সিলেট ২৮শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৩ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ২:৩৭ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৩, ২০২৬
লন্ডন বাংলা ডেস্ক ::
রাখতে যে পরিমাণ জ্বালানি তেলের প্রয়োজন হয়, তার সিংহভাগেরই মূল ধমনি হলো হরমুজ প্রণালি। মানচিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরের মাঝে অবস্থিত এই সংকীর্ণ জলপথ যেন এক অলৌকিক ভৌগোলিক রেখা। এর এক পাশে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান এবং অন্য পাশে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে এই প্রণালিকে বলা হয় বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চোক পয়েন্ট। অর্থাৎ এটি এমন একটি সরু পথ যা বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ব অর্থনীতির শ্বাসরুদ্ধ হওয়ার উপক্রম হয়।
নামকরণ
হরমুজ প্রণালি হলো পৃথিবীর একমাত্র প্রধান বাণিজ্যিক পথ, যার নামকরণ করা হয়েছে কোনো দেবতার নামে। নামটি এসেছে ‘হরমোজ’ থেকে, যা মধ্য ফারসি ভাষায় আহুরা মাজদার রূপ। আহুরা মাজদা ছিলেন জরথুস্ত্রীয় জ্ঞান, আলো এবং মহাজাগতিক শৃঙ্খলার দেবতা। প্রাচীন পারস্যবাসীরা এখানে শুধু একটি বাণিজ্যপথই তৈরি করেনি, বরং এটিকে পবিত্র করেছিল। শৃঙ্খলার দেবতার নামে নামকরণ করা এই স্থান যেন এখন বিশৃঙ্খলার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ১৬৭ কিলোমিটার (১০৪ মাইল) দীর্ঘ এবং সবচেয়ে সংকীর্ণ স্থানে ৩৯ কিলোমিটার (২৪ মাইল) চওড়া এই জলপথ দিয়ে প্রতিবছর আনুমানিক ৩০,০০০ জাহাজ যাতায়াত করে।
ইতিহাস
একাদশ শতাব্দীতে, মুহাম্মদ দিরামকু- দিরহেম কুব, অর্থাৎ ‘দিরহামের টাঁকশাল নির্মাতা’- নামের একজন আরব প্রধান ওমান ত্যাগ করে পারস্য উপসাগর পেরিয়ে ইরানের উপকূলে হরমুজ রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ছিলেন একজন বণিক-রাজপুত্র, যোদ্ধা নন এবং তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, এই ভৌগোলিক অঞ্চলে ক্ষমতা আসে দুই সভ্যতার মধ্যবর্তী ব্যবধান নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে। পঞ্চদশ শতাব্দীর মধ্যে হরমুজ মধ্যযুগীয় বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যকেন্দ্র-রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল। মিশর, চীন, জাভা, বাংলা, জাঞ্জিবার ও ইয়েমেনের বণিকরা এই একটিমাত্র দ্বীপ বন্দরে এসে মিলিত হতেন। ভেনিসীয় অভিযাত্রী মার্কো পোলো দুবার এখানে এসেছিলেন। মিং রাজবংশের সময়, চীনা নৌ-সেনাপতি ঝেং এটিকে তার ধনসম্পদবাহী নৌবহরের চূড়ান্ত গন্তব্য বানিয়েছিলেন। সামুদ্রিক বাণিজ্য বোঝে এমন প্রতিটি সভ্যতাই অবশেষে সেখানে পৌঁছানোর পথ খুঁজে পেয়েছিল। প্রত্যেকেই একই উপলব্ধিতে পৌঁছেছিল : প্রবেশদ্বার নিয়ন্ত্রণ করো, মাশুল আদায় করো।
১৫০৭ সালে পর্তুগিজদের আগমন ঘটে। অ্যাডমিরাল আফোনসো ডি আলবুকার্ক বুঝতে পেরেছিলেন যে, যে এই সংকীর্ণ পথ দখল করবে, ভারত ও ভূমধ্যসাগরের মধ্যবর্তী সবকিছুই তার নিয়ন্ত্রণে থাকবে। তিনি সাতটি জাহাজ ও ৫০০ জন সৈন্য নিয়ে বন্দরটি দখল করেন।
