সিলেট ১৬ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৩:০৮ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২৬
৩৬টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ২৫টিতে জয় পেয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-সমর্থিত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থীরা। বিএনপি পেয়েছে মাত্র ১১টি আসন। তৃণমূলের ভাষায়—“এটা শুধু হার নয়, সাংগঠনিক ভেঙে পড়ার ফল।”
জেলা-ভিত্তিক ফল: কোথায় কেমন চিত্র
খুলনা জেলা: ৬টির মধ্যে ৪টিতে বিএনপি, ২টিতে জামায়াত
বাগেরহাট: ৩টি জামায়াত, ১টি বিএনপি
সাতক্ষীরা: ৪টির সবকটিতে জামায়াত
যশোর: ৫টি জামায়াত, ১টি বিএনপি
মাগুরা: ২টিতেই বিএনপি
ঝিনাইদহ: ৩টি জামায়াত, ১টি বিএনপি
মেহেরপুর: ২টিতেই জামায়াত
কুষ্টিয়া: ৩টি জামায়াত, ১টি বিএনপি
চুয়াডাঙ্গা: ২টিতেই জামায়াত
নড়াইল: ১টি বিএনপি, ১টি জামায়াত
ফলাফল বলছে, সাতক্ষীরা, যশোর, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গায় জামায়াত প্রায় একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে।
অতীত বনাম বর্তমান: পাল্টে যাওয়া সমীকরণ
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী—
১৯৯১ সালে বিএনপি ৯টি, জামায়াত ৬টি
২০০১ সালে বিএনপি ২১টি, জামায়াত ৭টি
২০০৮ সালে বিএনপি ২টি, জামায়াত ২টি
সে তুলনায় এবারের ফলাফল জামায়াতের জন্য বড় অগ্রগতি, আর বিএনপির জন্য বড় ধাক্কা।
নেতৃত্বের শূন্যতা ও সাংগঠনিক দুর্বলতা
এক সময় খুলনায় বিএনপির নেতৃত্বে ছিলেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মুস্তাফিজুর রহমান, সাবেক তথ্যমন্ত্রী তরিকুল ইসলাম, সাবেক স্পিকার রাজ্জাক আলী ও সাবেক মেয়র শেখ তৈয়েবুর রহমান।
বর্তমানে সেই মাপের প্রভাবশালী নেতৃত্বের অভাব প্রকট বলে মনে করছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা।
কেন্দ্রীয় বিএনপির খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম মঞ্জু-র পদ স্থগিত হওয়া এবং তা পুনর্বহাল না হওয়ায় সাংগঠনিক অস্থিরতা বাড়ে। তাঁর স্থলাভিষিক্ত ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব পালন করেন অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
তৃণমূলের অভিযোগ—৩৬টি আসনে সমন্বিত নেতৃত্ব দেওয়ার মতো সক্ষমতা বা সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ কারও হাতে ছিল না। অধিকাংশ জেলা কমিটি নড়বড়ে, অনেক উপজেলায় কমিটি নেই বললেই চলে।
বিদ্রোহী প্রার্থী ও আঁতাতের অভিযোগ
বিভাগে অন্তত ৬ জন বিএনপি নেতা বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় তাদের দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। এছাড়া এক সময়ের প্রভাবশালী নেতা এমএএইচ সেলিম বাগেরহাটের দুই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
তৃণমূলের অভিযোগ, মনোনয়ন না পাওয়া কিছু নেতা গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থীদের হারাতে মাঠে নামেন। কয়েকজনের বিরুদ্ধে জামায়াত প্রার্থীদের সঙ্গে গোপন সমঝোতার অভিযোগও উঠেছে—যদিও তা প্রমাণিত নয়।
হেভিওয়েটদের হার-জিত
খুলনা-২ আসনে নজরুল ইসলাম মঞ্জুর পরাজয়কে দলীয় অনৈক্যের বড় উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মনোনয়ন পেলেও পদ পুনর্বহাল না হওয়ায় সাংগঠনিক শক্তিকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেননি তিনি।
অন্যদিকে খুলনা-৫ আসনে ভিন্ন চিত্র। সেখানে বিএনপির প্রার্থী আলী আসগার লবি পরাজিত করেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার-কে। স্থানীয়ভাবে ঐক্যবদ্ধ প্রচারণাই এ আসনে বিএনপির সাফল্যের মূল চাবিকাঠি ছিল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ট্রমায় তৃণমূল, প্রত্যাশা পুনর্গঠনের
তৃণমূল নেতাকর্মীদের ভাষায়, “এমন ফলাফল কল্পনাও করিনি।” অনেকেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। তাদের প্রত্যাশা—কেন্দ্র দ্রুত সাংগঠনিক পুনর্গঠন করবে, কোন্দল নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নেবে এবং শক্ত নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করবে।
নতুন বাস্তবতা, কঠিন বার্তা
খুলনা বিভাগের ৩৬ আসনের মধ্যে ২৫টি এখন জামায়াতের দখলে, ১১টি বিএনপির।
এই ফল শুধু আসন হারানো নয়—এটি সাংগঠনিক দুর্বলতা, নেতৃত্ব সংকট ও অভ্যন্তরীণ বিভাজনের কঠিন বার্তা। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রাজনীতিতে নতুন এক সমীকরণের সূচনা হয়েছে। এখন দেখার বিষয়—বিএনপি কীভাবে এই ধাক্কা সামলে ঘুরে দাঁড়াতে পারে, নাকি এই পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবতায় রূপ নেবে।
খুলনা বিভাগের ৩৬ আসনের মধ্যে ২৫টি পেয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী আর ১১টিতে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থীরা।