সুন্দরবনের উপকূলে বারোমাসি কাটিমন আমের বিপ্লব

প্রকাশিত: ৪:৩৯ অপরাহ্ণ, জুন ৯, ২০২৬

সুন্দরবনের উপকূলে বারোমাসি কাটিমন আমের বিপ্লব

প্রতিনিধি / বাগেরহাট ::

 

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের উপকূলবর্তী খাদ্যশস্য ভান্ডারখ্যাত বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার দৈবজ্ঞহাটী ইউনিয়নের খালকুলা গ্রামের কৃষক হালদার রুহুল মোমিন মুকুল বারোমাসি কাটিমন আম চাষ করে গোটা এলাকায় আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন। চাকরির পেছনে না ছুটে আত্মকর্মসংস্থান গড়ে তোলার স্বপ্ন নিয়ে শুরু করা তাঁর কৃষি উদ্যোগ আজ সফলতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। তাঁর বাগানে উৎপাদিত বিষমুক্ত ও সুস্বাদু কাটিমন আম এখন অনলাইনের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।

 

উপকূলীয় এই অঞ্চলে একসময় লবণাক্ততার কারণে উন্নত জাতের আম চাষের কথা কল্পনাও করা যেত না। কিন্তু সেই ধারণাকে পাল্টে দিয়ে নিজের মেধা, শ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে সফল হয়েছেন কৃষক মুকুল। তিনি প্রমাণ করেছেন, সঠিক পরিকল্পনা ও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার করলে উপকূলীয় এলাকাতেও লাভজনক ফলচাষ সম্ভব।

 

জানা যায়, ২০২০ সালে পিতার দুই একর জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে কাটিমন আমের বাগান শুরু করেন তিনি। চুয়াডাঙ্গা থেকে ১০০টি কাটিমন আমের চারা সংগ্রহ করে রোপণ করেন। প্রথম বছরেই আশানুরূপ ফলন এবং সব খরচ বাদ দিয়ে প্রায় ৫০ হাজার টাকা লাভ হওয়ায় তাঁর আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। এরপর আরও ২০০টি চারা রোপণ করেন। বর্তমানে তাঁর বাগানে মোট ৩০০টি কাটিমন আমগাছ রয়েছে।
সরেজমিনে বাগানে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিটি গাছের ডালে ডালে ঝুলছে থোকায় থোকায় আম। সবুজ পাতার ফাঁকে সোনালি আভা ছড়ানো আমগুলো যেন কৃষকের পরিশ্রমের সফলতার গল্প বলছে। বারোমাসি কাটিমন জাতের আম অত্যন্ত সুস্বাদু, রসালো ও মিষ্টি। এর আঁটি পাতলা হওয়ায় ভোক্তাদের কাছেও এর জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে।

 

বর্তমানে বাগান থেকেই প্রতি কেজি আম ১০০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চলতি বছরে ৩০০টি গাছের পরিচর্যা, শ্রমিক মজুরি, সার ও ওষুধ বাবদ প্রায় ১ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। তবে ফলনের পরিমাণ বিবেচনায় এবার ৫ থেকে ৬ লাখ টাকার আম বিক্রির আশা করছেন তিনি।

 

সফল কৃষক হালদার রুহুল মোমিন মুকুল বলেন, “ছোটবেলা থেকেই আমার ইচ্ছা ছিল চাকরির জন্য অপেক্ষা না করে নিজেই কিছু করব। আমাদের এই প্রত্যন্ত উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততার কারণে আগে আমচাষ তেমন হতো না। কিন্তু নিয়মিত মিষ্টি পানির ব্যবস্থা করায় কাটিমন আমের চাষে দারুণ ফলন পেয়েছি। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, আমি ক্রেতাদের হাতে বিষমুক্ত ও নিরাপদ আম তুলে দিতে পারছি। এটাই আমার সবচেয়ে বড় আত্মতৃপ্তি।”

 

তিনি আরও বলেন, “অনেকেই বাগানে এসে নিজের হাতে আম পেড়ে নিয়ে যাচ্ছেন। আবার অনলাইনের মাধ্যমে অর্ডার নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে কুরিয়ার সার্ভিসে আম পাঠানো হচ্ছে। এতে ভালো দাম যেমন পাওয়া যায়, তেমনি ক্রেতারাও সরাসরি বাগান থেকে নিরাপদ ফল পাচ্ছেন।”

 

স্থানীয়দের মতে, মুকুলের এই সফলতা এখন এলাকার তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে। অনেকেই তাঁর বাগান পরিদর্শন করে বারোমাসি আমসহ অন্যান্য ফলচাষে আগ্রহী হচ্ছেন। ফলে এলাকায় কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা তৈরির নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে।

 

এ বিষয়ে মোরেলগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, “বাজারে কাটিমন আমের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। সাধারণ আমের তুলনায় এর দামও বেশি পাওয়া যায়। উপজেলার খাউলিয়া, বনগ্রামসহ কয়েকটি ইউনিয়নে ছোট পরিসরে কাটিমন আমের চাষ হলেও দৈবজ্ঞহাটীর খালকুলা গ্রামের কৃষক রুহুল মোমিন মুকুল বাণিজ্যিকভাবে এই আমের চাষ করে বাম্পার ফলন পেয়েছেন। তাঁর এই সফলতা গোটা উপজেলায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছে এবং অন্য কৃষকদেরও উদ্বুদ্ধ করছে।”

 

কৃষি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা মোকাবিলা করে ফলচাষের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তা কাজে লাগাতে পারলে কৃষকের আয় বাড়ার পাশাপাশি দেশের ফল উৎপাদনেও নতুন মাত্রা যোগ হবে। আর সেই সম্ভাবনার উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে উঠেছেন মোরেলগঞ্জের কৃষক হালদার রুহুল মোমিন মুকুল।

Spread the love

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

আর্কাইভ

June 2026
M T W T F S S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930