আংগুর,কিছমিছ খাইয়া না পাইলাম চুঙ্গা পিঠার স্বাদ,ও আমার সিলেটি ভাইছাব’ 

প্রকাশিত: ৫:৪৯ অপরাহ্ণ, মার্চ ১৪, ২০২০

আংগুর,কিছমিছ খাইয়া না পাইলাম চুঙ্গা পিঠার স্বাদ,ও আমার সিলেটি ভাইছাব’ 
Spread the love

২৮ Views

ঐতিহ্যে পিঠা চুঙ্গা:

 

অন্তরা চক্রবর্তীঃঃ

সিলেটের একটি আঞ্চলিক গানে চুঙ্গা পিঠার স্বাদের বর্ণনা ওঠে এসেছে। গানটির একটি অংশে বলা হয়েছে-‘আংগুর,কিছমিছ খাইয়া না পাইলাম চুঙ্গা পিঠার স্বাদ ও আমার সিলেটি ভাইছাব। কিন্তু ঐতিহ্যের চুঙ্গা পিঠা আজ বিলুপ্ত প্রায়। এক সময় এ অঞ্চলে বাড়ীতে মেহমান বা নতুন জামাইকে শেষ পাতে চুঙ্গা পিঠা, মাছবিরান আর নারিকেলের মিঠা বা ক্ষিরসা পরিবেশন না করলে বড়ই লজ্জার কথা ছিলো।

 

 

 

এছাড়া সনাতন ধর্মালম্বীদের পৌষ সংক্রান্তি উৎসবে ও এক সময় চুঙ্গা পিঠা বানানো হত। কিন্তু এখন আর সে দিন নেই। চুঙ্গা পিঠা ছিল সিলেট অঞ্চলের মানুষের ঐতিহ্যবাহী খাবার। প্রতি বছর শীত মৌসুমে ভাপা পিঠা, পুলি পিঠা, মালপো, পাটি সাপটা, চিতই পিঠা, পাকন পিঠা, দুধপুলি, চন্দ্রপুলি, দুধচিতই, মোহন পুলি ও গকুল পিঠার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চুঙ্গা পিঠাও স্থান পায়। এই পিঠা তৈরী করতে শুধু প্রয়োজন হয় বিরইন চাল ও নির্দিষ্ট জাতের বাঁশ। ভাল ভাবে চাল ভিজিয়া নরম করে বাঁশের চুঙ্গার মধ্যে ভরে খরকুটা দিয়ে পুড়িয়ে এই পিঠা তৈরী করা হয়। এই পিঠার বিশেষত্ব হল বাঁশের মধ্যে থেকে এক ধরনের লোভনিয় গন্ধ চুঙ্গা পিঠার মাঝে পাওয়া যায়। গোলাকার আকৃতির এই পিঠা দুধের মলাই, খেজুরের গুড় ও দুধের সর দিয়ে খেতে সুস্বাদু এবং সহজ পাচ্য ও বটে। হাওর-নদীর বড় বড় রুই-কাতলা, বোয়াল, কই, মাগুর মাছ হালকা মসলা সহযোগে ভাজাকে আঞ্চলিক ভাষায় মাছবিরান বলা হয়। এই মাছ ভাজা বা মাছবিরান দিয়ে চুঙ্গা পিঠা খাওয়া ছিলো এককালে সিলেটের ঐতিহ্য। প্রবীনদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, চুঙ্গা পিঠা তৈরীর প্রধান উপকরণ ঢলু বাঁশ ও বিরন চালের সরবরাহ এখন অনেক কমে গিয়েছে। এখন বনাঞ্চল উজাড় হয়ে হারিয়ে যাচ্ছে ঢলু বাঁশ।

 

 

 

আর এর সাথে সাথে হারিয়ে যেতে বসেছে ঐতিহ্যবাহী চুঙ্গাপিঠা। কারণ ঢলু বাঁশ ছাড়া চুঙ্গাপিঠা তৈরী করা যায় না। এই বাঁশে অত্যধিক রস থাকায় এটি সহজে আগুনে পোড়ে না। এই সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে ঢলু বাঁশের চোঙ্গায় পিঠা তৈরির বিভিন্ন উপকরণ ঢুকিয়ে দীর্ঘ সময় আগুনের তাপে ভেতরের পিঠা সিদ্ধ করা হয়। যে বাঁশের চোঙ্গায় চাল ভরা হয় সেগুলো লম্বায় দুই থেকে তিন ফুট হয়ে থাকে। এগুলো স্থানীয়ভাবে ‘চুঙ্গার বাঁশ’ নামে পরিচিত। আর যে পাতায় মুড়িয়ে চাল দেয়া হয় তাকে বলে খিত্তিপাতা।

 

 

কেউ কেউ চোঙ্গার ভেতরে বিন্নি চাল, দুধ, চিনি, নারিকেল ও চালের গুঁড়া দিয়ে পিঠা তৈরি করেন। পিঠা তৈরি হয়ে গেলে তা চোঙ্গার ভেতরেই চোঙ্গা থেকে আলাদা হয়ে যায়। চুঙ্গা পিঠা পোড়াতে খড়ের প্রয়োজন হয়। এটি যে বাড়ীতে বানানো হতো সে বাড়ীতে উৎসবের আমেজ হত। আশেপাশের বাড়ীর ছোট বাচ্ছারা এসে জড়ো হত চোঙ্গা পোড়ানোর সময়। চুঙ্গা পিঠার বাঁশ আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু, বান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশীদের দেয়া হতো। এখন চুঙ্গার অপ্রতুলতায়, আগ্রহের অভাবে চুঙ্গা পিঠা খাওয়া হয় না বলে জানান একাধিক প্রবীনরা।


Spread the love