যখন নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছেন দমকলকর্মীরা, তখন বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন আরও এক নতুন বিপদ নিয়ে। সেটি হলো পাইরোকিউমুলোনিম্বাস, যা ‘ফায়ার ক্লাউড’ বা ‘আগুনের মেঘ’ নামেও পরিচিত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিরল আবহাওয়াগত ঘটনা দাবানলকে আরও ভয়াবহ ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যেতে পারে। বার্তাসংস্থা দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।

 

বিজ্ঞানীরা বলছেন, সাধারণত তীব্র গরম, শুষ্ক আবহাওয়া ও প্রবল বাতাস একসঙ্গে মিললে দাবানল দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তবে অত্যন্ত বড় ও তীব্র দাবানল কখনও কখনও নিজেই একটি স্বতন্ত্র আবহাওয়া ব্যবস্থা তৈরি করতে পারে। এর সবচেয়ে ভয়ংকর রূপই হলো পাইরোকিউমুলোনিম্বাস বা ফায়ার ক্লাউড।

বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, বড় দাবানল থেকে বিপুল পরিমাণ তাপ ও শক্তি ধোঁয়ার সঙ্গে দ্রুত উপরের দিকে উঠে যায়। ধোঁয়ার স্তম্ভ যথেষ্ট উচ্চতায় পৌঁছালে বায়ুমণ্ডলের নিম্নচাপের কারণে তা ঠান্ডা হতে শুরু করে। এরপর বাতাসের আর্দ্রতা ঘনীভূত হয়ে বিশাল আকৃতির বজ্রগর্ভ মেঘ তৈরি হয়। এই মেঘ থেকেই বজ্রপাত, প্রবল দমকা হাওয়া এমনকি নতুন দাবানলেরও সৃষ্টি হতে পারে।

 

যদি দাবানল অত্যন্ত বড় ও তীব্র হয়, তাহলে এর ধোঁয়ার স্তম্ভ ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার পর্যন্ত উচ্চতায় উঠে স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে প্রবেশ করতে পারে। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা এই মেঘকে ‘মেঘের আগুন-উগরানো ড্রাগন’ বলে বর্ণনা করেছে।

 

অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইউএনএসডব্লিউ) দাবানল গবেষণা দলের বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক রিক ম্যাকরে বলেন, ‘এটি মূলত আগুনের ধোঁয়ার ভেতরেই তৈরি হওয়া একটি পূর্ণাঙ্গ বজ্রঝড়। এটি প্রায় ১০ হাজার ঘনকিলোমিটার বায়ুমণ্ডলকে প্রভাবিত করতে পারে, ফলে এর প্রভাব অত্যন্ত ব্যাপক।’

 

তিনি জানান, ফায়ার ক্লাউড তৈরি হলে সেখান থেকে উৎপন্ন প্রবল বাতাস নিচের দাবানলকে আরও দ্রুত ছড়িয়ে দেয়। একই সঙ্গে মেঘের বজ্রপাত দূরের বনাঞ্চলেও নতুন আগুন লাগাতে পারে। এতে আগুনের গতিপথ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে এবং দমকলকর্মীদের জন্য পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।

 

রিক ম্যাকরের ভাষায়, “ফায়ার ক্লাউড তৈরি হওয়া মানেই দাবানল অত্যন্ত বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এটি প্রমাণ করে যে ব্যাপক মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল।”

 

বিশেষজ্ঞরা জানান, অস্ট্রেলিয়ায় শতকের শুরু থেকে নিয়মিত ফায়ার ক্লাউডের ঘটনা দেখা যাচ্ছে এবং সময়ের সঙ্গে এর সংখ্যা বাড়ছে। ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার ভয়াবহ দাবানলেও এমন মেঘ তৈরি হয়েছিল। তবে ফ্রান্সের ইতিহাসে এটিই হবে প্রথম নিশ্চিতভাবে নথিভুক্ত পাইরোকিউমুলোনিম্বাসের ঘটনা।

 

ম্যাকরে বলেন, ‘ফ্রান্সকে এবার প্রথমবারের মতো পাইরোকিউমুলোনিম্বাসের সম্ভাবনা নিয়ে সরাসরি ভাবতে হচ্ছে। কয়েক দিন আগে এমন মেঘ তৈরি হয়েছিল কি না, সেটি মূল বিষয় নয়। বরং আগামী মঙ্গলবার বা বুধবার এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।’

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে দাবানলের ঝুঁকি যেমন বাড়ছে, তেমনি ফায়ার ক্লাউড তৈরির জন্য অনুকূল পরিবেশও তৈরি হচ্ছে। ম্যাকরে বলেন, ‘এটি শুধু তাপমাত্রা বাড়ার বিষয় নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বায়ুমণ্ডল, আবহাওয়া ও ভূমির বৈশিষ্ট্যে বড় ধরনের পরিবর্তন হচ্ছে, যা এই ধরনের চরম আবহাওয়াকে আরও ঘন ঘন ঘটাচ্ছে।’

 

জলবায়ু মডেলগুলোও ইঙ্গিত দিচ্ছে, ভবিষ্যতে এই প্রবণতা আরও তীব্র হতে পারে।

 

এদিকে ইউরোপে চলমান দাবানল দেখা দিয়েছে পর্যটনের ভরা মৌসুমে। মে মাস থেকে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় বনাঞ্চলগুলো অত্যন্ত শুষ্ক হয়ে পড়েছে। এর ওপর একের পর এক তাপপ্রবাহ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

Spread the love

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

আর্কাইভ

September 2026
M T W T F S S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930