সিলেট ১২ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৮শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৭:৩৩ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১২, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক ::
চীনের অর্থনীতির দূরদর্শী সংস্কারক, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঝু রংজি মারা গেছেন। তার বয়স হয়েছিল ৯৭ বছর।
ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা বিবিসির খবরে বলা হয়, ঝু রংজি ১৯৯৮-২০০৩ সাল পর্যন্ত চীনের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদ অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি চীনকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) অন্তর্ভূক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এ ছাড়া চীনের কারখানাগুলো আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য উন্মুক্ত ও বিদেশি বিনিয়োগের জন্য আকৃষ্ট করেন।
তিনি একজন গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সংস্কারক, যিনি কর আদায়ের স্থানীয় ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে ন্যাস্ত করেছিলেন, ব্যর্থ হওয়া রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে বন্ধ ও বেসরকারিকরণ করেছিলেন এবং স্থানীয় মালিকানার ব্যাপারে উৎসাহিত করেছিলেন।
এসব পরিবর্তন ২০০০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে চীনের বার্ষিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশের ওপরে নিয়ে যায়। আর ২০০৭ সালে তা বেড়ে সর্বোচ্চ ১৪ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছায়।
ঝু কর্মকর্তাদের ব্যর্থতা ও দুর্নীতির সমালোচনা এবং সরকারের ব্যর্থতার দায় নিজে স্বীকার করে দেশটিতে ব্যাপক জনপ্রিয় ব্যক্তিতে পরিণত হন। কঠোর চাহিদাপূর্ণ কাজের শৈলী দেশটিতে তাকে ‘বস’ এবং ‘ঝু ফেংজি’ বা ‘পাগলা ঝু’ ডাকনাম এনে দিয়েছিল।
ঝু ১৯৯০-এর দশকে উপ-প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন চীনের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করে নিজের পরিচিতি তৈরি করেন। তিনি মূল্য নিয়ন্ত্রণ বিধি কার্যকর এবং লোকসানি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে ঋণ দেওয়া বন্ধ করে দেন। এ সময় স্থানীয় নেতাদের প্রতিরোধকে উপেক্ষা করেন তিনি। আর এই একই কৌশলে তিনি পরবর্তীতে সংস্কারের গতি নিয়ে রক্ষণশীলদের বিরুদ্ধে লড়াই করেন।
১৯৮০-এর দশকে শুরু হওয়া দীর্ঘ আলোচনার পর ডব্লিউটিওর সদস্যপদ নিশ্চিত করার চীনা প্রচেষ্টায় নেতৃত্ব দেন ঝু। বৈশ্বিক বাণিজ্য সংস্থায় চীনের অন্তর্ভূক্তির এই মর্যাদা মুক্ত বাণিজ্যকে দেশটিতে জাতীয় অঙ্গীকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে; যা পছন্দের প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুরক্ষা দেওয়া বন্ধে স্থানীয় কর্মকর্তাদের বাধ্য করার একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন ঝু।
১৯২৮ সালের ২৩ অক্টোবর মাও সেতুংয়ের নিজ প্রদেশ হুনানে জন্মগ্রহণকারী ঝু ঝুঁকি গ্রহণ এবং স্পষ্ট কথা বলার জন্য কর্মজীবনের শুরুতেই মাসুল গুনেছিলেন।
অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকারী হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করলেও ১৯৫৭ সালে হাঙ্গেরি ও যুগোস্লাভিয়ার সংস্কারের প্রশংসা করায় তাকে ‘ডানপন্থী’ তকমা দেওয়া হয়। এর ফলে তার ক্যারিয়ার ২২ বছরের জন্য স্থবির হয়ে পড়ে। ১৯৬৬-৭৬ সালের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় শারীরিক পরিশ্রম করার জন্য তাকে নির্বাসিত করা হয় গ্রামে। ১৯৭৯ সালে পুনর্বাসিত হয়ে দ্রুত পদোন্নতি পান ঝু। তিনি ১৯৮৭ সালে সাংহাইয়ের ডেপুটি পার্টি সেক্রেটারি এবং পরের বছর মেয়র হন। ১৯৮৯ সালে মেয়র থাকাকালীন বিক্ষোভকারীদের দমন এবং সামরিক বাহিনী না ডাকার অঙ্গীকার করে পরিমিতিবোধ ও সহনশীলতার খ্যাতি অর্জন করেন ঝু।
১৯৯১ সালের ‘দ্য প্রু-ডেমোক্রেসি প্রটেস্টস ইন চায়না: রিপোর্টস ফ্রম দ্য প্রভিন্সেস’ বইয়ে অস্ট্রেলীয় কূটনীতিক শেলি ওয়ার্নার লিখেছেন, সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হলে যে উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতির জন্ম হতো, ঝু অত্যন্ত সূক্ষ্মতার সাথে তা নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
ঝুর উর্ধবতন কর্মকর্তা জিয়াং জেমিনকে শিগগিরই দেং জিয়াওপিং বেইজিংয়ে ডেকে নিয়ে পার্টির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব দেন। এরপর ১৯৯১ সালে উপ-প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হন ঝু এবং ১৯৯৩ সালে পার্টির শাসন পরিচালনাকারী স্থায়ী কমিটিতে যোগ দেন তিনি।
সরকারি ভুল স্বীকার ও দায় নেওয়ার মাধ্যমে নেতাদের ‘ভুল না করার’ প্রথাগত ধারণাকে ভেঙে দিয়েছিলেন ঝু। ১৯৯৮ সালে গ্রীষ্মকালীন বন্যায় ৪ হাজার ১৫০ জন মারা যাওয়ার পর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের জন্য বরাদ্দ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়। সেই সময় ক্ষোভ প্রকাশ করে ঝু বলেছিলেন, কিছু বাঁধ ‘সিমের বীজের গুড়ার’ চেয়েও দুর্বল। এই ঘটনার তিন বছর পর দক্ষিণ চীনে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিস্ফোরণে অন্তত ৪২ জন নিহত হয়। প্রাণহানির এই ঘটনায় মন্ত্রিসভা জনগণকে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় জাতীয় টেলিভিশনে ক্ষমা চেয়েছিলেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে অবসর নেওয়ার পর চীনের অর্থনীতির জনসম্মুখে আর খুব বেশি দেখা যায়নি ঝুকে।