মোরেলগঞ্জ নিত্যপণ্যের লাগামহীন দাম চাপে পড়েছে ৯ উপজেলার মানুষ

প্রকাশিত: ৫:০৯ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬

মোরেলগঞ্জ নিত্যপণ্যের লাগামহীন দাম চাপে পড়েছে ৯ উপজেলার মানুষ

প্রতিনিধি / মোরেলগঞ্জ ::

 

আয় বাড়েনি, অথচ প্রতিদিনের বাজার খরচ বেড়েই চলেছে। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, পেঁয়াজ, রসুন, আলু, ডিম, মাছ-মাংস থেকে শুরু করে সব ধরনের সবজির বাড়তি দামে চাপে পড়েছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সুন্দরবন উপকূলের সাধারণ মানুষের জীবন। বিশেষ করে বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জসহ জেলার ৯ উপজেলার নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে এখন প্রতিদিনের বাজারে হিসাব কষে পণ্য কিনতে হচ্ছে। প্রয়োজনীয় পণ্যের পরিমাণ কমিয়ে অনেক পরিবার কোনোরকমে সংসারের ব্যয় সামলাচ্ছে।

 

সরেজমিনে উপকূলীয় এলাকার কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সকাল থেকেই নিত্যপণ্য কিনতে ক্রেতাদের ভিড় থাকলেও আগের মতো স্বাভাবিক কেনাকাটা নেই। অনেকেই এক কেজির বদলে আধা কেজি পণ্য কিনছেন। কেউ সপ্তাহের বাজার একবারে না করে দুই-তিন দফায় করছেন। আবার প্রয়োজন থাকলেও দামের কারণে মাছ-মাংস কিংবা তুলনামূলক দামি সবজি কেনা থেকে বিরত থাকছেন অনেকে।

 

ক্রেতাদের অভিযোগ, একই পণ্যের দাম দোকানভেদে ভিন্ন। আবার কয়েক দিন পরপরই কোনো কোনো পণ্যের দাম পরিবর্তন হচ্ছে। ফলে নির্দিষ্ট বাজেট নিয়ে বাজারে এসেও প্রয়োজনীয় পণ্য কিনে ঘরে ফেরা কঠিন হয়ে পড়েছে।

 

‘আগের টাকায় এখন প্রয়োজনীয় জিনিসও মেলে না’

মোরেলগঞ্জ উপজেলার এক মধ্যবিত্ত চাকরিজীবী ‘জাহাঙ্গীর’ (ছদ্মনাম) বলেন, “মাসের শুরুতে বাজারের জন্য যে টাকা রাখি, মাস শেষ হওয়ার আগেই তা শেষ হয়ে যায়। আগে যে টাকায় কয়েক দিনের বাজার করা যেত, এখন একই টাকায় প্রয়োজনীয় জিনিসও ঠিকমতো কেনা যায় না।”

 

নিম্নআয়ের শ্রমজীবী ‘আবদুল হক’ (ছদ্মনাম) বলেন, “দিনে যা আয় করি, তার বড় অংশই বাজার খরচে চলে যায়। চাল-ডাল, তেল আর সবজির দাম দিতে গিয়ে মাছ-মাংস তো দূরের কথা, অনেক সময় প্রয়োজনীয় অন্য জিনিসও বাদ দিতে হয়।”

 

এক গৃহিণী ‘শাহানা’ (ছদ্মনাম) বলেন, “সংসারের বাজেট ঠিক রাখতে বাধ্য হয়ে অনেক পণ্য কম কিনছি। আগে সন্তানদের জন্য কিছু বাড়তি খাবার কিনতাম, এখন দাম দেখে অনেক কিছুই বাদ দিতে হয়।”

 

বিক্রি কমেছে, চাপে ছোট ব্যবসায়ীরাও

বাজিতপুর পৌর বাজারের এক মুদি দোকানের বিক্রেতা ‘রহিম’ (ছদ্মনাম) বলেন, “আমরা ইচ্ছা করে দাম বাড়াই না। পাইকারি বাজার থেকে যে দামে মাল কিনি, তার সঙ্গে পরিবহন ও অন্যান্য খরচ যোগ করে বিক্রি করতে হয়। পাইকারিতে দাম বাড়লে খুচরা বাজারেও তার প্রভাব পড়ে।”

 

মোরেলগঞ্জের এক খুচরা বিক্রেতা ‘করিম’ (ছদ্মনাম) বলেন, “আগে যে পরিমাণ পণ্য বিক্রি হতো, এখন অনেক ক্রেতাই পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন। দাম বাড়ার কারণে বিক্রিও কমেছে। এতে ক্রেতা যেমন সমস্যায় আছেন, ছোট ব্যবসায়ীরাও চাপের মধ্যে আছেন।”

 

একই উপজেলার এক পাইকারি ব্যবসায়ী ‘সেলিম’ (ছদ্মনাম) বলেন, “বিভিন্ন পণ্য স্থানীয় বাজারে আসে বাইরের জেলা ও মোকাম থেকে। সেখানে পরিবহন ব্যয়, শ্রমিক খরচসহ অন্যান্য ব্যয় বেড়েছে। সরবরাহ কমে গেলে বা মোকামে দাম বাড়লে এখানেও তার প্রভাব পড়ে।”

 

শুধু সরবরাহ ব্যয়ই কি দায়ী?

বাজারসংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ মনে করেন, শুধু পরিবহন বা সরবরাহ ব্যয় বৃদ্ধিই সব পণ্যের দাম বাড়ার একমাত্র কারণ নয়। কোনো কোনো পণ্যের ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগী, অতিরিক্ত মুনাফা এবং দুর্বল বাজার তদারকিও মূল্যবৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।

 

তাদের মতে, পাইকারি ও খুচরা বাজারে পণ্যের ক্রয়মূল্য, বিক্রয়মূল্য, সরবরাহ ও মজুত পরিস্থিতির মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না—তা নিয়মিত যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাজারে মূল্যতালিকা প্রদর্শন ও অতিরিক্ত মুনাফার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভোক্তারা।

 

নজরদারি জোরদারের দাবি

স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, বাজারে নিয়মিত মূল্যতালিকা প্রদর্শন, পণ্যের ক্রয়মূল্য যাচাই এবং অতিরিক্ত মুনাফার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে সাধারণ ভোক্তাদের দুর্ভোগ কমবে না।

 

তাদের মতে, উপজেলা প্রশাসন, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট বাজার মনিটরিং কর্তৃপক্ষের সমন্বিত তদারকি বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে পণ্যের মূল্য, সরবরাহব্যবস্থা এবং মজুত পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।

 

প্রশাসনের নজরদারির আশ্বাস

উপজেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, কৃত্রিম সংকট বা অতিরিক্ত মুনাফার অভিযোগ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় নজরদারি অব্যাহত রাখার কথাও জানান তিনি।

 

তবে উপকূলের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, শুধু আশ্বাস নয়—বাজারে নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় রাখতে নিয়মিত অভিযান, মূল্যতালিকা যাচাই, সরবরাহব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হবে।

 

কারণ, বাজারের বাড়তি খরচের চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ছে সেই মানুষটির ওপর—যার আয় বাড়েনি, কিন্তু প্রতিদিনের সংসার খরচ বেড়েই চলেছে।

Spread the love

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

আর্কাইভ

September 2026
M T W T F S S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930