কিছু প্রার্থীর কর্মকাণ্ডে বিব্রত বিএনপি, পরিবর্তনের আভাস

প্রকাশিত: ৫:৪০ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১, ২০২৫

কিছু প্রার্থীর কর্মকাণ্ডে বিব্রত বিএনপি, পরিবর্তনের আভাস

লন্ডন বাংলা ডেস্ক ::

 

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে গত ৩ নভেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) জাতীয় সংসদের মোট ৩০০ আসনের মধ্যে ২৩৭টিতে দলীয় প্রার্থীর সম্ভাব্য একটি তালিকা প্রকাশ করে।

 

 

 

এ তালিকা প্রকাশ হওয়ার পর থেকেই দেশের বিভিন্নস্থানে বিদ্রোহের দানা বেঁধে উঠে। বিশেষ করে কিছু আসনে বিতর্কিত, বার্ধক্যজনিত সমস্যা, সংস্কারপন্থি, অযোগ্য ও হাইব্রিড নেতা মনোনয়ন পাওয়ায় তৃণমূলে বাড়ছে দলীয় কোন্দল। এসব আসন নিয়ে কিছুটা বেকায়দায় পড়েছে দলটি।

 

 

এছাড়া ঘোষিত কিছুর প্রার্থীর কর্মকাণ্ডে বিব্রত হচ্ছে বিএনপি। তাদের কিছু বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।

 

 

 

দলটির বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক আসনেই ত্যাগীদের মূল্যায়ন করা হয়নি। বরং যারা দীর্ঘ দেড়দশক রাজপথে ছিলেন না এবং দেশের বাইরে অবস্থান করছেন তারাই মূল্যায়িত হয়েছেন।

 

 

 

এদিকে, নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে ততই ভাবিয়ে তুলছে বিএনপির হাইকমান্ডকে। সবকিছু মিলিয়ে কিছু আসনে প্রার্থী পরিবর্তনের আভাস পাওয়া গেছে।

 

 

 

অনেক আসনে ঘোষিত প্রার্থী বিরুদ্ধে এলাকার সকল প্রার্থী একাট্টা হয়ে করেছেন বিক্ষোভ মিছিল, প্রতিবাদ সমাবেশ। সড়ক-রেলপথ অবরোধ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ নিয়ে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। এমনকি বিএনপির নয়াপল্টন, গুলশান কার্যালয় এবং বিএনপি চেয়ারপার্সনের বাসভবনের সামনেও বিক্ষোভ হয়েছে। দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনা উপেক্ষা করছেন এসব বিদ্রোহীরা। অনেক বিদ্রোহী প্রার্থী ইতিমধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ারও ঘোষণা দিয়েছেন।

 

 

 

 

বিএনপির গুলশান কার্যালয় সূত্র জানায়, পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার অংশ হিসাবে যারা মনোনয়ন পেয়েছেন মাঠপর্যায়ে তাদের অবস্থান নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান দিয়ে যাচাই করা হচ্ছে। তারেক রহমান অনেক বিদ্রোহী প্রার্থীদের ডেকে ভবিষ্যৎ মূল্যায়নের কথা বলছেন। এবং কিছু কিছু আসনে মনোনয়ন পরিবর্তনের ইঙ্গিতও দিয়েছেন। তবে, এ সংখ্যা খুব একটি বেশি নয়।

 

 

 

 

মনোনয়ন বঞ্চিত দিনাজপুর জেলার এক মনোনয়ন প্রত্যাশী বলেন, আমার আসনে যাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে সে দীর্ঘ দেড়যুগ রাজপথে কোন আন্দোলন সংগ্রামে ছিলো না। এমনকি বিএনপির কোন নেতাকর্মীদের সাথে সম্পৃক্তও ছিলেন না। বরং ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের সাথে লিয়াজো করে চলেছেন অথচ, দল তাকেই মনোনয়ন দিলো। আমি বিশ্বাস করি বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে তারেক রহমান রাজপথের ত্যাগের মূল্যায়ন করবেন এবং সত্যিকারের ত্যাগীদেরই মনোনয়ন দিবেন।

 

 

 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন  বলেন, অতিদ্রুত এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আমাদের চেয়ারম্যান তারেক রহমান অনেক বিচক্ষণ। দেশের প্রতিটি জেলা উপজেলায় তিনি নিজে কথা বলছেন। তিনি বলেন, বিএনপি একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল। এখানে অনেক যোগ্য প্রার্থী আছেন। কিন্তু সবাইকে মনোনয়ন দেওয়ারতো সুযোগ নেই। তবে, যারা মনোনয়ন পাবেন না, তাদেরকেও বিভিন্নভাবে মূল্যায়ন করা হবে। এটি আমাদের কমিট মেন্ট।

