বাল্যবিবাহকে আইনি স্বীকৃতি দিচ্ছে তালেবান সরকার

প্রকাশিত: 9:52 PM, May 22, 2026

বাল্যবিবাহকে আইনি স্বীকৃতি দিচ্ছে তালেবান সরকার

 আন্তর্জাতিক ডেস্ক ::

 

আফগানিস্তানের তালেবান সরকার নতুন একটি আইনের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো বাল্যবিবাহকে কার্যত আইনি স্বীকৃতি দিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন মানবাধিকারকর্মীরা। তাদের মতে, গত সপ্তাহে অনুমোদিত এই নতুন ‘লজ্জাজনক’ বিবাহবিচ্ছেদ আইনটি কার্যকর হলে কোনো মেয়ে বা তরুণীর পক্ষে তার স্বামীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে ডিভোর্স বা বিবাহবিচ্ছেদ নেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে।

আজ শুক্রবার দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। এতে বলা হয়, আফগানিস্তানে জোরপূর্বক ও অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বিয়ের কোনো সরকারি পরিসংখ্যান নেই। তবে মানবাধিকারকর্মীদের দাবি, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে ১১ বছর বয়সের পর মেয়েদের শিক্ষায় নিষেধাজ্ঞা জারির পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।

 

একটি বেসরকারি খসড়া সমীক্ষা বলছে, শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়ার পর দেশটির প্রায় ৭০ শতাংশ মেয়েকে কম বয়সে বা জোরপূর্বক বিয়ে দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ৬৬ শতাংশেরই বয়স ১৮ বছরের কম। তালেবান শাসনে বাল্যবিয়ের ওপর কোনো আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা তো নেই-ই, বরং নতুন এই আইনটি এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করছে যেখানে কোনো মেয়ে যদি দাবিও করে যে তার অমতে বিয়ে হয়েছে, তবুও স্বামী রাজি না থাকলে সে কোনোভাবেই আইনি বিচ্ছেদ পাবে না। এমনকি স্বামী নিখোঁজ থাকলে বা ভরণপোষণ না দিলেও একজন নারী এককভাবে ডিভোর্স চাইতে পারবেন না।

এই বিতর্কিত আইনের বিরুদ্ধে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে বেশ কিছু নারী অধিকার রক্ষা আন্দোলন বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে।

 

ফাতেমা নামের এক আফগান নারী আন্দোলনকারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘নারীবিরোধী শত শত ডিক্রি জারির পর তালেবান এখন বাল্যবিয়েকে তাদের আনুষ্ঠানিক আইনি কাঠামোর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে। নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পরিবর্তে তারা নারীবিরোধী আইন জারি এবং মানুষের স্বাধীনতা দমনে ব্যস্ত।’

 

আফগানিস্তানে জাতিসংঘ সহায়তা মিশনও (ইউএনএএমএ) আইনটি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদ সংক্রান্ত নীতিমালা নির্ধারণকারী এই ডিক্রি আফগান নারী ও কন্যাশিশুদের অধিকারকে আরও ক্ষয় করার আরেকটি ধাপ এবং এটি বৈষম্যমূলক ব্যবস্থাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করবে।

 

ইউএনএএমএর কর্মকর্তা জর্জেট গ্যাগনন বলেন, ‘নতুন আইনটি এমন এক উদ্বেগজনক ধারাবাহিকতার অংশ, যেখানে আফগান নারী ও মেয়েদের অধিকার ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে।’ তার মতে, আইনটি এমন একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করছে যেখানে নারীরা স্বাধীনতা, সুযোগ ও ন্যায়বিচারের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

 

অবশ্য আন্তর্জাতিক মহলের এবং দেশের ভেতরের এই তীব্র সমালোচনাকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছে তালেবান সরকার। তালেবান নিয়ন্ত্রিত জাতীয় রেডিও ও টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সরকারের একজন মুখপাত্র বলেন, ‘যারা এই ব্যবস্থার শত্রু, ইসলামের ওপর যাদের ক্ষোভ রয়েছে এবং যারা ইসলামিক ব্যবস্থার ভিত্তির বিরোধিতা করে, তাদের এই ধরণের বিক্ষোভে কান দেওয়ার কোনো প্রয়োজন সরকারের নেই।’

 

আফগানিস্তান হিউম্যান রাইটস সেন্টারের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশটিতে বাল্যবিবাহের অধিকাংশ ভুক্তভোগী গৃহস্থালি সহিংসতা ও তীব্র মানসিক যন্ত্রণার শিকার হয়েছেন। চলতি মাসের শুরুতে মধ্য আফগানিস্তানের দায়কুন্দি প্রদেশে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরী স্বামীর নির্যাতনে মারা যায়। তার বাবার ভাষ্য, আট মাস আগে মেয়েটির বিয়ে হয় তার চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে। বিয়ের দুই মাস পর থেকেই শুরু হয় নির্যাতন। প্রতিবার মারধরের পর স্থানীয় প্রবীণরা হস্তক্ষেপ করে তাকে সংসারে থেকে যেতে রাজি করাতেন।

 

আফগানিস্তান ইন্ডিপেনডেন্ট হিউম্যান রাইটস কমিশনের আবদুল আহাদ ফারজাম বলেন, ‘তালেবানের নতুন আইন ও তাদের শাসনব্যবস্থা বাল্যবিবাহকে বৈধতা দিচ্ছে, বিয়েতে স্বাধীন সম্মতির নীতিকে সীমিত করছে এবং কিছু ক্ষেত্রে নারীদের সেই অধিকার থেকেও বঞ্চিত করছে। এটি মূলত পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করছে এবং নারীদের অধস্তন ও আইনের দৃষ্টিতে অসম অবস্থানে ঠেলে দিচ্ছে।’

Spread the love

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

আর্কাইভ

October 2026
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031