১৬২২ সালে পারস্যের শাহ প্রথম আব্বাস (আব্বাস দ্য গ্রেট) ইংরেজ নৌবাহিনীর সহায়তায় হরমুজ দখল করেন। অবশেষে ব্রিটিশরা আধিপত্য বিস্তার করে। ১৯৫১ সালে ব্রিটিশ নৌবাহিনী প্রণালিটির ওপর অবরোধ আরোপ করে ইরানের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেগকে তার তেলশিল্প জাতীয়করণের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারে চাপ দেওয়ার জন্য, যে শিল্পে ব্রিটিশদের একটি বড় অংশীদারত্ব ছিল। এর মাধ্যমে ব্রিটেন সেই একই কৌশল প্রয়োগ করে, যা চার শতাব্দী আগে আলবুকার্কি প্রথম শুরু করেছিলেন। এই অবরোধ দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে এবং ১৯৫৩ সালে মোসাদ্দেগের বিরুদ্ধে সিআইএ সমর্থিত অভ্যুত্থানে সরাসরি ভূমিকা রাখে।
১৯৮৪ থেকে ১৯৮৭ সালের মধ্যে প্রায় ৫৪৬টি পণ্যবাহী জাহাজে হামলা চালানো হয়েছিল এবং এতে ৪৩০ জনেরও বেশি নাবিক মারা যান। এত কিছুর পরেও তেলের সরবরাহ বন্ধ হয়নি, তবে জাহাজের বীমা খরচ অনেক বেড়ে গিয়েছিল।
অতীতের সেই ঘটনা হয়তো ২০২৬ সালের বিবদমান পক্ষগুলোকে এই সাহস জুগিয়েছে যে, এই পথ আংশিক বন্ধ রাখলেও খুব একটা সমস্যা হবে না। কিন্তু আশির দশকের সঙ্গে বর্তমান সময়ের বড় পার্থক্য সামরিক শক্তিতে নয়, বরং বীমা ব্যবস্থার ধরনে। আজকের আধুনিক বীমা ব্যবস্থা যেকোনো নৌবাহিনীর চেয়েও অনেক বেশি কড়াকড়িভাবে এই সমুদ্রপথ অচল করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। নয়শ বছর আগে মুহাম্মদ দিরমকুর শাসনামল ছিল শরীরের হৃদযন্ত্রের প্রধান কপাটের মতো, যা এশীয় পণ্য উৎপাদন আর ইউরোপের বাজারের মধ্যে সংযোগ নিয়ন্ত্রণ করত। আজ প্রায় এক হাজার বছর পার হয়ে গেলেও সেই প্রেক্ষাপট বদলায়নি; এই পথের গুরুত্ব আর ধরন আজও ঠিক আগের মতোই রয়ে গেছে।
বিশ্বের জ্বালানি প্রবেশদ্বার
বিশ্বের মোট খনিজ তেল বাণিজ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির প্রায় ২৫ শতাংশ এই সরু পথ দিয়েই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছায়। প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল তেল এই জলপথ দিয়ে প্রবাহিত হয়, যা বিশ্ববাজারে সরবরাহকৃত মোট পেট্রোলিয়ামের প্রায় ২১ শতাংশ। বিশেষ করে এশিয়ার বৃহৎ অর্থনীতির দেশগুলো, যেমন- চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া তাদের প্রয়োজনীয় জ্বালানি আমদানির জন্য এই রুটের ওপর প্রায় ৮০ শতাংশ নির্ভরশীল। হরমুজ প্রণালির সংকীর্ণতম অংশটি মাত্র ২১ মাইল (৩৩ কিলোমিটার) চওড়া। তবে জাহাজ চলাচলের জন্য নির্ধারিত দুটি ‘শিপিং লেন’ বা জলপথ আরও অনেক বেশি সরু- প্রতিটি মাত্র দুই মাইল চওড়া এবং তাদের মাঝে দুই মাইলের একটি নিরাপদ বাফার জোন রয়েছে। এই ক্ষুদ্র পরিসরের জলপথ দিয়েই বিশ্বের বিশালাকার সব সুপারট্যাংকার যাতায়াত করে। ২০২৬ সালের বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে, যেখানে বিকল্প জ্বালানির খোঁজ চলছে এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা তুঙ্গে, সেখানে হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব কমেনি বরং বহুগুণ বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, বিশেষ করে ইরান ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা, তার কেন্দ্রবিন্দুতে সব সময়ই থাকে এই জলপথ। প্রণালিটি একবার কোনো কারণে বন্ধ হয়ে গেলে বা সেখানে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, যা মুহূর্তের মধ্যে বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক মন্দার জন্ম দিতে পারে। তাই হরমুজ প্রণালি কেবল একটি ভৌগোলিক সীমারেখা নয়, এটি বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতার এক প্রধান নিয়ামক।
