আলাদীনের চেরাগে ঘষা দিয়ে ইচ্ছেপূরণ!

প্রকাশিত: ১২:২৮ অপরাহ্ণ, মার্চ ২১, ২০২০

আলাদীনের চেরাগে ঘষা দিয়ে ইচ্ছেপূরণ!
Spread the love

১৪ Views

লন্ডন বাংলা ডেস্কঃঃ

ফটিকছড়ির জাহানপুরে একসময় ছোট্ট একটি মুদির দোকান ছিল ফয়েজ আহম্মদের। দোকানের আয়ে সংসার চালাতেন কষ্টে। ছেলে আবু আহম্মদ যখন নবম শ্রেণিতে, তখন অর্থাভাবে তার স্কুলের পাঠ চুকিয়ে দিতে হয়। একসময় তাকে দুবাই পাঠিয়ে দেওয়া হয় শ্রমিক হিসেবে। এই হচ্ছে গল্পের প্রথম অংশ অতীতের ও অভাবের।

 

 

গল্পের দ্বিতীয় অংশটি বর্তমানের ও প্রাচুর্যের। আবু আহম্মদ এখন চড়েন একটি দামি গাড়িতে; থাকেন পশ ইনটেরিয়রের সাজানো বাড়িতে। এলাকায় ইতোমধ্যে দানবীর হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন তিনি।

 

বন্দরনগরীতে তার রয়েছে বেশ কয়েকটি বিলাসবহুল বাড়ি। শুধু কি তাই? রয়েছে দুটি অত্যাধুনিক কনভেনশন সেন্টারও। আর শ্রমিক জীবন কাটিয়ে আসা দুবাইয়েও রয়েছে তার বেশ কটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া নামে-বেনামেও অনেক প্রতিষ্ঠান ও সম্পত্তি গড়েছেন তিনি। যেন আলাদীনের চেরাগে ঘষা দিয়ে ইচ্ছেপূরণ!

 

 

বিস্মিত এলাকাবাসীর মনে প্রশ্ন কীভাবে এতটা ধনসম্পদের মালিক হলেন আবু আহম্মদ? কিন্তু এ প্রশ্ন-প্রশ্নই থেকে যায়, তারা উত্তর হাতড়ে খুঁজেন পান না। এ প্রশ্নের প্রাথমিক উত্তরটি উদ্ধার করেছে ডিবি পুলিশ গত চার বছর আগে। আর সিআইডির চলমান ব্যাপকঅনুসন্ধানে বেরিয়ে আসছে এ সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্যপ্রমাণ।

 

বছর চারেক আগে চট্টগ্রামের তামাকু লেনে আবু আহম্মদের একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে ৩টি সিন্দুক থেকে ২৫০টি স্বর্ণবার ও ৬০ লাখ টাকা জব্দ করে ডিবি পুলিশ। তখনই আবু আহম্মদের নাম উঠে আসে আইনের খাতায়। এ বিষয়ে এখন অনুসন্ধান করছে সিআইডি।

 

সিআইডির এক কর্মকর্তা জানান, ইলেকট্রনিক্স ও কসমেটিক্স পণ্য আমদানিকারী প্রতিষ্ঠানের নামে আবু আহম্মদ ও তার চাচাতো ভাই ইকবাল মোহাম্মদ নেজাম ওরফে নিজাম বিভিন্ন ব্যাংকে ২১টি হিসাব খুলেছিলেন। এসব ব্যাংক হিসাবে স্বর্ণ চোরাচালানের আর্থিক লেনদেন হতো।

 

 

এ বিষয়ে অকাট্য প্রমাণ পাওয়ার পর গত বুধবার রাতে চট্টগ্রাম মহানগরের কোতোয়ালি থানায় অর্থপাচার আইনে মামলা করেছে সিআইডি। এ মামলায় গত বুধবার রাতে ঢাকা ও চট্টগ্রামে অভিযান চালিয়ে আবুর সহযোগী ১২ জনকে গ্রেপ্তার করে সংস্থাটি। তবে আবু ও তার দোসর নেজাম এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেছে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন আবু রাশেদ, ওবায়দুল আকবর, মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন বাবলু, ইমরানুল হক মো. কপিল চৌধুরী, এমতিয়াজ হোসেন, মোহাম্মদ আলী, ফরিদুল আলম, মোহাম্মদ এরশাদল আলম, মো. হাসান, রুবেল চক্রবর্তী, সাগর মহাজন ও টিটু ধর। আসামিদের মধ্যে এখনো পলাতক এসএম আসিফুর রহমান, রফিক, মিনহাজ উদ্দীন, দিনবন্ধু সরকার, আলতাফ হোসেন চৌধুরী ও চট্টগ্রাম সিটির সাবেক কাউন্সিলর মো. শাহজাহান।

