ঢাকা বরিশাল রুটের নতুন আলো : অত্যাধুনিক লঞ্চ সুন্দরবন

প্রকাশিত: ৪:৫৩ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৭, ২০২২

ঢাকা বরিশাল রুটের নতুন আলো : অত্যাধুনিক লঞ্চ সুন্দরবন
Spread the love

৩৪ Views

প্রতিনিধি/বরিশালঃঃ

পদ্মা সেতু চালুর পর থেকেই লঞ্চ ব্যবসা বন্ধ হবার উপক্রম হয়েছে বলে আহাজারি করেছেন বেশিরভাগ লঞ্চ মালিক। এসময় যাত্রী ধরে রাখতে ভাড়া কমানো ও তিনটি মাত্র লঞ্চ সিডিউল তৈরি ইত্যাদি পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দকে। যদিও তখন বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তারা বলেছেন এটি লঞ্চ মালিকদের একটা কৌশল। আর সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলেছেন সরকারের ট্যাক্স ফাঁকির নতুন ফন্দি লঞ্চ মালিকদের।

 

 

তবে তখনও কয়েকজন মালিক জোর গলায় বলেছেন, লঞ্চের চাহিদা আরো বাড়বে। সুন্দরবন নেভিগেশন কোম্পানির চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান রিন্টু ও সুরভী শিপিং এর পরিচালক রেজিন উল কবির ছিলেন এই দাবীর পক্ষে জোরালো বক্তা। গত কিছুদিন আগে অর্থাৎ নভেম্বরের প্রথমদিকেও বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে শিরোনাম হয়েছে – যাত্রী সংকটের কারণে লঞ্চ ব্যবসায় ধ্বস। ঐ সময় লঞ্চের স্টাফরা জানান, বর্তমান ঢাকা-বরিশাল রুটে পারাবত কোম্পানির লঞ্চগুলো একটা নিয়মে চলছে, আর সুরভী-সুন্দরবন, অ্যাডভেঞ্চার, মানামী, কীর্তনখোলা কোম্পানির লঞ্চগুলো আরেক নিয়মে চলছে।

 

 

এর মধ্যে পারাবত কোম্পানি যাত্রীর চাপ বুঝে ভাড়া কম-বেশি করছে। আর অন্য কোম্পানিগুলোর বড় লঞ্চ ডেকে যাত্রীপ্রতি ভাড়া নিচ্ছে ২০০ টাকা এবং ছোট লঞ্চ যাত্রীপ্রতি ডেকে ভাড়া নিচ্ছে ১৫০ টাকা। কিন্তু এ রুটে সরকার নির্ধারিত ডেক ভাড়া ৩৫২ টাকা। আর ১২০০ থেকে ১৩০০ টাকার এসি ও নন এসি সিঙ্গেল কেবিনের ভাড়া নেয়া হচ্ছে ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা। দুই হাজার ৪০০ টাকার ডাবল কেবিন এক হাজার ৮০০ থেকে দুই হাজার টাকা নেওয়া হচ্ছে। ৭০০ টাকার সোফার ভাড়া কমে হয়েছে ৬০০ টাকা। তারপরও কেবিনে যাত্রী না পেয়ে বেশিরভাগ সিঙ্গেল কেবিনে একজন যাত্রীর সঙ্গে আরেকজন যাত্রীর ভাড়া ফ্রি করে দেওয়া হচ্ছে। ফলে এক সিঙ্গেল কেবিনে দু’জন যাতায়াত করতে পারছেন।

 

 

আবার ডাবল কেবিনে দু’জনের অধিক যাত্রী থাকলে, তাদের ডেকের ভাড়াও মওকুফ করে দেওয়া হচ্ছে। নভেম্বরের ৩ তারিখে সুন্দরবন নেভিগেশন কোম্পানির ম্যানেজার জাকির হোসেন বলেছেন, আগের থেকে ডেকের যাত্রী বাড়লেও কেবিনের তেমন একটা চাপ এখনও তৈরি হয়নি। এখন সব কোম্পানি প্রায় একই নিয়মে ভাড়া কমিয়ে লঞ্চ পরিচালনা করছে। এর সুফল পেতে আরও কিছুদিন সময় লাগবে বলে মনে করেন তিনি। এমন মন্দার বাজারে সুন্দরবন নেভিগেশন কোম্পানি অত্যাধুনিক ও চারতলা বিশিষ্ট নতুন লঞ্চ ভাসিয়েছে আবার।

