বাগেরহাটের বাবাকে দাফনের কয়েক ঘণ্টা পরই কর্মস্থলে, পরদিন এইচএসসি পরীক্ষা

প্রকাশিত: ৭:১৫ অপরাহ্ণ, জুলাই ২২, ২০২৬

বাগেরহাটের বাবাকে দাফনের কয়েক ঘণ্টা পরই কর্মস্থলে, পরদিন এইচএসসি পরীক্ষা

প্রতিনিধি / বাগেরহাট ::

 

একদিকে বাবার মৃত্যু, অন্যদিকে সংসারের দায়িত্ব। শোক কাটানোর সময়টুকুও যেন তার ভাগ্যে জোটেনি। বাবাকে দাফন করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বই হাতে কর্মস্থলে ফিরতে হয়েছে এক এইচএসসি পরীক্ষার্থীকে। রাতভর এটিএম বুথে দায়িত্ব পালন শেষে পরদিন সকালে পরীক্ষার হলে বসেছেন তিনি। জীবনের কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও দায়িত্ব ও স্বপ্নকে একসঙ্গে বয়ে নিয়ে চলা এই তরুণের গল্প এখন আবেগাপ্লুত করছে অনেককে।

 

বাগেরহাট শহরের মুনিগঞ্জ মেডিকেল স্কুল রোড এলাকার বাসিন্দা সদ্য প্রয়াত ইসরাফিল দাড়িয়ার ছেলে ইকন। তিনি বাগেরহাট খান জাহান আলী ডিগ্রি কলেজের মানবিক বিভাগের এইচএসসি পরীক্ষার্থী।

 

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার (২২ জুলাই) ভোরে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন ইসরাফিল দাড়িয়া। দ্রুত তাকে বাগেরহাট জেলা হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন তিনি। মোটরসাইকেল চালিয়ে কষ্ট করে সংসারের খরচ চালাতেন।

 

মঙ্গলবার জোহরের নামাজের পর জানাজা শেষে গোপালগঞ্জে গ্রামের বাড়িতে মায়ের কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়। স্বাভাবিকভাবেই পরিবারের ওপর নেমে আসে গভীর শোকের ছায়া। কিন্তু সেই শোককে সঙ্গী করেই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয় ছেলে ইকনকে।

 

পরিবারের বড় ছেলে ইমন কয়েক বছর আগে একটি সড়ক দুর্ঘটনার পর মানসিক ভারসাম্য হারান। এরপর থেকেই সংসারের অন্যতম প্রধান ভরসা হয়ে ওঠেন ইকন। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি বাগেরহাট শহরের একটি কৃষি ব্যাংকের এটিএম বুথে রাতের শিফটে খণ্ডকালীন চাকরি করেন। সেই আয়ের টাকাই পরিবারের নানা প্রয়োজন মেটাতে সহায়তা করে।

 

স্বজনরা জানান, বাবার দাফন সম্পন্ন করে মঙ্গলবার রাতেই কর্মস্থলে ফিরে যান ইকন। সারারাত দায়িত্ব পালন করেন এটিএম বুথে। অথচ পরদিন বুধবার (২৩ জুলাই) তার এইচএসসি পরীক্ষার ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ের পরীক্ষা ছিল।

 

বাবাকে হারানোর শোক, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের উদ্বেগ, পরিবারের দায়িত্ব এবং পরীক্ষার চাপ—সবকিছুর মাঝেও ভেঙে না পড়ে নিজের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন এই তরুণ। তার এই দৃঢ়তা ও আত্মত্যাগ স্থানীয় মানুষের হৃদয় স্পর্শ করেছে।

 

স্থানীয়দের ভাষ্য, অনেকেই সামান্য প্রতিকূলতায় হতাশ হয়ে পড়েন। সেখানে বাবার মৃত্যুর মতো জীবনের সবচেয়ে বড় আঘাতের মধ্যেও ইকনের দায়িত্ববোধ ও অধ্যবসায় সত্যিই অনুকরণীয়। তারা মনে করেন, সমাজ ও রাষ্ট্রের উচিত এমন সংগ্রামী শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানো।

 

ইকনের এই সংগ্রামের গল্প ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই তার জন্য শুভকামনা জানিয়ে লিখেছেন, জীবনের কঠিন পরীক্ষায় যেভাবে সে ধৈর্য ও সাহসের পরিচয় দিয়েছে, তেমনি শিক্ষাজীবনেও সফল হয়ে পরিবারের স্বপ্ন পূরণ করুক।

 

জীবনের নির্মম বাস্তবতা কখনও কখনও মানুষকে সময়ের আগেই বড় করে দেয়। বাবার কবরের মাটি শুকানোর আগেই কর্মস্থল আর পরীক্ষার হলে ছুটে যাওয়া ইকনের গল্প সেই কঠিন বাস্তবতারই এক মর্মস্পর্শী প্রতিচ্ছবি।

Spread the love

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

আর্কাইভ

July 2026
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031