বরিশালে কবি জীবনানন্দ মেলাঃ সম্মাননা পাচ্ছেন ৪ গুনীজন

প্রকাশিত: ৮:০১ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৫, ২০২২

বরিশালে কবি জীবনানন্দ মেলাঃ সম্মাননা পাচ্ছেন ৪ গুনীজন
আরিফ আহমেদ/বরিশালঃঃ
প্রাচ্যের দেবী শ্রাবস্তীর প্রেমিক এবং রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে জাতীয় কবিতা পরিষদ, বরিশাল ৫ম বারের মতো আয়োজন করতে যাচ্ছে জীবনানন্দ মেলা ২০২২। আগামী ২২ ও ২৩ অক্টোবর দু দিনের এই আয়োজন নিয়ে ইতিমধ্যেই বরিশালের সব সাংস্কৃতিক সংগঠন ও নেতৃবৃন্দ ব্যস্ত সময় পার করতে শুরু করেছেন। একের পর এক উৎসব আয়োজনে এখন মুখরিত বরিশাল ফিরে পেয়েছে কবি নজরুলের বলা প্রাচ্যের ভেনিসের অবয়ব।
সাহিত্য বাজার পত্রিকার ১৫ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বরিশাল সাহিত্য সংসদ আয়োজিত সাংস্কৃতিক আয়োজনটি শেষ হতে না হতেই শুরু হয়েছে সাংবাদিক সুশান্ত ঘোষ ও বরিশাল চারুকলার মৃৎশিল্প সম্মেলন ও মেলা। এর পরপরই আবার তারা ব্যস্ত হয়েছেন কবি জীবনানন্দ মেলা নিয়ে।  আর এ মেলাকে কেন্দ্র করে প্রতিবছরের মতো এবারও দেশের খ্যাতিমান কয়েকজন গুণী লেখককে কবি জীবনানন্দ সম্মাননা ২০২২ প্রদান করা হবে। ২ অক্টোবর মেলার আয়োজক কমিটি এই নাম ঘোষণা করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তা প্রকাশও করেছেন ।
কবি ও লোক গবেষক তপন বাগচী, কথা সাহিত্যিক মনি হায়দার, কবি ও প্রকাশক অর্ণব আশিক এবং কবি ও প্রকাশক আরিফ নজরুলের নাম এই সম্মাননার জন্য ঘোষণা করা হয়েছে। বরিশালের অমৃতলাল দে মহাবিদ্যালয়ের সেমিনার কক্ষে আয়োজিত প্রস্তুতি সভায় এ মেলার প্রধান অধিকর্তা জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি ছড়াকার অধ্যাপক তপংকর চক্রবর্তী জানান, আগামী ২২ ও ২৩ অক্টোবর বরিশালের জগদীশ স্বারস্বত বিদ্যালয়ের মাঠে এ মেলার উদ্বোধন করবেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক জাতিসত্তার কবি মুহাম্মদ নূরুল হুদা।
এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ। মেলায় ছোট ছোট স্টলে বইয়ের পসরা নিয়ে বসবে বিভিন্ন প্রকাশনী ও লিটল ম্যাগাজিন সংগঠন। থাকবে বরিশাল সাহিত্য সংসদ ও সাহিত্য বাজার পত্রিকার স্টলও। তিনি আরো জানান, এবছর কবি জীবনানন্দ পুরস্কার পাচ্ছেন কবিতায় কবি অর্ণব আশিক।
একনজরে অর্ণব আশিক
বাবা মায়ের দেয়া প্রকৃত নাম তার মোঃ হুমায়ূন কবীর। তবে লেখক নামটি তিনি বেশে নিয়েছেন অর্ণব আশিক।
মাতাঃ মরহুমা আয়শা সিদ্দিকা
