সিলেট ২৮শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৩ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৫:৪৫ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৮, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক ::
আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিক নৌ-চলাচল পুনরায় চালুর আগে যুক্তরাষ্ট্রকে একাধিক শর্ত পূরণ করতে হবে বলে জানিয়েছে ইরান। এসব শর্তের একটি তালিকা প্রস্তুত করছে তেহরান। এর মধ্যে আঞ্চলিক যুদ্ধের অবসান, ইরানি বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত অবরোধ প্রত্যাহার, নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবিও রয়েছে। আজ শুক্রবার রয়টার্স ও আল-জাজিরার প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা গেছে।
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজাই গতকাল বৃহস্পতিবার আল মানার টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন। তিনি জানান, মধ্যস্থতাকারীদের অনুরোধের পর হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলতে তেহরানের শর্তগুলো চূড়ান্ত করার কাজ চলছে।
রেজাই বলেন, প্রণালির মধ্য দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য ওমানের সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট নৌ-করিডোরের বিষয়ে ইরানের সমঝোতা হয়েছে। প্রস্তাবিত এই করিডোরের কিছু অংশ ওমানের জলসীমা এবং কিছু অংশ ইরানের জলসীমার মধ্য দিয়ে যাবে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের শর্ত মেনে নিলে জাহাজগুলো নির্ধারিত কেন্দ্রীয় চ্যানেল ব্যবহার করতে পারবে বলে জানান তিনি।
তবে ইরান ও ওমানের মধ্যে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সমঝোতা এখনো হয়নি। গত বুধবার এক জ্যেষ্ঠ সূত্র জানিয়েছিল, প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও রাজস্ব ভাগাভাগি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ডস আগে জানিয়েছিল, হরমুজের নিয়ন্ত্রণ ও এর আয় ভাগাভাগির বিষয়ে ওমানের সঙ্গে সমঝোতা হয়েছে।
ইরানের বিপ্লবী গার্ডসের এক মুখপাত্রের বক্তব্য অনুযায়ী, তেহরান যাকে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধ হিসেবে বর্ণনা করছে, সেটি প্রত্যাহার না করা হলে প্রণালির স্বাভাবিক চলাচল পুনরুদ্ধারের অনুমতি দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে ক্ষতিপূরণ দিতে এবং ইরানের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে বলেও দাবি করা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেই কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল থানি ২৭ আগস্ট তেহরান সফর করেন। ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় হরমুজ প্রণালিতে নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নিয়ে ইরান ও ওয়াশিংটনের বক্তব্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা দাবি করছেন, প্রণালিটি খোলা রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র সেখানে মাইন অপসারণসহ নিরাপদ নৌ-চলাচলে সহায়তা করেছে। তবে বাস্তবে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল এখনো স্বাভাবিক পর্যায়ে ফেরেনি। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ২৭ আগস্ট মাত্র সাতটি পণ্যবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে, যেখানে আগের দিন এই সংখ্যা ছিল ১৭টি এবং ১০ দিনের গড় ছিল ১৫টি।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। গত ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে গেছে।
এপ্রিল ও জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ঘোষিত যুদ্ধবিরতি ও সমঝোতার অন্যতম লক্ষ্য ছিল সামুদ্রিক যোগাযোগ ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা। তবে এসব উদ্যোগ স্থায়ী হয়নি। ফলে হরমুজ প্রণালি পুনরায় পুরোপুরি স্বাভাবিক করতে হলে শুধু নৌ-চলাচল নিয়ে সমঝোতা নয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বৃহত্তর রাজনৈতিক বিরোধেরও সমাধান প্রয়োজন হতে পারে।
কাতার, ওমান ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় নতুন করে কূটনৈতিক উদ্যোগ শুরু হলেও ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সরাসরি আলোচনা এখনো অনিশ্চিত। ফলে ইরানের শর্তের তালিকা এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়াই হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌ-চলাচল ফিরবে কি না, তা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।