সিলেট ১৮ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১:৩০ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৮, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক ::
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে ইরান স্পষ্ট করে জানিয়েছে, তারা কোনো অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে রাজি নয়; বরং পুরো অঞ্চলে স্থায়ীভাবে সংঘাতের অবসান চায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সামরিক হুমকি এবং কূটনৈতিক তৎপরতা- দুই ধরনের বার্তাই আসছে। ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে।
তুরস্কে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইদ খাতিবজাদেহ বলেন, ‘আমরা কোনো অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি গ্রহণ করছি না। সংঘাতের চক্রকে স্থায়ীভাবে শেষ করতে হবে।’ তিনি জোর দিয়ে বলেন, যে কোনো যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে লেবানন থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত সব সংঘাতপূর্ণ অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে- এটিকে তিনি ইরানের ‘রেড লাইন’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
হরমুজ প্রণালি প্রসঙ্গে খাতিবজাদেহ বলেন, ঐতিহাসিকভাবে এই জলপথ উন্মুক্ত এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডই এই অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা তৈরি করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান দাবি করেছেন, কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফলেই লেবাননে যুদ্ধবিরতিতে ইসরায়েলকে বাধ্য করা হয়েছে। টেলিভিশনে সম্প্রচারিত ভাষণে তিনি বলেন, ইরান পরমাণু অস্ত্র চায় না এবং আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে এ অঞ্চলকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ তোলেন।
লেবাননে কার্যকর হওয়া ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির মধ্যেই হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তবে যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব নিয়ে সংশয় কাটেনি। যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন হলে ‘ট্রিগারে আঙুল রাখবে’ বলে হুশিয়ারি দিয়েছে ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘোষণার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘হরমুজ সম্পূর্ণ উন্মুক্ত ও ব্যবসার জন্য প্রস্তুত’। তবে ইরানের সঙ্গে চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ওয়াশিংটন ইরানের বন্দরে অবরোধ বজায় রাখবে।
ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানের সঙ্গে আমাদের লেনদেন ১০০% সম্পন্ন হওয়ার আগ পর্যন্ত শুধু ইরানের ক্ষেত্রে নৌ অবরোধ সম্পূর্ণ বলবৎ থাকবে।’ তিনি আরও বলেন, এই প্রক্রিয়া ‘খুব দ্রুত এগিয়ে যাবে’ কারণ অধিকাংশ বিষয় আলোচনার মাধ্যমে ঠিক হয়েছে।
এ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানেও দ্বৈততা দেখা যাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একদিকে ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন এবং বলেছেন, দুই দেশ ‘খুব কাছাকাছি’ অবস্থানে রয়েছে। এমনকি চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য পাকিস্তানে যাওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি তিনি।
তবে একই সময়ে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ হুশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরান চুক্তিতে রাজি না হলে তাদের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হতে পারে। তিনি জানান, প্রেসিডেন্টের নির্দেশ পেলেই যুক্তরাষ্ট্র যে কোনো সময় সামরিক অভিযানে যেতে প্রস্তুত।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান দ্বিতীয় দফা বৈঠকের কোনো নির্দিষ্ট তারিখ এখনও ঠিক হয়নি বলে জানিয়েছে পাকিস্তান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আলোচনার বিষয়বস্তু গোপন রাখা হচ্ছে এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের ঠিক আগে ব্যাপক হামলা চালায় ইসরায়েল, আর পাল্টা হামলার দাবি করেছে হিজবুল্লাহ। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও তা কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। বৈরুতের অনেক বাস্তুচ্যুত মানুষ এখনও ঘরে ফিরতে পারেননি।
এ অবস্থায় ইরান ও পাকিস্তান উভয়ই সমন্বিত যুদ্ধবিরতির ওপর জোর দিচ্ছে। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, যে কোনো যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করা অপরিহার্য। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।
একদিকে কূটনৈতিক তৎপরতা, অন্যদিকে সামরিক হুমকি- এ দুইয়ের টানাপড়েনে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি অস্থির হয়ে উঠেছে। স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা আদৌ সম্ভব হবে কিনা, তা নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও পারস্পরিক সমঝোতার ওপর।