হরমুজ খুলতে ইরানের ক্ষতিপূরণ দাবির জবাবে যা বললেন ট্রাম্প

প্রকাশিত: ৩:৪৩ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১১, ২০২৬

হরমুজ খুলতে ইরানের ক্ষতিপূরণ দাবির জবাবে যা বললেন ট্রাম্প

আন্তর্জাতিক ডেস্ক :: 

 

হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে ইরানের শর্তের জবাবে এবার পাল্টা দাবি তুলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানকে যুদ্ধ, হামলা ও বিক্ষোভে নিহত ব্যক্তিদের জন্য ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি। ট্রাম্পের নতুন এই দাবি দুই দেশের মধ্যে সমঝোতার সম্ভাবনাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

সোমবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেন, গত ৫০ বছরে ইরানের কর্মকাণ্ডে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য তেহরানের কাছ থেকে অর্থ দাবি করা হবে। এতে বেসামরিক বিক্ষোভকারী ও ওই অঞ্চলে নিহত মার্কিন সেনাদের পরিবারের ক্ষতিপূরণও অন্তর্ভুক্ত থাকবে বলে জানান তিনি।

 

ট্রাম্প বলেন, ‘যদি ক্ষতিপূরণ দেওয়ার মতো ক্ষতি হয়ে থাকে, তাহলে আমার মনে হয় ইরানেরই সেই ক্ষতিপূরণ দেওয়া উচিত।’

এর আগে এমন দাবি তোলেননি ট্রাম্প। ইরানও এর আগে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার অন্যতম শর্ত হিসেবে ক্ষতিপূরণ এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছিল। তেহরানের এসব শর্ত মূলত জুনে স্বাক্ষরিত একটি প্রাথমিক শান্তিচুক্তির শর্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে পরবর্তী সময়ে সেই চুক্তি ভেঙে যায়।

 

ট্রাম্পের নতুন দাবির পর হরমুজ প্রণালি দ্রুত খুলে দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে অনিশ্চয়তা বেড়েছে। এর প্রভাবে সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রায় ৫ শতাংশ বেড়ে দিনের লেনদেন শেষ হয়েছে।

 

ইরানে নিহতের সংখ্যা নিয়ে ট্রাম্পের দাবি

২০২৫ সালের শেষ দিক ও ২০২৬ সালে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনের প্রসঙ্গ তুলে ট্রাম্প দাবি করেন, ছয় সপ্তাহ আগ পর্যন্ত ইরানে প্রায় ৫২ হাজার বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন।

 

তবে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের হিসাবের সঙ্গে এ সংখ্যা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) ফেব্রুয়ারিতে জানিয়েছিল, বিক্ষোভে প্রায় ৬ হাজার ৫০০ জনসহ মোট প্রায় ৭ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। যদিও ইরানের কিছু বিরোধী ও নির্বাসিত গোষ্ঠী নিহতের সংখ্যা কয়েক দশক হাজার বলে দাবি করেছে।

 

যুদ্ধ শুরুর পর ট্রাম্প ইরানের বিক্ষোভকারীদের সরকার উৎখাতের আহ্বান জানিয়েছিলেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, এরপরও ইরান সরকার বিরোধীদের ওপর দমন-পীড়ন অব্যাহত রেখেছে।

 

এ ছাড়া ২০০০ সালের অক্টোবরে ইয়েমেনে মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজ ইউএসএস কোল-এ হামলায় নিহত ১৭ মার্কিন নাবিকের পরিবারের জন্যও ইরানকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ট্রাম্প। তবে ওই হামলার জন্য ইরান নয়, আল-কায়েদাকে দায়ী করা হয়।

 

ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে আরও লিখেছেন, লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন ও গাজার মানুষের মৃত্যু ও ক্ষয়ক্ষতির জন্যও ইরানকে দায় নিতে হবে।

 

হরমুজ খুলতে ওমানের সঙ্গে সমঝোতার পথে ইরান

এর আগে ইরান জানিয়েছিল, হরমুজ প্রণালিতে নতুন নৌপথ নির্ধারণের বিষয়ে ওমানের সঙ্গে তারা একটি চূড়ান্ত চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছেছে। তবে তেহরান স্পষ্ট করেছে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলতে যুক্তরাষ্ট্রকে ক্ষতিপূরণ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং সামরিক হুমকি বন্ধসহ কয়েকটি শর্ত পূরণ করতে হবে।

 

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সোমবার জানান, ওমানের সঙ্গে আলোচনা ‘সুষ্ঠু ও গঠনমূলকভাবে’ এগোচ্ছে। নতুন নৌপথের মানচিত্র নিয়ে একটি সমঝোতা হয়েছে বলেও জানান তিনি। তবে কিছু কারিগরি বিষয় এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

 

আলোচনায় নিরাপদ নৌচলাচল, পরিবেশ সুরক্ষা, সামুদ্রিক পরিষেবা ও অপরাধ দমনের মতো বিষয়ও উঠে এসেছে বলে জানান বাঘাই। এসব সেবার জন্য সাধারণত অর্থ পরিশোধের প্রয়োজন হয়।

 

তবে হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশের জন্য ইরানকে কোনো ধরনের ফি নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে এমন কোনো চুক্তি যুক্তরাষ্ট্র মেনে নেবে না বলে মার্কিন কর্মকর্তারা বারবার জানিয়েছেন।

 

হরমুজ নিয়ে পাল্টাপাল্টি অবস্থান

বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ কার্যত বন্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম ও মূল্যস্ফীতির চাপ বেড়েছে।

 

হরমুজ প্রণালিতে কয়েক মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা এবং জুলাইয়ে দুই সপ্তাহের হামলা সত্ত্বেও ইরানের নিয়ন্ত্রণ ভাঙা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যেই ট্রাম্প সোমবার আবারও দাবি করেন, প্রণালিটি খোলা রয়েছে এবং বর্তমানে এর ওপর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে শুধু মার্কিন নৌবাহিনীর।

 

তবে বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে এই দাবির সঙ্গে ভিন্নমত রয়েছে। ইরান এরই মধ্যে বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।

 

জুনে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি হয়েছিল। কিন্তু জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জাহাজ চলাচলের ওপর ফের অবরোধ আরোপ করলে ইরান এটিকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যা দেয়।

 

এদিকে নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে থাকায় ট্রাম্পের ওপর যুদ্ধ শেষ করার চাপ বাড়ছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় জ্বালানির উচ্চমূল্য বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে। ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যান বিল কিটিং সিএনএনকে বলেন, পরিস্থিতি এখন ‘আত্মসমর্পণের শুরুর’ দিকে যাচ্ছে এবং বাস্তবতা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

 

হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা নিয়ে ইরান ও ওমানের আলোচনা এগোলেও ট্রাম্পের নতুন ক্ষতিপূরণের দাবি এবং দুই পক্ষের পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে চূড়ান্ত সমঝোতা এখনো অনিশ্চিত।

Spread the love

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

আর্কাইভ

August 2026
M T W T F S S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31