সিলেট ১৮ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৯:২৪ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৭, ২০২৬
লন্ডন বাংলা ডেস্ক ::
বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা ও পরিবহনে জ্বালানির চাহিদা বাড়ছে। ঘাটতি মেটাতে বাড়ছে এলএনজি, জ্বালানি তেল ও কয়লা আমদানি। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেই বাড়ছে সরকারের ব্যয়, ভর্তুকি ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ।
এমন বাস্তবতায় আগামী ২৫ বছরের জ্বালানি নিরাপত্তার হিসাব শুধু আমদানির ওপর রেখে করলে বড় ঝুঁকিতে পড়বে বাংলাদেশ। তাই স্থলভাগের গ্যাসক্ষেত্রের পাশাপাশি এখন বড় করে তাকাতে হচ্ছে বঙ্গোপসাগরের দিকে।
সাগরের তলদেশে তেল-গ্যাসের সম্ভাব্য মজুতের পাশাপাশি সমুদ্রভিত্তিক বায়ুশক্তিসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানিও হতে পারে ভবিষ্যতের বড় সম্পদ।
এরই মধ্যে বঙ্গোপসাগরের ২৬টি ব্লকে আন্তর্জাতিক কোম্পানির জন্য তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের দরজা খুলেছে সরকার। এর মধ্যে ১১টি শ্যালো ওয়াটার এবং ১৫টি ডিপ ওয়াটার ব্লক। নতুন অফশোর মডেল প্রডাকশন শেয়ারিং কনট্রাস্ট (পিএসসি) ২০২৬-এর আওতায় এই দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
বিনিয়োগ আকর্ষণে চুক্তির শর্তও আগের তুলনায় সহজ করা হয়েছে। তবে বিডিং রাউন্ড আয়োজনই শেষ কথা নয়। সাফল্য নির্ভর করবে কত দ্রুত অনুসন্ধান শুরু হয়, কতগুলো কূপ খনন হয়, কী পরিমাণ বিনিয়োগ আসে এবং আবিষ্কৃত সম্পদ কত দ্রুত জাতীয় অর্থনীতিতে যুক্ত করা যায় তার ওপর।
বাংলাদেশের জ্বালানি অর্থনীতির অন্যতম দুর্বলতা আমদানিনির্ভরতা। গ্যাসের ঘাটতি পূরণে এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে এর প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পের উৎপাদন ব্যয় ও সরকারের ভর্তুকিতে। চলতি বছরের মার্চে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে এলএনজির দাম বেড়ে যায়। একটি কার্গোতে যেখানে আগে প্রায় ৪৩৬ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছিল, পরে একই সরবরাহকারীর কাছ থেকে একটি কার্গোর জন্য ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৯০৮ কোটি টাকা।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জ্বালানি নিরাপত্তাকে বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেছেন। তার মতে, উচ্চ দামে দীর্ঘদিন আমদানিনির্ভর জ্বালানি সরবরাহ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই দেশীয় তেল-গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ এবং জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটেও দেশে ও সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাপেক্সের মাধ্যমে ভূতাত্ত্বিক ও সিসমিক জরিপ এবং নতুন কূপ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, গত ২৪ মে আনুষ্ঠানিকভাবে অফশোর বিডিং রাউন্ড ২০২৬ চালু করা হয়। ২৬টি ব্লকের মধ্যে ১১টি অগভীর ও ১৫টি গভীর সমুদ্রের। বিনিয়োগ আকর্ষণে নতুন পিএসসিতে সিগনেচার বোনাস ও রয়্যালটি না রাখা, আন্তর্জাতিক বাজারের ব্রেন্টের সঙ্গে গ্যাসের মূল্য নির্ধারণ এবং যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক সুবিধার মতো বিষয় রাখা হয়েছে। আগের ২০২৪ সালের অফশোর বিডিং রাউন্ডে আন্তর্জাতিক কোম্পানির সাড়া না পাওয়ার অভিজ্ঞতা থেকেই নতুন কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। এবার সরকারের লক্ষ্য হলো বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি কমিয়ে অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিকে আনা।
এ বিষয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধান না করে আমদানিনির্ভর হয়ে পড়ায় বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সমুদ্রের তেল-গ্যাস উত্তোলন করা গেলে তা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি বলেন, স্থলভাগের পাশাপাশি সমুদ্রেও অনুসন্ধান বাড়িয়ে দেশের নিজস্ব জ্বালানি সম্পদের ব্যবহার বাড়াতে হবে।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চের (সিএসইআর) চেয়ারম্যান ও ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ শামীম সমুদ্রকে বৃহত্তর ব্লু ইকোনমির অংশ হিসেবে দেখার ওপর জোর দিয়েছেন।
তিনি বলেন, সমুদ্র শুধু মাছ, বন্দর বা পর্যটনের ক্ষেত্র নয়, মেরিন জ্বালানি, নবায়নযোগ্য শক্তি, নৌপরিবহণ, পর্যটন ও প্রযুক্তি মিলিয়ে একটি বড় অর্থনৈতিক অঞ্চল। নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়েও তিনি সৌর ও বায়ুশক্তির সম্ভাবনা কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
তবে এ ক্ষেত্রে নীতির স্থিরতা, অর্থায়ন, অবকাঠামো এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
সাকিফ শামীম বলেন, গ্যাস মিললে বদলাবে অর্থনীতির হিসাব। বঙ্গোপসাগরে বড় কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার হলে বিদ্যুৎকেন্দ্রে তো সমৃদ্ধ হবেই, পাশাপাশি কমবে এলএনজি আমদানির চাপ। শিল্পে গ্যাস সরবরাহ বাড়বে। সার, বিদ্যুৎ, সিরামিক, টেক্সটাইল, স্টিলসহ গ্যাসনির্ভর শিল্পের উৎপাদন ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
সবচেয়ে বড় বিষয়, ডলারে জ্বালানি আমদানি কমলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমবে। একটি বড় গ্যাসক্ষেত্র তাই একই সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি বলেন, আগামী ২৫ বছরের পরিকল্পনায় বঙ্গোপসাগরকে শুধু গ্যাসের উৎস হিসেবে দেখলে চলবে না। সমুদ্রভিত্তিক বায়ুশক্তির সম্ভাবনাও মূল্যায়ন করতে হবে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন এ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (বাপেক্স) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম দেশীয় অনুসন্ধান বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, নতুন কূপ খনন ও গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়ন করা গেলে আমদানিনির্ভরতা কমানো সম্ভব। দেশীয় গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানোই জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান পথ।
সব মিলিয়ে আগামী দিনের জ্বালানি কৌশলে তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে—দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, আমদানির ঝুঁকি কমানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত রূপান্তর। বঙ্গোপসাগরের ২৬টি ব্লকের অনুসন্ধান সেই যাত্রার বড় পরীক্ষা বলেও জানান তিনি।