শিল্প উৎপাদনে সংকট
হরমুজ প্রণালিকে একটি জ্বালানি করিডর হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি বন্ধের ফলে অনিবার্যভাবে কৃষি, উৎপাদন, নির্মাণ এবং সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনসহ বিভিন্ন শিল্পে ধারাবাহিক বিপর্যয় ঘটবে।
বিশ্বের অ্যামোনিয়া বাণিজ্যের ৩০ শতাংশেরও বেশি, ইউরিয়ার প্রায় ৫০ শতাংশ এবং ডায়ামোনিয়াম ফসফেটের ২০ শতাংশ- যা সবই সার ও কৃষি খাতের জন্য অপরিহার্য- এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। ধাতু প্রক্রিয়াকরণের একটি প্রধান উপাদান, বৈশ্বিক সালফারের প্রায় ৫০ শতাংশও এই সংকীর্ণ পথ দিয়ে রপ্তানি করা হয়। সেমিকন্ডাক্টর থেকে এমআরআই পর্যন্ত বিভিন্ন প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ হিলিয়াম বহনকারী জাহাজগুলোও এই প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করে। বৈশ্বিক অ্যালুমিনিয়ামের প্রায় ১০ শতাংশ এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে উৎপাদিত প্লাস্টিকের একটি উল্লেখযোগ্য অংশও এর মধ্য দিয়ে যায়। হরমুজ প্রণালি উপসাগরীয় দেশগুলোর খাদ্য সরবরাহের একটি প্রধান পথও বটে, যে দেশগুলো খাদ্য আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তেলের মতো সারকে অন্য পথে পাঠানো যায় না; অ্যামোনিয়া বা ইউরিয়ার জন্য কোনো পাইপলাইন নেই। যখন প্রণালিটি বন্ধ হয়ে যায়, তখন নাইট্রোজেন সরবরাহ পুরোপুরি থেমে যায়। কৃত্রিম নাইট্রোজেন সার বিশ্বের প্রায় ৪৮ শতাংশ মানুষের খাদ্যের জোগান দেয়। উত্তর গোলার্ধে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে নাইট্রোজেন প্রয়োগের শেষ সময়সীমা থাকায়, মার্চ মাসের কোনো বিঘ্ন ঘটলে তা সরাসরি সেপ্টেম্বরে ফলন হ্রাসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদন কেন্দ্রগুলো একবার বন্ধ করে দিলে তা সহজে পুনরায় চালু হয় না- এর সেলগুলোর ভেতরে ধাতু জমে কঠিন হয়ে যায়, যার জন্য কয়েক সপ্তাহব্যাপী নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতির প্রয়োজন হয় এবং এতে বিপুল অতিরিক্ত খরচ হয়।
তেল ও গ্যাসের পরিসংখ্যান
আগের পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে এই জলপথের ভয়াবহ গুরুত্ব বোঝা যায়। প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল তেল এই প্রণালি দিয়ে পার হয়। সহজভাবে বললে, বিশ্ববাজারে প্রতিদিন যত তেল কেনাবেচা হয়, তার প্রায় এক-পঞ্চমাংশই এই সরু পথ দিয়ে যায়। শুধু তেল নয়, কাতার থেকে আসা বিশ্বের সিংহভাগ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির প্রধান যাত্রাপথও এটি। ২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে, যখন ইউক্রেন-রাশিয়া সংকটের পর জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে বিশ্বজুড়ে অস্থিরতা চলছে, তখন হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।
এশিয়ার ওপর প্রভাব
হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া তেলের সবচেয়ে বড় গ্রাহক হলো এশিয়া। চীন, ভারত, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মতো উদীয়মান ও শক্তিশালী অর্থনীতির দেশগুলো তাদের প্রয়োজনীয় জ্বালানির প্রায় ৮০ শতাংশই পায় এই রুট দিয়ে। ভারতের মতো দেশে যদি মাত্র কয়েক দিনের জন্য এই পথ দিয়ে তেল আসা বন্ধ হয়ে যায়, তবে পুরো দেশ অচল হয়ে পড়ার উপক্রম হবে। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়বে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে নিত্যপণ্যের বাজারে। অর্থাৎ হরমুজ প্রণালির সামান্য অস্থিরতাও কোটি কোটি সাধারণ মানুষের পকেটে টান ফেলে।
নির্ভরশীলতার সংকট
এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক ভারসাম্য একটি বিশেষ কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। কেবল তেল রপ্তানি নয়, এ অঞ্চলের দেশগুলোর টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় আমদানিও এই ৩৯ কিলোমিটার চওড়া পথের ওপর নির্ভরশীল। সৌদি আরব তার প্রয়োজনীয় খাদ্যের ৮০ শতাংশের বেশি এবং কাতার প্রায় ৮৫ শতাংশ খাবার বিদেশ থেকে আমদানি করে। ফলে এই পথটি বন্ধ হওয়া মানে কেবল তেলের বাজারে ধস নামা নয়, বরং পুরো পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে এক ভয়াবহ খাদ্যসংকট তৈরি হওয়া। ধনী রাষ্ট্র হওয়ার সত্ত্বেও ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতার কারণে তারা এই একটিমাত্র রুটের ওপর ‘কাঠামোগতভাবে’ নির্ভরশীল।
বিকল্প পথ
হরমুজ প্রণালি ঘিরে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের চিরস্থায়ী দ্বন্দ্ব বিশ্বের জ্বালানি আমদানিকারক ও রপ্তানিকারক দেশগুলোকে দীর্ঘকাল ধরেই এক গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখেছে। এই সংকীর্ণ জলপথটি যদি কোনো কারণে বন্ধ হয়ে যায়, তবে বিশ্ব অর্থনীতি যে ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে, তা এড়াতে গত কয়েক দশক ধরে বিকল্প পথ তৈরির চেষ্টা চলছে। তবে ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা এবং বিশাল অঙ্কের নির্মাণ ব্যয়ের কারণে এই বিকল্পগুলো এখনো হরমুজের পূর্ণাঙ্গ বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি।
আরব অঞ্চলের পাইপলাইন
হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমাতে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো কয়েক বছর ধরেই পাইপলাইনের ওপর জোর দিচ্ছে। সৌদি আরবের একটি বিশাল পাইপলাইন নেটওয়ার্ক (ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন) রয়েছে, যা দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় তেলক্ষেত্রগুলো থেকে লোহিত সাগরের ‘ইয়ানবু’ বন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত। এর ফলে তেলবাহী জাহাজগুলোকে আর হরমুজ প্রণালি দিয়ে যেতে হয় না। একইভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাত ‘আবুধাবি ক্রুড অয়েল পাইপলাইন’ তৈরি করেছে, যা ওমান উপসাগরের উপকূলে অবস্থিত ‘ফুজাইরাহ’ বন্দর পর্যন্ত তেল পৌঁছে দেয়। ফুজাইরাহ বন্দরটি হরমুজ প্রণালির বাইরে অবস্থিত হওয়ায় এখান থেকে তেল রপ্তানি করা অনেক বেশি নিরাপদ।
ওমান রুটের গুরুত্ব
ভূ-রাজনৈতিকভাবে ওমানের অবস্থান অত্যন্ত কৌশলগত। যেহেতু ওমানের একটি দীর্ঘ উপকূলরেখা হরমুজ প্রণালির বাইরে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের দিকে উন্মুক্ত, তাই অনেক দেশই ওমানকে একটি বিকল্প কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করছে। তবে সমস্যা হলো, বিশাল পরিমাণ তেল সরবরাহের জন্য কেবল পাইপলাইন যথেষ্ট নয়। প্রতিদিন যে ২ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল তেল হরমুজ দিয়ে যায়, তার একটি ছোট অংশ মাত্র এসব পাইপলাইন দিয়ে বহন করা সম্ভব। বাকি বিশাল অংশ বহনের জন্য এখনও সুপারট্যাংকার এবং হরমুজ প্রণালির কোনো বাস্তব বিকল্প নেই।
