সিলেট ৩রা আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৯শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৮:৫৭ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২, ২০২৬
প্রতিনিধি / বাগেরহাট ::
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলেরবিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ও মৎস্যভান্ডার হিসেবে খ্যাত বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনে দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় কারাগারে কাটিয়ে সমাজে ফিরেছেন তারা। কেউ হারিয়েছেন জীবনের স্বর্ণালী সময়, কেউ হারিয়েছেন স্বজন। তবে অতীতের ভুল পেছনে ফেলে নতুন জীবনের স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যেতে চান তারা। সেই পথচলাকে সহজ করতে বাগেরহাটে যাবজ্জীবন সাজাভোগ শেষে মুক্তিপ্রাপ্ত কয়েকজন ব্যক্তির মাঝে সেলাই মেশিন, ব্যাটারিচালিত ভ্যানগাড়ি ও শুকনো খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে।
রোববার (২ আগস্ট) বেলা ১১টায় বাগেরহাট জেলা কারাগার চত্বরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এসব উপকরণ বিতরণ করা হয়। বাগেরহাট জেলার সংশোধন ও পুনর্বাসন সমিতির অর্থায়নে আয়োজিত এ কর্মসূচির প্রধান অতিথি ছিলেন বাগেরহাট জেলা প্রশাসক গোলাম মোহাম্মদ বাতেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাগেরহাট জেলা প্রবেশন অফিসার শেখ শহিদুর রহমান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সন্তোষ কুমার নাথ, বাগেরহাট জেলা কারাগারের জেলার মোহাম্মদ আবু সাদাত, বাগেরহাট প্রেস ক্লাবের সভাপতি আবু সাঈদ শুনু, সাধারণ সম্পাদক হেদায়েত হোসেন লিটনসহ বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তা, কারা কর্তৃপক্ষ এবং উপকারভোগীরা।
পুনর্বাসন সহায়তা পাওয়া ব্যক্তিরা হলেন কচুয়া উপজেলার আকলিমা বেগম, মোরেলগঞ্জ উপজেলার লাইলী বেগম, চিতলমারী উপজেলার আয়েশা আক্তার এবং মংলা উপজেলার জালাল শেখ।
২৩ বছর পর মুক্তি, জীবনের নতুন শুরু
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন উপকারভোগী জালাল শেখ। তিনি বলেন, “দীর্ঘ ২৩ বছর কারাভোগের পর আমি মুক্তি পেয়েছি। সমাজে ফিরে নতুন করে জীবন শুরু করা সহজ নয়। জেলা কারাগারের পক্ষ থেকে আমাকে একটি ব্যাটারিচালিত ভ্যানগাড়ি দেওয়া হয়েছে। এটি চালিয়ে সৎভাবে জীবিকা নির্বাহ করতে পারব। এজন্য সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আমি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ।”
তার মতে, পুনর্বাসনের সুযোগ না পেলে অনেক মুক্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তি অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে আবারও অপরাধের পথে ফিরে যেতে বাধ্য হন। তাই এ ধরনের উদ্যোগ তাদের আত্মনির্ভরশীল হতে সহায়তা করবে।
২৬ বছরের কারাজীবন, কারাগারেই হারিয়েছেন স্বামী
আরেক উপকারভোগী আকলিমা বেগমের জীবনকাহিনি ছিল আরও হৃদয়স্পর্শী। তিনি বলেন, “আমি ২৬ বছর কারাভোগ করেছি। একই মামলায় আমার স্বামীও কারাগারে ছিলেন। ২০০৬ সালে তিনি কারাগারেই মারা যান। দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকার সময় দর্জির কাজ শিখেছি। আজ একটি সেলাই মেশিন পেয়েছি। এটি দিয়ে সৎভাবে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে পারব।”
তিনি বলেন, “আমরা ভুল করেছি, শাস্তিও ভোগ করেছি। এখন সমাজ যদি আমাদের গ্রহণ করে, তাহলে আমরা স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারব।”
পুনর্বাসনই পারে অপরাধে পুনরায় জড়িয়ে পড়া ঠেকাতে
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, সাজাভোগ শেষে মুক্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনা রাষ্ট্র ও সমাজের যৌথ দায়িত্ব। অনেক সময় অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক অবহেলা ও কর্মসংস্থানের অভাবে তারা পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়েন। পুনর্বাসনের মাধ্যমে তাদের আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে সেই ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে।
বক্তারা আরও বলেন, একজন মানুষ অপরাধ করে শাস্তি ভোগ করার পর তাকে দ্বিতীয়বার শাস্তি দেওয়ার সুযোগ নেই। বরং সমাজে মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার সুযোগ তৈরি করে দেওয়াই মানবিক রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব।
“পাপকে ঘৃণা করতে হবে, পাপীকে নয়”
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক গোলাম মোহাম্মদ বাতেন বলেন, “পাপকে ঘৃণা করতে হবে, পাপীকে নয়। যারা দীর্ঘদিন সাজাভোগ শেষে মুক্তি পেয়েছেন, তাদের সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে পুনর্বাসন কার্যক্রম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
তিনি বলেন, “আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে তাদের সেলাই মেশিন, ব্যাটারিচালিত ভ্যানগাড়ি ও খাদ্যসামগ্রী প্রদান করা হয়েছে। সমাজের সবাই যদি ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে তাদের গ্রহণ করেন, তাহলে তারা নতুনভাবে জীবন শুরু করতে পারবেন।”
জেলা প্রশাসক আরও বলেন, “অপরাধ দমনে শুধু শাস্তি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা, মানবিক সহমর্মিতা এবং পুনর্বাসনের সুযোগ। একজন মানুষকে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হলে তিনি সমাজের সম্পদে পরিণত হতে পারেন। ভবিষ্যতেও এ ধরনের পুনর্বাসন কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।”
মানবিক উদ্যোগে নতুন আশার আলো
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কারাগার শুধু শাস্তির জায়গা নয়, এটি সংশোধনেরও একটি প্রতিষ্ঠান। কারাগারে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বন্দিদের দক্ষ করে গড়ে তোলার পাশাপাশি মুক্তির পর তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা গেলে অপরাধমুক্ত সমাজ গঠনে তা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
দীর্ঘদিন কারাগারে কাটিয়ে মুক্তি পাওয়া এসব মানুষের হাতে যখন সেলাই মেশিন কিংবা একটি ভ্যানগাড়ির চাবি তুলে দেওয়া হয়, তখন সেটি শুধু একটি উপকরণ নয়—বরং নতুন জীবনের আশা, আত্মমর্যাদা এবং সমাজে সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার একটি সুযোগ হয়ে ওঠে।