 

 

 

দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, আমাদের অনেকের মাঝে একটু মান অভিমান থাকতেই পারে। তবে, এগুলো সাময়িক। অল্প সময়ের মধ্যে তা স্তিমিত হয়ে যাবে। শেষ মুহুর্তে সবাই দল ও দেশের স্বার্থে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ধানের শীষকে জয়যুক্ত করার জন্য কাজ করবে।

 

 

 

দলটির বিভিন্ন জেলা নেতারা  অভিযোগ করে জানান, সিলেট ৬ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পাওয়া ইমরান আহমেদ চৌধুরীর এলাকামুখী নন। তৃণমূল নেতাকর্মীদের সাথে নেই সম্পৃক্ততা। সম্প্রতি তার একটি অশ্লীল ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। স্থানীয় বিএনপি নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে মনোনয়ন পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছেন।

 

 

 

জয়পুরহাট-২ আসনে সাবেক আমলা আব্দুল বারীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। যার সাথে কোনো জন সম্পৃক্তা নেই। পাঁচ মাস আগে নেমেছেন রাজনীতিতে। নারায়ণগঞ্জ ৩ আসনে আজহারুল ইসলাম মান্নানের বিরুদ্ধে গত বছরের ৫ আগষ্টের পর থেকেই রয়েছে দখলবাজির অভিযোগ। যা বিভিন্ন গণমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছে।

 

 

 

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ (আখাউড়া-কসবা) আসনে নব্বই উর্ধ্ব যাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে তার স্মৃতিশক্তি লোপ পেয়েছে বলে জানান স্থানীয় নেতারা। সম্প্রতি এক সভায় সমাবেশকে সহবাস বলার তার এক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। তাকে দুইজন নিয়ে চেয়ার থেকে উঠাতে হয়। তাছাড়া তার পিএস আরিফ ৩শ কোটি টাকার দূর্নীতির দায়ে বর্তমানে কারাগারে আটক রয়েছেন। এ আসনে ত্যাগী ও মাঠপর্যায়ে গ্রহণযোগ্য নেতা কবীর আহমেদ ভূঁইয়াকে মনোনয়ন না দেওয়ায় হতাশ তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। বিশেষ বিগত আন্দোলন সংগ্রাম ও জেলা রাজনীতিতে তার সক্রিয় ভূমিকা ছিলো। সম্ভাব্য প্রার্থী পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়ে স্থানীয় বিএনপি।

 

 

 

মাদারীপুর ১ (শিবচর) এ আসনে কামাল-জামান নুরুদ্দিন মোল্লাকে মনোনয়ন দেওয়া হলেও নাটকীয়ভাবে তার মনোনয়ন স্থগিত করা হয়। দীর্ঘ দেড়যুগ এলাকায় কাজ করে আসছেন তিনি। এবং ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির রাজনীতিতেও সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। মাদারীপুর ১ এবং ঢাকা ১৭ আসনে প্রতিটি কেন্দ্র কমিটিও সমাপ্ত করেছেন। দলের প্রতিটি সভাসমাবেশে জনবল ও অর্থ দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন। তার মনোনয়ন স্থগিত হওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করেছে শিবচর বিএনপির নেতাকর্মীরা।

 

 

 

নাটোর-১ লালপুর-বাঘাতিপাড়া আসনে প্রার্থী করা হয়েছে প্রয়াত বিএনপি নেতা ফজলুর রহমান পটলের মেয়ে ফারজানা শারমিন পুতুলকে। এ আসনে আরও দুজন মনোনয়নপ্রত্যাশী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক ও বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-দপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু এবং পুতুলের ভাই ঢাকা মেডিকেল কলেজের সাবেক ভিপি ইয়াছির আরশাদ রাজন। এ আসনে তৃণমূলে জনপ্রিয় ব্যক্তি তাইফুল ইসলাম টিপু। টিপুর মনোনয়নের পক্ষে এলাকায় বড় ধরনের শোডাউন অব্যাহত রেখেছে স্থানীয় বিএনপি।

 

 

 

বরিশাল ২ উজিরপুর-বানারীপাড়া আসনে যাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে তিনি ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর দেশ ত্যাগ করে দেশে ফিরেন গত বছরের ৫ আগষ্টের পর। তার অব্যাহত বেফাঁস মন্তব্য ইতিমধ্যে ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। ছোটখাটো চাঁদাবাজি অন্যায় নয় এবং খালেদা জিয়াকে ১০ লাখ টাকা দিয়ে বিএনপিতে যোগদান করেছি সারফুদ্দিন সান্টুর এই বক্তব্য ভোটে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে মনে করে স্থানীয় বিএনপি।