 

 

যার নির্মাণ ব্যায়ে খরচ হয়েছে প্রায় ২৫ কোটি টাকা। বলা হচ্ছে, এটিই এখন দেশের সর্ববৃহৎ ও আধুনিক সুযোগ সুবিধা নিয়ে তৈরি লঞ্চ। যার সাজসজ্জা, দৃষ্টিনন্দন নির্মাণশৈলী ও প্রযুক্তির ব্যবহার, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ছাড়াও এই লঞ্চে রয়েছে হৃদরোগে আক্রান্তদের জন্য রয়েছে করোনারি কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ)। ওঠানামার জন্য আছে ক্যাপসুল লিফট। নিরাপত্তার জন্য সিসি ক্যামেরা, শিশুদের জন্য বিনোদন স্পেস, ফুডকোর্ট, ফার্মেসী, আধুনিক অগ্নিনির্বাপক এবং উন্মুক্ত ওয়াই-ফাইয়ের ব্যবস্থা। একজন কমান্ডারের নেতৃত্বে অন্তত ছয়জন সশস্ত্র আনসার সদস্য নিরাপত্তায় দায়িত্বে নিয়োজিত থাকবে।

 

 

ক্যাপসুল লিফটের ব্যবহার অন্যান্য লঞ্চ সুরভী, মানামী, প্রিন্স আওলাদেও রয়েছে। তবে এগুলোর ব্যবহারের অভিজ্ঞতা কোথাও সুখকর নয়। এমনকি বয়োবৃদ্ধ এক মায়ের অভিযোগ ছিলো – শত অনুরোধেও লিফট খোলেনি কর্তৃপক্ষ। সমুদ্রগামী বড় জাহাজের আদলে তৈরি সুন্দরবন ১৬ লঞ্চটিতে যাত্রীদের আকৃষ্ট করতে বিভিন্ন প্রলোভন দেখানো হচ্ছে। তবে আধুনিক জিপিএস সিস্টেম ও হাইড্রলিক পদ্ধতি এখনকার প্রায় সব বড় লঞ্চেই ব্যবহার হচ্ছে। ফলে এর রাডার ব্যবস্থা কুয়াশার মধ্যেও লঞ্চটিকে নিরাপদে চলতে সাহায্য করবে। বরিশাল-ঢাকা নৌপথে চালু হওয়া এই আধুনিক ও বিলাসবহুল চারতলা লঞ্চটি ছাড়াও সুন্দরবন নেভিগেশন কোম্পানির ঢাকা থেকে দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন নৌ-পথে আরো ৯টি লঞ্চ চলাচল করছে।

 

 

১৬ নভেম্বর বুধবার এ লঞ্চটি উদ্বোধন ও এর শুভযাত্রা উপলক্ষে বরিশাল লঞ্চ টার্মিনালে মিলাদ মাহফিল ও দোয়া মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। এই দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ, এতে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বরিশাল জেলা পরিষদের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান আলহাজ্ব এ্যাড,এ,কে,এম জাহাঙ্গীর, বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগ এর সাধারণ সম্পাদক ও বরিশাল ২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য, এ্যাড, তালুকদার মোঃ ইউনুস, সুন্দরবন নেভিগেশন গ্রুপ এর চেয়ারম্যান ও বরিশাল সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব সাইদুর রহমান রিন্টুসহ আরো অনেকে এসময় দোয়ায় অংশ নেন। সুন্দরবন নেভিগেশন কোম্পানির চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান রিন্টু বলেন, আগের লঞ্চগুলোর চেয়ে এটা আলাদা। আগে ডেকের যাত্রীদের বিষয়টি মাথায় রেখে লঞ্চ নির্মাণ করা হতো।