পিতাঃ মরহুম আবদুল মান্নান মিয়া
জন্মঃ ১ জানুয়ারি ১৯৫৫ সালে। ভোলা জেলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার সন্তান কবি অর্ণব আশিক কর্মসূত্রে ঢাকার শ্যামলীতে আদাবরের শেখেরটেক নামক স্থানে বসবাস করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক সম্মান ও স্নাতকোত্তর
ডিগ্রি লাভ করে অধ্যাপনা পেশায় যুক্ত হন তিনি। পরবর্তীতে সরকারী কর্মকর্তা হিসাবে অবসর গ্রহণ করেন কবি অর্ণব আশিক। তার এ যাবৎ
প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা  নয়টি।
ধূপগন্ধময় এই জীবন
চন্দ্রদ্বীপ-২০১৪
উজানি গাঙে নি:সঙ্গ নোঙর, দেশ পাবলিকেশন্স-২০১৬ইং
জীবনের খোঁজ জল ও জমিনে, বলাকা প্রকাশন-২০১৭
চুম্বনে ভাসা আমার এ শহর, বলাকা প্রকাশন-২০১৮
দগ্ধ জোছনা, শিখা প্রকাশনী-২০১৯
বেয়াড়া চাঁদের ঘূর্ণি, চিত্রা প্রকাশনী-২০১৯ ও স্বপ্ন ভাসে, ছড়ায় ছড়ায়, রাতুল প্রকাশনী-২০১৯
সম্মাননার জন্য মনোনীত ২য় গুনীজন
কবি ও লোক গবেষক  তপন বাগচীকে সামগ্রিক সাহিত্যে সম্মানিত করবে জীবনানন্দ মেলা উদযাপন পরিষদ
একনজরে তপন বাগচী
কবি ও লোক গবেষক  ড. তপন বাগচীর জন্ম ২৩ অক্টোবর ১৯৬৮, বরিশালের প্রতিবেশী জেলা মাদারীপুরে। পিতা তুষ্টচরণ বাগচী ছিলেন মরমি কবি। মাতা জ্যোতির্ময়ী বাগচী গৃহিণী, স্ত্রী কেয়া বালা একজন অধ্যাপক। বাংলা একাডেমির উপপরিচালক হিসেবে দায়িত্বরত ড. তপন বাগচীর রচিত ৮৪ খানা গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কবিতাগ্রন্থ: যাবতীয় যাত্রাযজ্ঞ, চিরবিরহের মোহ, সকল নদীর নাম গঙ্গা ছিল, অন্তহীন ক্ষতের গভীরে, শ্মশানেই শুনি শঙ্খধ্বনি, কেতকীর প্রতি পক্ষপাত। গীতিকবিতাগ্রন্থ: বঙ্গবন্ধু থেকে মালালা: মন্দ্রিত সুরধ্বনি, কূলের আশায় কুল হারাইছি, দিয়েছি এই বুকের আসন, কলঙ্ক অলঙ্কার হইল, আমার ভেতর বসত করে।
ছড়াগ্রন্থ: মুজিব-নামে রক্তদামে, ছড়ার বড়া মিঠেকড়া, পরিবেশ পড়ি বেশ, কবি ঠাকুর ছবি ঠাকুর, মেঘের ভেলা ছায়ার খেলা, মঙ্গা আসে ঘরের পাশে, রাতের বেলা ভূতের খেলা, খাচ্ছে ছুটি লুটোপুটি, স্বপ্নেবোনা তূণীর সোনা। কিশোরগল্পগ্রন্থ : ফণিদার যত ফন্দিফিকির, সাতদিনের সাতকাহন,  শুভর শখের গোয়েন্দাগিরি। প্রবন্ধগ্রন্থ: নজরুল-সাহিত্যের কমালোচিত প্রসঙ্গ, রবীন্দ্রনাথ ও বৌদ্ধ-আখ্যান,  লালন মতুয়া লোকসংগীত সন্ধান,  লোকসংস্কৃতির কতিপয় পাঠ,  বাংলাদেশের যাত্রাগান : জনমাধ্যম ও সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত,  মুক্তিযুদ্ধে গোপালগঞ্জ,  নজরুলের কবিতায় শব্দালঙ্কার।
