অসহায় মায়ের ৫০০ টাকার ভাড়ার জন্য চুল বিক্রি, তবু জোটেনি ঘর

প্রকাশিত: 9:18 PM, August 8, 2026

অসহায় মায়ের ৫০০ টাকার ভাড়ার জন্য চুল বিক্রি, তবু জোটেনি ঘর

প্রতিনিধি / বাগেরহাট  ::

 

মাত্র ৫০০ টাকা। এই সামান্য অর্থ জোগাড় করতে নিজের মাথার চুল বিক্রি করতে হয়েছে অসহায় মা রেহানা খাতুনকে। তাতেও শেষ রক্ষা হয়নি। ভাড়া দিতে না পারায় ঘর ছাড়তে হয়েছে তাকে। এখন দুই সন্তানকে নিয়ে তার ঠিকানা খুলনা-মোংলা রেললাইনের পাশে খোলা আকাশের নিচে।

 

বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার সন্তোষপুর গ্রামের এই নারী এখন একটি অসম্পূর্ণ বাঁশের কাঠামোর সামনে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেন। কয়েক মাস ধরে কাঠামোটি দাঁড়িয়ে আছে। নেই টিনের ছাউনি, নেই বেড়া, নেই দরজা। প্রখর রোদ, বৃষ্টি আর ঝড়ের মধ্যেই দুই সন্তানকে নিয়ে দিন কাটছে তার।

রেহানার মাথায় এখন চুল নেই। মাথার ওপর নেই নিরাপদ আশ্রয়ও।

তার এই করুণ পরিণতি শুধু একজন দরিদ্র নারীর ব্যক্তিগত সংকট নয়; এটি সামাজিক নিরাপত্তা ও সরকারি আবাসন সহায়তার বাস্তব চিত্র নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন—একজন অসহায় মা যখন ঘরের ভাড়া দিতে নিজের চুল বিক্রি করতে বাধ্য হন, তখন রাষ্ট্রীয় সহায়তার আওতায় তার মতো মানুষদের অবস্থান কোথায়?

চুল বিক্রির টাকাতেও রক্ষা হয়নি আশ্রয়

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রেহানা দীর্ঘদিন দুই সন্তানকে নিয়ে একটি ভাড়া ঝুপড়ি ঘরে থাকতেন। অভাবের সংসারে নিয়মিত ভাড়া পরিশোধ করা তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না। একপর্যায়ে বাড়ির ভাড়া বকেয়া পড়ে যায়।

ঘরটি ধরে রাখতে শেষ সম্বল হিসেবে নিজের মাথার চুল বিক্রি করেন তিনি। পান মাত্র ৫০০ টাকা। সেই টাকা দিয়ে ভাড়া পরিশোধের চেষ্টা করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঘরটি ধরে রাখতে পারেননি।

স্থানীয় বাসিন্দা ফেরদৌসী বেগম বলেন, “একদিন দেখি রেহানার মাথায় চুল নেই। জানতে চাইলে কান্না করে বলেছে, ঘরের ৫০০ টাকা ভাড়া দেওয়ার জন্য চুল বিক্রি করেছে। কথাটা শুনে আমাদের খুব কষ্ট হয়েছে।”

সরকারি জমিতে বাঁশের ঘর, কিন্তু ছাউনি নেই

সরেজমিনে সন্তোষপুর গ্রামের প্রবেশমুখে গিয়ে দেখা যায়, রেললাইনের পাশে সরকারি জমিতে বাঁশ দিয়ে একটি ঘরের কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। স্থানীয়দের সহায়তায় কোনোভাবে কাঠামোটি দাঁড় করানো হলেও অর্থের অভাবে নির্মাণকাজ আর এগোয়নি। এই কাঠামোটিই এখন রেহানার স্বপ্নের ঘর।

কিন্তু একটি পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় টিন, বেড়া, দরজা ও অন্যান্য সামগ্রী কেনার সামর্থ্য তার নেই। ফলে ঘর না হয়েও যেন ঘরের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে বাঁশের কয়েকটি খুঁটি। বৃষ্টি নামলে কোথায় আশ্রয় নেবেন—এই প্রশ্নের উত্তরও জানেন না রেহানা।

‘দুই সন্তানের মুখের দিকে তাকাতে পারি না’