 

সিআইডির কর্মকর্তারা জানান, চট্টগ্রামে স্বর্ণ চোরাচালানের একটি মামলায় পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন আবু আহম্মদ। ২০১৮ সালে জামিনে জেল থেকে বের হন। এর পর থেকেই তিনি অনেকটা গা ঢাকা দিয়ে আছেন।

 

সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফারুক হোসেন জানান, অনুসন্ধানে ২১টি ব্যাংক হিসাবের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব ব্যাংক হিসাবে নামে-বেনামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে খোলা হলেও আবু এবং তার চাচাতো ভাই নেজাম এগুলো পরিচালনা করত। এসব হিসাবে এজাহারভুক্ত ২০ জন ছাড়াও আরও কয়েকজন অজ্ঞাত ব্যক্তি লেনদেন করেছে।

 

এই ব্যাংক হিসাবে সংঘবদ্ধভাবে হুন্ডি (অর্থপাচার), স্বর্ণ চোরাচালানি, চোরাই ও অন্যান্য দ্রব্যের অবৈধ ব্যবসার সর্বমোট ২০৪ কোটি ৩৭ লাখ ৪৫ হাজার ৮৬৭ টাকা জমা ও ২৪০ কোটি ৫ লাখ টাকা উত্তোলন করেছে। এসব ব্যাংক হিসাবে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে এজাহারভুক্ত আসামি ছাড়াও ভিন্ন ভিন্ন পেশার মানুষ বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেন করেন। এসব লেনদেনের বিষয়ে আসামিরা জিজ্ঞাসাবাদে সঠিক তথ্য-উপাত্ত ও লেনদেনের সপক্ষে কোনো কাগজপত্র উপস্থাপন করতে পারেননি।

 

যেভাবে চোরাচালানঃ

সিআইডি কর্মকর্তারা জানান, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত আবুর সিন্ডিকেটের সদস্যরা স্বর্ণ কিনে যাত্রীদের মাধ্যমে ভারত ও মিয়ানমারে পাঠাত। সিন্ডিকেটের আরেকটি গ্রুপ সীমান্তবর্তী এলাকা হয়ে চট্টগ্রামে নিয়ে আসতেন এসব স্বর্ণ। এখান থেকেই ক্রেতাদের মাধ্যমে এসব স্বর্ণ ছড়িয়ে পড়ত সারাদেশে।

 

আবুর যত সম্পদঃ
প্রাথমিক অনুসন্ধানের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, স্বর্ণ চোরাচালানের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দিয়ে আবু তার গ্রামের বাড়ি ফটিকছড়ির ধর্মপুর ও জাহাপুর মৌজায় অনেকের জমি ক্রয় করেন। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণাধীন কাতালগঞ্জ আবাসিক এলাকায় প্রায় ১৬ কাঠা (প্লট নং-৩৩) জমি কিনেছেন। পাঁচলাইশের হিলভিউ আবাসিক এলাকায় বিলাসবহুল ছয়তলা (বাড়ি নং-৮৩, রোড নং-০৬) বাড়ি করেছেন। চাঁদগাঁও মৌজায় পল্লী কাকন ও পল্লী শোভা নামে দুটি কনভেনশন হল নির্মাণ করেছেন। জাপতনগর ইউনিয়ন পরিষদসংলগ্ন দৃষ্টিনন্দন তিনতলা বাড়ি করেছেন। সম্পূর্ণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাড়িটির নাম রেখেছেন ‘জাহানারা ম্যানশন’। দুবাইয়ের ব্যস্ত মার্কেটে একাধিক দোকান করেছেন। আর বেনামেও গড়েছেন অঢেল সম্পত্তি-সম্পদ।


Spread the love

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Follow us

আর্কাইভ

May 2022
M T W T F S S
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031