 

 

পদ্মাসেতু উদ্বোধনের ফলে ডেকের যাত্রী কমেছে। কিন্তু প্রথম শ্রেণির যাত্রী কমেনি। মূলত, প্রথম শ্রেণির যাত্রীদের কথা মাথায় রেখে কেবিন বাড়ানো হয়েছে। নতুন নতুন প্রযুক্তি সংযোজন করা হয়েছে। যাতে করে এক শ্রেণির যাত্রী সবসময় লঞ্চে যাতায়াত করেন। লঞ্চ আরো রাতে ছাড়া যায় কিনা সেটা নিয়েও ভাবা হচ্ছে বলে জানান রিন্টু। রাজধানী ঢাকার সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের যোগাযোগের পুরনো বাহন লঞ্চ। ঢাকা থেকে সারাদেশের ৪০টি রুটে প্রায় ৮০টি লঞ্চ চলাচল করে। তবে সবচেয়ে বড় লঞ্চগুলো চলে ঢাকা-বরিশাল রুটে। এ রুটে ১৯৮৯ সালের দিকে অ্যাটলাস সান, রাজহংস, দ্বীপরাজ ইত্যাদি ছোট ছোট লঞ্চ চলত। এরপর ৯০ তে সাগর নামে একটি বড় লঞ্চ এ পথে প্রথম চলাচল শুরু করে। একযুগ আগেও ছোট একটি লঞ্চ তৈরিতে ব্যয় হতো ছয়-সাত কোটি টাকা। এখন লঞ্চের আকার যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে বিনিয়োগের পরিমাণ।

 

 

নতুন করে লঞ্চ আনছে পারাবত, কীর্তনখোলা, সুন্দরবন, সুরভি, আগরপুর নেভিগেশনসহ আরো কয়েকটি কোম্পানি। তবে ২০১৬ সালে সুন্দরবন নেভিগেশন কোম্পানি প্রথম লিফটযুক্ত করে বিলাসবহুল লঞ্চ সুন্দরবন ১০ চালু করে। এর পরপরই মানামী আসে প্রথম অত্যাধুনিক লঞ্চের প্রতিযোগিতায়। এরপর সুরভী ৭ ও প্রিন্স আওলাদ। রাজধানীর সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের যোগাযোগের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী বাহন এই লঞ্চ। তাই নদী যতদিন বহমান আছে লঞ্চের প্রয়োজনীয়তাও ততদিন থাকবে বলে জানান এ ব্যবসার সাথে জড়িত ব্যক্তিবর্গ।

 

 

সুরভী শিপিং এর পরিচালক রেজিন উল কবির জানান, ঢাকা থেকে বিভিন্ন রুটে লঞ্চ চলাচল করলেও বড় ও বিলাসবহুল লঞ্চগুলো চলে ঢাকা-বরিশাল ও পটুয়াখালী, বরগুনা, ঝালকাঠি রুটে। সুরভী ১৯৬৪ সাল থেকে ১০/১২ ছোট লঞ্চ নিয়ে এ পথে যাত্রা শুরু করে। সে সময় আশির দশকের শেষদিকে এমভি সামাদ ছিলো প্রথম বড় লঞ্চ। ৮৮ বা ৮৯ সালের দিকে এই রুটে অ্যাটলাস সান, রাজহংস, দ্বীপরাজ এসব ছোট ছোট লঞ্চ যুক্ত হয়। এসময় সুরভী ও সাগর নামে দুটি বড় লঞ্চ এ পথে প্রথম চলাচল শুরু করে। এক দশক আগেও একটি লঞ্চ তৈরিতে ব্যয় হতো ছয় থেকে সাত কোটি টাকা। বর্তমানে লঞ্চের আকার যেমন বেড়েছে, বেড়েছে বিনিয়োগও। বর্তমানের বিলাসবহুল ও আধুনিক প্রযুক্তির বড় লঞ্চের পিছনে ব্যয় হয় প্রায় ২৫-৩০ কোটি টাকা।


Spread the love

Follow us

আর্কাইভ

November 2022
M T W T F S S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930