কান্নাজড়িত কণ্ঠে রেহানা খাতুন বলেন, “দুই সন্তানের মুখের দিকে তাকাতে পারি না। ঘর নাই, খাওয়ার কষ্ট আছে। নিরুপায় হয়ে চুল বিক্রি করছি। আমি সরকারের কাছে সাহায্য চাই।”

তার কণ্ঠে শুধু অর্থের অভাবের কথা নেই; আছে নিরাপদ আশ্রয়ের আকুতি, সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় এবং একজন মায়ের অসহায়ত্ব।

তার স্বপ্নও খুব ছোট—একটি টিনের ঘর। যেখানে সন্তান দুটিকে নিয়ে বৃষ্টির রাতে ভিজতে হবে না। ঝড় এলে ঘর হারানোর ভয় থাকবে না। রাতে সন্তানদের বুকের কাছে নিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারবেন।

প্রশ্ন উঠছে—আবাসন প্রকল্পের সুবিধা পৌঁছায় না কেন?

দেশে ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের জন্য সরকারি আবাসন ও পুনর্বাসন কর্মসূচি রয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায়ও অসহায় মানুষের সহায়তার ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু রেহানার মতো বাস্তব সংকটে থাকা পরিবারগুলো এসব সুবিধার আওতায় এসেছে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, রেহানার পারিবারিক ও আর্থিক অবস্থা যাচাই করে তাকে দ্রুত সরকারি আবাসন প্রকল্পের আওতায় আনা সম্ভব। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে জরুরি ভিত্তিতে খাদ্য ও অন্যান্য সহায়তাও দেওয়া দরকার।

স্থানীয় প্রবীণ আবু তালেব শেখ বলেন, “রেহানার অবস্থা খুবই করুণ। সরকারের কাছে আবেদন করব, যেন দ্রুত তাকে একটি ঘরের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়।”

বাঁশের কাঠামো প্রস্তুত, দরকার শুধু সামান্য সহায়তা

স্থানীয় বাসিন্দা মহিদুল ইসলাম বলেন, “বাঁশের কাঠামো তৈরি আছে। এখন টিন ও বেড়ার ব্যবস্থা করতে পারলেই একটি ঘর দাঁড় করানো সম্ভব। এলাকার স্বচ্ছল মানুষ ও প্রশাসন এগিয়ে এলে খুব বেশি সময় লাগবে না।”

অর্থাৎ, রেহানার জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় তৈরিতে হয়তো বিশাল কোনো প্রকল্পের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধু একটি পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর মতো মানবিক উদ্যোগ।

একজন মায়ের চুলের মূল্য কি মাত্র ৫০০ টাকা?

রেহানার গল্পের সবচেয়ে নির্মম জায়গাটি এখানেই।

একজন মা নিজের সন্তানদের মাথার ওপর ছাদ ধরে রাখতে নিজের চুল বিক্রি করেছেন। কিন্তু সেই ত্যাগও তাকে নিরাপদ আশ্রয় দিতে পারেনি।

আজ তার মাথায় চুল নেই, মাথার ওপর ছাদও নেই। আছে শুধু দুই সন্তান আর একটি অসম্পূর্ণ বাঁশের কাঠামো।

এই দৃশ্যের সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে—৫০০ টাকা জোগাড় করতে যে মা নিজের চুল বিক্রি করতে বাধ্য হন, তার কাছে রাষ্ট্রীয় সহায়তার দরজা পৌঁছাতে আর কতটা দেরি হবে?

রেহানার প্রয়োজন কোনো বিলাসবহুল বাড়ি নয়। তার প্রয়োজন মাত্র কয়েক বান টিন, কিছু বেড়া আর একটি নিরাপদ দরজা।

কিন্তু সেই সামান্য আশ্রয়টুকুর জন্যই তাকে প্রতিদিন লড়তে হচ্ছে।

দুই সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে রেহানা এখনো স্বপ্ন দেখেন—একদিন তাদের মাথার ওপর একটি ছাদ হবে।

সেই ছাদ হয়তো তার কাছে শুধু একটি ঘর নয়; এটি হবে তার সন্তানের নিরাপত্তা, একজন মায়ের মর্যাদা এবং দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে তার দীর্ঘ লড়াইয়ের প্রথম বিজয়।

Spread the love

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

আর্কাইভ

October 2026
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031