সিন্দুকভর্তি সোনার ঠাঁই হচ্ছে বিবির লকারে

প্রকাশিত: ২:৫৭ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৮, ২০২১

সিন্দুকভর্তি সোনার ঠাঁই হচ্ছে বিবির লকারে

লন্ডন বাংলা ডেস্কঃঃ

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পণ্যাগারে জমা ১৫ মণ সোনার একটা গতি হলো অবশেষে। আনুমানিক ৪০০ কোটি টাকা মূল্যের এ মূল্যবান ধাতবগুলোকে যথা গন্তব্যে অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংকের (বিবি) ভল্টে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ৫০টি সিন্দুকে ভর্তির পর সিলগালা করে এগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পাঠানো হচ্ছে। ইতোমধ্যে দুই দফায় সিন্দুকে ঢুকেছে ৭১৫ কেজি স্বর্ণ।

 

গত বৃহস্পতিবার প্রথম চালানে শাহজালালের শুল্কগুদাম থেকে কড়া নিরাপত্তায় বিবির ভোল্টে পাঠানো হয় ৪১৭ কেজি স্বর্ণবার ও স্বর্ণালঙ্কার। আর গতকাল বুধবার ওই গুদাম থেকে বিবির ভোল্টে স্থানান্তর করা হয় ২৯৮ কেজি স্বর্ণ।শুল্ক বিভাগ কর্তৃক বিভিন্ন সময় জব্দকৃত ১৫ মণ স্বর্ণ বছরের পর বছর পড়ে ছিল বিমানবন্দরের আন্তর্জাতিক পণ্যাগারে। গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর ‘কাস্টমসের গলার কাঁটা ১৫ মণ স্বর্ণ’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয় আমাদের সময়ে।

 

এর পর নড়েচড়ে বসে কর্তৃপক্ষ। ঢাকা কাস্টমস হাউসের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত এক সভায় দ্রুত সময়ের মধ্যে স্বর্ণগুলো স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কাস্টমস ও অন্যান্য সংস্থা কর্তৃক আটককৃত স্বর্ণ, স্বর্ণালঙ্কার, স্বর্ণপি-সহ অন্যান্য মূল্যবান ধাতু এবং মুদ্রা বাংলাদেশ ব্যাংকে স্থায়ী-অস্থায়ীভাবে জমাকরণ পদ্ধতি নির্দিষ্টকরণ ও ট্রেজারি রুলস সংশোধনের সুপারিশ প্রণয়নের লক্ষ্যে গঠিত কমিটি এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। স্বর্ণ জমাদান সংক্রান্ত কাস্টমসের একজন সহকারী কমিশনারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করা হয় সে দিন।

 

ঢাকা কাস্টম হাউসের কমিশনার মো. মোয়াজ্জেম হোসেন গতকাল আমাদের সময়কে বলেন, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পণ্যাগারে জমা থাকা ১৫ মণ স্বর্ণের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার অবসান হয়েছে। দুটি চালানে ৪১৭ কেজি স্বর্ণ বাংলাদেশ ব্যাংকের ভোল্টো জমা দিয়েছি। বাকিগুলো দ্রুত সময়ের মধ্যে ভোল্টে স্থানান্তর করা হবে।ঢাকা কাস্টম হাউসের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কাস্টম হাউসে পরিত্যক্ত অবস্থায় আটক ও জব্দ করা স্বর্ণবার বা স্বর্ণালঙ্কার বাংলাদেশ ব্যাংক জমা নেয়।

 

কিন্তু ব্যক্তি ও যাত্রীর সঙ্গে থাকা অবস্থায় স্বর্ণ বা স্বর্ণালঙ্কার জব্দের পর ফৌজদারি মামলা করা হলে সেগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক জমা নিত না এতদিন। বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘স্থায়ী/অস্থায়ীভাবে জমাকরণ পদ্ধতি নির্দিষ্টকরণ ও ট্রেজারি রুলস’ অনুযায়ী অন্য সংস্থার শুধু পরিত্যক্ত মূল্যবান ধাতু, মুদ্রা জমা নিয়ে থাকে।

