সিলেট ২৮শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৩ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৮:২২ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬
লন্ডন বাংলা ডেস্ক ::
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক নেই এবং এজন্য বর্তমান সরকার, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দায়ী বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম।
তিনি বলেন,‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার দায়িত্ব পালনে অলরেডি ব্যর্থ হয়েছেন। আমরা মনে করি, দ্রুত দেশে আইনশৃঙ্খলার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হলে সেটা এই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দায়িত্বে রেখে সম্ভব নয়।’
আজ সোমবার দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ঢাকায় এনসিপির জরুরি বৈঠকের পর আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘এই সরকার বলেছিল নির্বাচিত সরকার এলে দেশে মব থেমে যাবে, আইন-শৃঙ্খলার পরিবেশ ঠিক থাকবে। আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি, বিএনপি সরকার নির্বাচিত হয়ে আসার পরে আইনশৃঙ্খলার পরিবেশের আরও বেশি অবনতি হয়েছে।’
সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির আহ্বায়ক অভিযোগ করে বলেন, ‘রাড্ডা সেন্টারের ঘটনায় বিএনপির সংরক্ষিত আসনের একজন সংসদ সদস্যের নাম এসেছে। এ ঘটনায় সরকারি ইন্ধন, রাষ্ট্রীয় মদদ ও দলীয় নেতা-কর্মীদের প্রত্যক্ষ মদদ ছিল। সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার ঘটনাটিতেও প্রশাসন নিষ্ক্রিয় থেকেছে। এখন সেখানে ভিকটিম ব্লেমিং (ভুক্তভোগীকেই দোষারোপ) করা হচ্ছে। এ দুটি ঘটনা হয়তো সামনে এসেছে, কিন্তু সারাদেশের পরিস্থিতি এ রকমই। বিএনপি দলীয় নেতা-কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। সারাদেশে একধরনের নৈরাজ্য, দেশে কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আছে বলে মনে হচ্ছে না।’
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যিনি আছেন, তিনি বিভিন্ন সময় অসংলগ্ন কথা বলছেন। তিনি তার দায়িত্ব পালনে অলরেডি ব্যর্থ হয়েছেন। আমরা দেখেছি সংস্কার ইস্যুতেও তিনি জাতির সাথে প্রতারণামূলক কথা বলেছেন। এবং আইনশৃঙ্খলা পরিবেশ ইস্যুতেও যখন সংসদে তাকে প্রশ্ন করা হতো, তাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হত, তিনি তখন এটা পল্টনের বক্তব্য, এটা রাজপথের বক্তব্য—এরকম নানা কিছু বলে কিন্তু তিনি কথা এড়িয়ে যেতেন এবং এক ধরনের বিশৃঙ্খলা করার চেষ্টা করতেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘তো আজকেও কিন্তু পুরো জনগণের সামনে স্পষ্ট যে, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিবেশ আসলে ঠিক নেই এবং এটার জন্য বর্তমান সরকার, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তারা দায়ী। আমরা মনে করি দ্রুত দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হলে—এটা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দায়িত্বে রেখে এটা সম্ভব নয়।’
এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, ‘আওয়ামী লীগ (এখন কার্যক্রম নিষিদ্ধ) শাসনামলের মতো বিএনপির আমলেও সরকারি চাকরির প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক ও দলভিত্তিক করে ফেলা হচ্ছে। সম্প্রতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগে প্রায় আড়াই হাজার চাকরিপ্রার্থীকে বাদ দেওয়া হয়েছে, যাদের বেশির ভাগেরই কোনো ধরনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, সন্ত্রাসী সংগঠন বা রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রম—এ ধরনের কোনো সুস্পষ্ট তথ্যপ্রমাণ নেই। পরে সবার প্রতিবাদের মুখে শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, তাদের পর্যায়ক্রমে আবার নেওয়া হবে। কোনো প্রার্থী যোগ্য হলে, তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী বা রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রমের অভিযোগ না থাকলে, ভেরিফিকেশনের নামে এই হয়রানি থেকে সরকারকে সরে আসতে হবে।’