পুরস্কার: বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাব সাহিত্য পুরস্কার, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সাহিত্য পুরস্কার, স্টান্ডার্ড চার্টার্ড দ্য ডেইলি স্টার সেলিব্রেটিং লাইফ গীতিকাব্য পুরস্কার (৪ বার), চুরুলিয়া নজরুল পদক, অগ্রণী ব্যাংক শিশু একাডেমি শিশুসাহিত্য পুরস্কার, সুভাষ মুখোপাধ্যায় পদক, মহাকবি মাইকেল মধুসূদন পদক, নতুন গতি সাহিত্য পুরস্কার, মহাদিগন্ত সাহিত্য পুরস্কার, এম নূরুল কাদের শিশুসাহিত্য পুরস্কার, জেমকন সাহিত্য পুরস্কার প্রভৃতি। ঢাকার ‘দৃষ্টি’, নদিয়ার ‘কথাকৃতি’, আন্দামানের ‘বাকপ্রতিমা’ ও খুলনার ‘রিভিউ’ পত্রিকার বিশেষ সংখ্যা বেরিয়েছে তাঁর ওপর। তাঁকে নিয়ে বই লিখেছেন ড. তরুণ মুখোপাধ্যায়, শ্যামাপ্রসাদ ঘোষ, নরেশ মণ্ডল, ড. আখতারুজ্জাহান, ড. অনুপম হীরা মণ্ডল, মনীষা কর বাগচী, হরিদাস ঠাকুর, মুর্শিদা আহমেদ প্রমুখ।
কথাসাহিত্যে এ সময়ের আলোচিত নাম গল্পকার মনি হায়দারকে সম্মাননা জানাতে চায় এই আয়োজন।  আর মনি হায়দার এই বৃহত্তর বরিশালের গর্ব পিরোজপুর জেলার ভান্ডারিয়ার সন্তান। তিনিও বাংলা একাডেমিতেই কর্মরত আছেন।
একনজরে মনি হায়দার
মনি হায়দার।  পিতার নাম তবিবুর রহমান।  মা ফজিলাতুননেছা পুস্প। গ্রামঃ বোথলা। উপজেলাঃ ভানডারিয়া। জেলাঃ পিরোজপুর।
শৈশব থেকেই লেখালেখিতে যুক্ত মনি হায়দার বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে চলা কচানদীর রূপ মুগ্ধ প্রেমিক। আর এই প্রেমের জোয়ারে খুঁজে পেয়েছেন লেখক হয়ে ওঠার প্রেরণা। মূলত কথাসাহিত্যিক। তবে ছোট গল্প লিখতেই সাচ্ছন্দ্য বোধ করেন তিনি। প্রকাশিত গল্প সংখ্যা তিনশতাধিক।
প্রকাশিত গল্পের বইঃ থৈ থৈ নোনাজল, এক ঝাঁক মানুষের মুখ, আঠারো বছর পর একদিন, ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ ও অন্যান্য গল্প, ফ্যান্টাসী, একটি খুনের প্রস্তুতু বৈঠক, জিহ্বার মিছিল, ইলিশের মাংশ, ইতিহাসের বেলিফুল, আমার বীনুখালা, ঘাসকন্যা, ন্যাড়া একটি বৃক্ষ, প্রকৃত নায়ক ও গল্প পঞ্চাশ…
উপন্যাসঃ মেয়েটি সমুদ্রে ডুবে যেতে চেয়েছিল, অধ্যাপক কেনো মানুষ হতে চায় না, এক টুকরো কাগজ, বুশরার এক রাত, কিংবদন্তির ভাগীরথী, সুবর্ণ সর্বনাশ, চলুন মানুষের কারখানায়, নায়ক ও নায়িকারা।
সম্পাদনাঃ বারবনিতাদের গল্প, বঙ্গবন্ধুকে নিবেদিত গল্প, নব্বই দশকের গল্প, মুক্তিযুদ্ধের গল্প, গল্পে গল্পে শেখ রাসেল, জগদীশ গুপ্তের শ্রেষ্ঠ গল্প.. শিশু কিশোর গল্প উপন্যাস ও সম্পাদনা মিলিয়ে প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা প্রায় একশোটি।