 

এ নিয়মের কারণে ফৌজদারি মামলায় জব্দ করা ১৫ মণ স্বর্ণ রাষ্ট্রীয় কোষাগার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে নেওয়া হয়নি এতদিন। গত ১৭ ডিসেম্বরের ওই বৈঠকের পর স্বর্ণগুলো জমা নেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত মেনে নেয় বিবি। যদিও স্বর্ণ জমা নিতে শর্ত জুড়ে দিয়ে বিবি বলে, কাস্টমস কর্তৃপক্ষ নিজ দায়িত্বে রিসিডের মাধ্যমে স্বর্ণ জমা দিয়ে সেগুলো প্রয়োজন মতো তারাই আবার যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সিলগালা সিন্দুক থেকে স্বর্ণ গ্রহণ করবে। এ ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করবে না বিবি কর্তৃপক্ষ।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পরিত্যক্ত বা মালিকবিহীন অবস্থায় জব্দ করা স্বর্ণালঙ্কার বাংলাদেশ ব্যাংকে স্থায়ীভাবে জমা হয়। পরে সেসব স্বর্ণ নিলামে বিক্রি হয়ে থাকে। কিন্তু বিভিন্ন সময় কাস্টমস এলাকায় ব্যক্তি ও বিদেশে যাতায়াতকারী যাত্রীর কাছ থেকে স্বর্ণ বা স্বর্ণালঙ্কার জব্দের ঘটনায় করা মামলা তদন্ত ও বিচারে দীর্ঘসূত্রতা হয়। এতে ফৌজদারি মামলার বিচারকালে বিভিন্ন সময় বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে স্বর্ণের নমুনা সংগ্রহ করে আদালতে দাখিল, আবার আদালতের কার্যক্রম শেষে এ নমুনা বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিতে হয়। এ সময়ে স্বর্ণ বা স্বর্ণালঙ্কারে নয়-ছয়ের আশঙ্কা থাকে।

 

যে কারণে ফৌজদারি মামলার কারণে জব্দ করা স্বর্ণালঙ্কার ২০১৮ সাল থেকে গ্রহণ বন্ধ রাখে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের এক অনুসন্ধানে ২০১৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিরাপদ ভল্টে গচ্ছিত সোনা নিয়ে গরমিলের অভিযোগ ওঠে। এর পর থেকে জব্দ সোনা জমা নিতে নতুন শর্তারোপ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু নতুন নিয়মে সোনা জমা দিতে রাজি হচ্ছিল না সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তর এ রকম একটি তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করে। তখন জমা করা সোনা রসিদের সঙ্গে মিলিয়ে পরীক্ষা করা হয়। এ সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে রাখা সোনায় বেশকিছু গরমিল খুঁজে পায় নিরীক্ষক দল।

 

যা প্রতিবেদন আকারে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে পাঠায়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০ থেকে ২৪ ক্যারেটের ৯৬০ কেজি স্বর্ণালঙ্কার ও স্বর্ণবারের অধিকাংশেরই ক্যারেটে তারতম্য রয়েছে। শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ২০ থেকে ২৪ ক্যারেটের স্বর্ণ বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে গচ্ছিত রাখা হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে নিরীক্ষক দল দেখতে পায় সেগুলো ১৮ ক্যারেট হয়ে গেছে। অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে আশঙ্কা করে বলা হয়, উচ্চ ক্যারেটের স্বর্ণ সরিয়ে সেখানে নিম্ন ক্যারেটের স্বর্ণ গচ্ছিত রাখা হয়েছে। এতে সরকারের প্রায় ২ কোটি টাকা ক্ষতির আশঙ্কা করা হয় প্রতিবেদনে।

Spread the love

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

আর্কাইভ

December 2025
M T W T F S S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031