চাকরিপ্রার্থীদের পাশে জাতীয় নাগরিক পার্টি আছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যদি একজন চাকরিপ্রার্থীকে অন্যায়ভাবে এই চাকরি প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়া হয়, আমরা তার জন্য লড়ব, আমরা তার জন্য কথা বলব, আমরা তার জন্য আন্দোলনে যাব, প্রয়োজনে মাঠে থাকব। এনসিপির কার্যালয়, অফিস তাদের জন্য খোলা আছে। আমরা সবাইকে বলব, যদি আপনারা কেউ মনে করেন আপনাদের অন্যায়ভাবে বাদ দেওয়া হচ্ছে এবং সেরকম তথ্য-প্রমাণ যদি আপনারা দেখাতে পারেন, জনগণের সামনে, ইনশাআল্লাহ আমরা আপনাদের সঙ্গে থাকব।’
সম্প্রতি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভাষণে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা উঠে আসেনি বলে অভিযোগ করেছেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘সেখানে তিনি (তারেক রহমান) তার দলীয় যে ইশতেহার, যে এজেন্ডা, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড—এই ধরনের অনেকগুলা কিছু বলেছেন, যেটা অলরেডি এই প্রকল্পগুলো দেশে ব্যর্থ বলেই প্রমাণিত হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে দারিদ্র্য দূরীকরণের কথা ছিল, কর্মসংস্থানের কথা ছিল—এগুলা কিছুই হয়নি। ফ্যামিলি কার্ডের নামে হরিলুট হয়েছে, ফ্যামিলি কার্ডের নামে দলীয় লোকরা ফ্যামিলি কার্ড পাচ্ছে। যত ধরনের কার্ড হয়েছে, এগুলো সব দলীয় কার্ডে পরিণত হয়েছে। যাই হোক, এটা আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় ছিল, এটা আমরা দেশে সমালোচনা করি। কিন্তু এটা তো আর বিশ্বমঞ্চে বলার কিছু নয়।’
এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, ‘আমাদের বিশ্বমঞ্চে যে বলার বিষয়গুলো ছিল, উনি একটাও ঠিকমতো অ্যাড্রেস করেন নাই। আমাদের এই মুহূর্তে জ্বালানি সংকট চলতেছে এবং এটার জন্য উনারাই বলেন যে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট বা যুদ্ধটা দায়ী। আমরা যে জ্বালানি পাচ্ছি না, একটা উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমাদের যে সাফার করতে হচ্ছে, তাহলে সেই বিষয়টায় উনি ঠিকমতো তুলে ধরেন নাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘সেখান থেকে বাংলাদেশ কীভাবে পরিত্রাণ পেতে পারে এবং আন্তর্জাতিক মহল যাতে এটাতে উদ্যোগ নেয়, যাতে পারস্য উপসাগর থেকে জাহাজগুলো আসতে পারে বাংলাদেশের, আমরা যাতে জ্বালানি পাই—সে বিষয়ে উনি কিন্তু আন্তর্জাতিক মণ্ডলে সবার সাথে তুলে ধরতে পারেননি।’
স্থানীয় সরকার নির্বাচন দ্রুত করার দাবি জানান নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমরা স্পষ্টভাবে বলব, যদি ন্যূনতম আশঙ্কা তৈরি হয় যে এই নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না, নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিং করার চেষ্টা করা হবে, তাহলে আমরা জাতীয় নির্বাচনের মতো দেশের স্থিতিশীলতার কথা ভেবে বসে থাকব না।’
সংবিধান সংশোধনে বিএনপি সরকারের করা বিশেষ কমিটিকে ‘সংস্কারবিরোধী কমিটি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘সংশোধনের নামে সংস্কারের আকাঙ্ক্ষাকে ধূলিসাৎ করার একটা চেষ্টা হচ্ছে এই কমিটি। আমরা রাষ্ট্রের কসমেটিক সার্জারি চাই না, মৌলিক সংস্কার চাই। সংস্কার প্রক্রিয়াকে এড়ানোর জন্য সংশোধন শব্দটি নিয়ে আসা হয়েছে। আমরা বলেছি, সংবিধান সংস্কার পরিষদ ছাড়া সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তন এবং জনগণের সার্বভৌম অভিপ্রায় বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না।’
নাহিদ বলেন, সংশোধন কমিটির নামে সরকার সময়ক্ষেপণ করছে। একটা নাটক মঞ্চায়ন করা হচ্ছে, যাতে কিছু করতে না হয়। তিনি দ্রুত সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভা আহ্বান করার দাবি জানান।
বর্তমান সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে পাস হওয়া মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ আইনকে ‘গণবিরোধী’ বলেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘জনগণের কথা বলার অধিকারকে সংকুচিত করার জন্যই এ ধরনের আইনি প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।’
সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির সর্বোচ্চ পরিষদ রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।