শিল্পবাড়ি- শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির অনুষ্ঠান উপস্থাপনা জিটিভিতে…  প্রায় পাঁচ বছর, কথাসাহিত্যের কথাঅমৃত বিটিভিতে তিন বছর ধরে উপস্থাপনা করছেন মনি হায়দার।
চলতি বছর জীবনানন্দ সম্মাননায় যে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানটির নাম উঠে এসেছে সেটি “বাঙালি”। একজন রুচিসম্মত প্রকাশক হিসেবে এর কর্ণধার কবি, গল্পকার ও সম্পাদক আরিফ নজরুল এর নাম ঘোষণা করেছে আয়োজক ও বাছাই কমিটি।
বরিশালের বাবুগঞ্জের সন্তান কবি আরিফ নজরুল এর জন্ম ১৪ জুন ১৯৭১। তার পিতা ক্বারি আব্দুল ওয়াজেদ আলী খান, মা নূরজাহান বেগম। কিশোরবেলা থেকেই লেখালেখি করেন তিনি। সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় তার অবাধ বিচরণ হলেও কবিতাতেই স্বাচ্ছন্দ তিনি। পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বাঙালি। সৃজনশীল ও রুচিসম্মত বইয়ের প্রকাশনার পাশাপাশি লক্ষ্য  তার নতুন লেখক সৃষ্টি। তার নিজের উল্লেখযোগ্য বইসমুহ ষড়রিপুর ষড়যন্ত্র [কবিতা], মেঘ বৃষ্টি ও পাখির পদাবলি [কবিতা], মনপোড়া বসতবাড়ি [কবিতা], বাতাশসমগ্র [কবিতা], হেঁটে যাই বনবেড়ালির সাথে [কবিতা], রৌদ্রস্নাত বৃক্ষজীবন [কবিতা যৌথ], যে নামে কাঁপছে ঠোঁট [কবিতা], এক যে ছিলো পুতুলরানি [ছোটদের গল্প], নোনাজল [গল্প], ঢাকার বাইজি উপাখ্যান (প্রবন্ধ), বাঙালির মুক্তির সংগ্রাম ও বঙ্গবন্ধু (প্রবন্ধ সংকলন), স্মরণবরণ শেখ রাসেল (সংকলন) , আমাদের ছোট  রাসেল সোনা (সংকলন), গল্পকথায় শেখ রাসেল (গল্প সংকলন), দ্য জেনোসাইড ১৯৭১ (প্রবন্ধ সংকলন), বঙ্গবন্ধুকে নিবেদিত পঙ্তিমালা মুজিবগাথা (কবিতা সংকলন) ও বঙ্গবন্ধুকে নিবেদিত পঙ্তিমালা সোনার কবজ (কবিতা সংকলন) সম্পাদিত। বিন্নি ধানের খই (শিশুকিশোর সংকলন) সম্পাদিত, পুতুল নাচে বইয়ের পাতায় (শিশুকিশোর সংকলন) সম্পাদিত, বর্গী এলো দেশে (শিশুকিশোর সংকলন) সম্পাদিত, বাক বাকুম পায়রা (শিশুকিশোর সংকলন) সম্পাদিত, আতা গাছে তোতা পাখি (শিশুকিশোর সংকলন) সম্পাদিত ও আম পাতা জোড়া জোড়া (শিশুকিশোর সংকলন) সম্পাদিত।
সাহিত্যে অবদানের জন্য পেয়েছে মহাত্মা গান্ধী পিস এওয়ার্ড,  শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর স্বর্ণপদক, বন্দে আলী মিয়া স্মৃতি পদক, ভাষাসৈনিক মাদার বখশ স্মৃতি পদক।

Spread the love

আর্কাইভ

April 2026
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930