মোরেলগঞ্জে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ১৯ পরিবারসহ ঝুঁকিতে প্রায় এক হাজার বিঘা ফসলি জমি ও মহাশ্মশান

প্রকাশিত: ৬:৪৩ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১০, ২০২৬

মোরেলগঞ্জে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ১৯ পরিবারসহ ঝুঁকিতে প্রায় এক হাজার বিঘা ফসলি জমি ও মহাশ্মশান

প্রতিনিধি / বাগেরহাট ::

 

নদীর বুক জেগে ওঠা চর। সেই চরই ছিল নদীতীরের মানুষের প্রাকৃতিক সুরক্ষা। কিন্তু সেই চর কেটে মাটি নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ইটভাটায়। ভেকু মেশিনের একের পর এক আঘাতে তৈরি হচ্ছে বড় বড় গর্ত ও খাল। আর এতে বদলে যাচ্ছে নদীর গতিপথ, বাড়ছে স্রোতের চাপ। হুমকির মুখে পড়েছে বসতঘর, ফসলি জমি ও একটি মহাশ্মশান।

 

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনসংলগ্ন বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে পানগুচি নদীর তীরবর্তী এলাকায় নদীর ভরাটকৃত চর থেকে মাটি কেটে ইটভাটায় সরবরাহের এমন অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এভাবে মাটি কাটার কারণে কাঠালতলা আশ্রয়ণ প্রকল্পের ১৯টি পরিবারসহ আশপাশের তিন শতাধিক পরিবার এখন নদীভাঙনের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। ঝুঁকিতে রয়েছে প্রায় এক হাজার বিঘা ফসলি জমি এবং স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের একটি মহাশ্মশান।

 

স্থানীয়দের দাবি, অবিলম্বে নদীর চর কাটা বন্ধ করে ভেকু মেশিন অপসারণ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে নদীতীরের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো দ্রুত পরিদর্শন করে স্থায়ী সুরক্ষার উদ্যোগ নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।

 

ভেকুর আঘাতে চরে তৈরি হচ্ছে গর্ত

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পানগুচি নদীর তীরবর্তী মোরেলগঞ্জ সদর ইউনিয়নের কাঠালতলা আশ্রয়ণ প্রকল্পে দীর্ঘদিন ধরে ১৯টি পরিবার বসবাস করছে। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় এমবিআই ব্রিকস ইটভাটার মালিক শাহজাহান শেখের শ্রমিকরা ভেকু মেশিন দিয়ে নদীর ভরাট হওয়া চর থেকে মাটি কেটে ইটভাটায় নিয়ে যাচ্ছেন।

 

স্থানীয়দের ভাষ্য, চর কেটে নেওয়ার ফলে সেখানে বড় বড় গর্ত ও খালের সৃষ্টি হয়েছে। জোয়ারের সময় নদীর পানি এসব গর্ত দিয়ে প্রবল বেগে ঢুকে পড়ায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের সীমানায় ভাঙন শুরু হয়েছে। পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে যেকোনো সময় বসতঘর নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা করছেন বাসিন্দারা।

 

আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা নূর জাহান বিবি, গোলবানু বেগম, মাইনূর বেগম ও দলিল শেখ বলেন, এর আগেও নদীর চর থেকে মাটি কেটে নেওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়েছিলেন তারা। সম্প্রতি আবারও ভেকু দিয়ে চর কেটে খাল তৈরি করায় জোয়ারের পানির চাপ বেড়েছে। এতে তাদের ঘরবাড়ি নিয়ে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।

 

তাদের অভিযোগ,
ঝুঁকিতে ফসলি জমি ও মহাশ্মশান,শুধু নদীভাঙনের ঝুঁকি নয়, পাশের ইটভাটার ধোঁয়ায় পরিবেশও দূষিত হচ্ছে। ফলন্ত গাছের ফল ঝরে পড়ছে এবং শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়ছে। এসব বিষয়ে প্রতিকার চেয়ে তারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ দিয়েছেন।

বাগেরহাট রিপোর্টার্স ইউনিটি সভাপতি এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির বলেন,, নদীর চর কেটে মাটি নেওয়ার কারণে শুধু কাঠালতলা আশ্রয়ণ প্রকল্প নয়, আশপাশের প্রায় তিন শতাধিক পরিবারও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। প্রায় এক হাজার বিঘা ফসলি জমি এবং স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মহাশ্মশানও নদীভাঙনের হুমকিতে পড়েছে।

 

তার দাবি, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বর্ষা ও জোয়ারের পানির চাপে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

 

অভিযোগের পর বন্ধের নির্দেশ

অভিযোগের বিষয়ে এমবিআই ব্রিকস ইটভাটার স্বত্বাধিকারী শাহজাহান শেখ বলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশ পাওয়ার পর ভাটার শ্রমিকদের দিয়ে মাটি কাটা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আশ্রয়ণ প্রকল্পের কোনো ক্ষতি হলে তিনি নিজেই তা দেখবেন বলেও জানান তিনি।

 

মোরেলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাবিবুল্লাহ বলেন, কাঠালতলা আশ্রয়ণ প্রকল্পের কাছের ইটভাটায় নদীর চর থেকে মাটি কাটার অভিযোগ পাওয়ার পরই তা বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

নদীর তীরের প্রাকৃতিক চর শুধু জমি নয়—অনেক সময় তা নদীর স্রোত নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সেই চর পরিকল্পনাহীনভাবে কেটে নেওয়া হলে নদীর স্রোতের গতিপথ ও তীরের স্থিতিশীলতা বদলে যেতে পারে। মোরেলগঞ্জের কাঠালতলার ঘটনায় তাই শুধু অবৈধ মাটি কাটার অভিযোগ নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে নদীভাঙন, কৃষিজমি, আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের নিরাপত্তা ও পরিবেশের প্রশ্ন
প্রশ্ন উঠছে নদী ও মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে।

 

স্থানীয়দের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ভেকুর তৈরি গর্তই একদিন নদীর ভাঙনের নতুন পথ হয়ে উঠতে পারে। তখন ক্ষতিগ্রস্ত হবে শুধু কয়েকটি পরিবার নয়—বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি, ধর্মীয় স্থাপনা ও নদীতীরবর্তী মানুষের জীবন-জীবিকা।

Spread the love

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

আর্কাইভ

August 2026
M T W T F S S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31