 

 

নরসিংদী-৪ আসনে সর্দার সাখাওয়াত হোসেন বকুলকে মনোনয়ন দেওয়ায় সেখানেও ক্ষুব্ধ হয়েছেন বেশকিছু স্থানীয় নেতাকর্মী। তারা বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক আব্দুল কাদির ভূঁইয়া জুয়েলকে মনোনয়ন দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। আন্দোলন সংগ্রামে জুয়েলের অবদানকে মুল্যায়ন করার আহবান জানিয়েছে স্থানীয় বিএনপি।

 

 

 

মুন্সিগঞ্জ ২ আসনে যাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে তিনি দল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেছিলেন। তার বয়স নব্বইয়ের কোঠায়। এ আসনে ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ে শক্তিশালী সংগঠন করেছেন দলটির যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট সালাম আজাদ।

 

 

 

টাঙ্গাইল ৩ আসনে যাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে তিনি এত্র এলাকার বাসিন্দা না হওয়া এলাকায় বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। এ এলাকায় সাবেকমন্ত্রী লুৎফর রহমান আজাদ এবং দলটির কেন্দ্রীয় নেতা মাইনুল ইসলাম দীর্ঘদিন যাবত কাজ করে আসছেন। স্থানীয়দের মতে এ এলাকায় মাইনুল ইসলামের ক্লিন ইমেজ রয়েছে।

 

 

 

কুষ্টিয়া ১ দৌলতপুরে প্রার্থী করা হয়েছে রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা। যিনি ১/১১-এর সময় সংস্কারপন্থী ছিলেন। এছাড়া ৫ আগষ্টের পর তার এবং তার পরিবারের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি এবং দখলদারিত্বের ব্যাপক অভিযোগও রয়েছে।

 

 

 

ব্রাহ্মণবাড়িয়া ৫ আসনে আব্দুল মান্নানকে মনোনয়ন দেওয়া হলেও ১১ বছর আন্দোলন সংগ্রামে ছিলেন না তিনি। তিনি দীর্ঘদিন জেলা ও উপজেলার দায়িত্বে থাকলেও একটি মামলাও তার বিরুদ্ধে দায়ের হয়নি। এ আসনের ৭জন মনোনয়ন প্রত্যাশী মনোনয়ন পরিবর্তনের জন্য ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বরাবর লিখিত আবেদন জানিয়েছে।

 

 

 

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান বলেন, আপনার অবগত হয়েছেন যে বিএনপির যে মনোনয়নগুলি ঘোষণা করা হয়েছে সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে প্রয়োজনবোধে অধিকতর বিশ্লেষণের মাধ্যমে কোনও কোনও বিশেষ ক্ষেত্রে পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে। আমরা এখন সেই প্রক্রিয়ার অপেক্ষার রয়েছি ।

 

 

চাঁদপুর ৪ আসনেও বিদ্রোহ চরমে পৌছেছে। এখানেও পরিবর্তন হতে পারে দলীয় প্রার্থী।

 

 

 

এছাড়াও সিলেট-৩, ৪ ও ৬, সুনামগঞ্জ-১ ও ৫, মাগুরা-২, কুষ্টিয়া-৪, নেত্রকোনা-৫ (পূর্বধলা উপজেলা), সিরাজগঞ্জ-৩, নেত্রকোনা-৩ (আটপাড়া-কেন্দুয়া), চট্টগ্রাম-২, ৪, ১২, ১৩ ও ১৬, ফেনী-২, গাইবান্ধা-৪, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫, দিনাজপুর-১, ২ ও ৪, সাতক্ষীরা-২ ও ৩; জামালপুর-২, টাঙ্গাইল-১, নীলফামারী-৪, কুষ্টিয়া ২ ও ৩; বান্দরবান, শেরপুর-২, হবিগঞ্জ-৪, জয়পুরহাট-১ ময়মনসিংহ-৩,৬, ৯ ও ১১, মুন্সীগঞ্জ–১, কিশোরগঞ্জ-৫; কুমিল্লা-৫, ৬ ও ১০, কুড়িগ্রাম–১ ও ৩; রাজশাহী-১, ৩ ও ৪; ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫; রাজবাড়ী–২, নওগাঁ-১, ৩ ও ৪, পাবনা-৪; এবং মৌলভীবাজার-২ – এসব আসনে প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিতে আন্দোলন চলছে। এর মধ্যে কিছু আসনে প্রার্থী পরিবর্তন আসতে পারে বলে বিএনপির ভেতরে আলোচনা আছে।

Spread the love

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

আর্কাইভ

December 2025
M T W T F S S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031