উত্তর-দক্ষিণ করিডর
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত, ইরান ও রাশিয়া মিলে ‘ইন্টারন্যাশনাল নর্থ-সাউথ ট্রান্সপোর্ট করিডর’ বা ওঘঝঞঈ নিয়ে কাজ করছে। এই প্রকল্পের লক্ষ্য হলো জাহাজ, রেল এবং সড়কপথের মাধ্যমে ভারত থেকে ইরান হয়ে মধ্য এশিয়া ও ইউরোপ পর্যন্ত পণ্য পরিবহন করা। ইরানের ‘চাবাহার’ বন্দর এই প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চাবাহার বন্দরটি হরমুজ প্রণালির বাইরে ওমান উপসাগরের উপকূলে অবস্থিত। যদি কোনো কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধও হয়ে যায়, তবু চাবাহার বন্দরের মাধ্যমে আফগানিস্তান এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যের পথ খোলা রাখার একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
সীমাবদ্ধতা
বিকল্প পথ তৈরির এতসব প্রচেষ্টার পরও কেন হরমুজ এখনও অপরিহার্য? এর প্রধান কারণ হলো সক্ষমতা। লোহিত সাগর দিয়ে তেল পাঠাতে হলে জাহাজগুলোকে সুয়েজ খাল অতিক্রম করতে হয়, যা নিজেও একটি অত্যন্ত ব্যস্ত এবং সংবেদনশীল পথ। এ ছাড়া পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল পাঠানোর খরচ জাহাজ পরিবহনের তুলনায় অনেক বেশি। কাতার থেকে যে বিশাল পরিমাণ এলএনজি রপ্তানি হয়, তার জন্য এখনও কোনো পাইপলাইন ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব হয়নি; ফলে কাতারকে পুরোপুরি হরমুজ প্রণালির ওপরই নির্ভর করতে হয়। ২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে এটি স্পষ্ট যে, বিকল্প রুটগুলো কেবল একটি ব্যাকআপ বা আপৎকালীন ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করতে পারে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে যে বিশাল শূন্যতা তৈরি হবে, তা পূরণ করার মতো সক্ষমতা এখনও কোনো বিকল্প রুটের নেই। তাই বিশ্ব অর্থনীতির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হরমুজ প্রণালি সচল ও নিরাপদ রাখার কোনো বিকল্প আজ অবধি তৈরি হয়নি।
ইসলামাবাদ বৈঠক ব্যর্থ
হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিয়ে ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যকার সাম্প্রতিক আলোচনা কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়েছে। এর ফলে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই আন্তর্জাতিক জলপথে উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। মার্কিন প্রতিনিধিরা আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচলের স্বাধীনতার ওপর জোর দিলেও ইরান একে তাদের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন বলে দাবি করছে। দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থানে অনড়। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের অধিকাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, যা এখন চরম ঝুঁকির মুখে। এই কূটনৈতিক অচলাবস্থা কেবল আঞ্চলিক রাজনীতি নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।